Indo-Bangla Border Zero Point

মায়ের কোলে অনাহারে শিশুরা! সীমান্তের জিরো পয়েন্টে যেন এক অচলাবস্থা

রাজ্য

ভারত-বাংলাদেশের জিরো পয়েন্টে অসহায় মহিলারা।

জয়ন্ত সাহা: মাথাভাঙা
ভারত-বাংলাদেশের জিরো পয়েন্টে মায়ের কোলে অনাহারে শিশুরা! খোলা আকাশের নিচে দিন-রাত কাটছে। প্রশ্ন একটাই কার অপরাধে শিশুদের এই শাস্তি! মানবিক মুখের বড় অভাব বুঝি আজ!
কোচবিহারের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্টে আটকে থাকা কিছু পরিবারের গল্প আজ শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশ বা সীমান্ত রাজনীতির গল্প নয়, এটি এক গভীর মানবিক সংকটের গল্প। ৪ বছরের রফিক,আড়াই বছরের ওসমানের মত শিশুদের কথা ভাবার কেউ নেই!
মাথাভাঙার সাতগাছি, মহিষমুড়ি বা মেখলিগঞ্জ সীমান্ত— বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে, পুশব্যাক হওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে রয়েছে তাদের সন্তানরাও, যাদের অনেকের জন্মই হয়েছে ভারতে।
এই পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ ১০-১৫ বছর আগে চোরাপথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। কেউ ভুয়ো নথিপত্র সংগ্রহ করতে পেরেছেন, কেউ পারেননি। কিন্তু এরই মধ্যে তারা সংসার গড়েছেন, কাজকর্ম শুরু করেছেন, সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করেছেন। সেই সন্তানরা আজ ক্লাস সিক্স, সেভেন, এইট বা নাইনে পড়ে। তাদের বন্ধু আছে, সহপাঠী আছে, আছে শৈশবের অগণিত স্মৃতি। জন্মের পর থেকে যে মাটিতে বড় হয়েছে, তাদের কাছে সেটাই ছিল পরিচিত পৃথিবী।
রাষ্ট্রের আইন অবশ্য অন্য কথা বলে। একটি দেশের সীমানা অতিক্রম করে বেআইনিভাবে অন্য দেশে প্রবেশ করা অপরাধ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সীমান্ত, নাগরিকত্ব ও আইনের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। পাখি, বাতাস কিংবা নদীর মতো মানুষের চলাচল তো আর সীমাহীন নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত রক্ষা করতেই হয়।
রাজ্য সরকার ‘‘পুশব্যাক’’ করবেই। বিজিবি ওদের নেবে না! এ এক অচলাবস্থা! দুই দেশের সরকার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বৈঠক করে নথি দেখিয়ে নাগরিকত্ব প্রমান করতেই পারতো অনায়াসে। এ যেন চলছে এক জেদের খেলা। আর এর মাঝে পড়ে অভূক্ত শিশু মা আর বয়স্করা।
প্রশ্ন অন্য জায়গায়। যে শিশুটি আজ জিরো পয়েন্টে বসে আছে, সে তো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। সে জানত না তার বাবা-মা কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে এসেছিলেন কিংবা আসেন নি। তার জন্ম হয়েছে ভারতে, সে ভারতীয় স্কুলে পড়েছে, ভারতীয় বন্ধুদের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। তার অপরাধ কোথায়?
আজ সেই শিশু কিশোরেরা দুই দেশের মাঝখানের এক অনিশ্চিত ভূখণ্ডে দিন কাটাচ্ছে। নেই পর্যাপ্ত খাবার, নেই বিশুদ্ধ জল, নেই মাথার উপর নিরাপদ ছাদ। আছে শুধু হঠাৎ করে পরিচিত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যন্ত্রনা। সহপাঠী, বন্ধু, শিক্ষক, খেলার মাঠ— সবকিছু এক মুহূর্তে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা।আর আড়াই কিংবা তিন বছরের শিশুরা তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।ওরা জ্বলছে খিদের জ্বালায়।
আইনের প্রয়োগ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু মানবিকতার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের সিদ্ধান্তের দায় সন্তানদের কতটা বহন করতে হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু আইনের বইয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। সীমান্তের কাঁটাতারের মাঝখানে বসে থাকা এই শিশুরা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— নাগরিকত্বের বিতর্কের আড়ালে কখনও কখনও হারিয়ে যায় মানুষের মুখ, মানুষের কষ্ট এবং শৈশবের অধিকার।
জিরো পয়েন্টে বসে থাকা সেই শিশুদের চোখে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো একটাই— তাদের বাড়ি আসলে কোথায়?

Comments :0

Login to leave a comment