Election Commission

পদ রাখতে নিরপেক্ষ ভূমিকা নিন, জেলাশাসকদের হুঁশিয়ারি কমিশনের

রাজ্য

ভোটের প্রস্তুতি বৈঠকে এসেও ফের একবার জেলাশাসকদের কার্যকলাপের ওপর তাঁদের পদে থাকার বিষয়টি নির্ভর করবে বলে মনে করিয়ে দিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।
বিধানসভা ভোটের আগে নির্বাচনমুখী সব রাজ্যেই যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ। ভোটমুখী আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু, পুদুচেরিতে এসআইআর পর্ব শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে কমিশন। কিন্তু একমাত্র রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ যেখানে এখনও ৬০ লক্ষাধিক ভোটারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে থাকা এই ভোটারদের অনিশ্চিত রেখেই সোমবার নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ জেলাশাসক ও রাজ্য পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে ভোট প্রস্তুতির আলোচনায় শেষ পর্যন্ত এসআইআর পর্বে একমাত্র রাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকাই মুখ্য আলোচনায় উঠে আসে। আর তাকে কেন্দ্র করেই মু্খ্য নির্বাচন কমিশনারের নিশানায় ছিলেন জেলাশাসকরা। 
সূত্রের খবর বৈঠকেই জেলাশাসকদের উদ্দেশ্যে রীতিমত ক্ষোভ জানিয়ে জ্ঞানেশ কুমার বলেন, ‘‘শুরু থেকেই জেলাশাসকদের আরও একবার সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে। এরপরও তাঁদের (জেলাশাসক) ভূমিকা নির্ভর করবে স্বপদে থাকা।’’ প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকের আগে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলাদা করে এদিন বৈঠক করে। সেই বৈঠক থেকে বেরিয়ে সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম সাংবাদিকদের বলে যান, ‘‘রাজ্যে এসআইআর কাজ নিয়ে আলোচনার সময় নির্বাচন কমিশন মেনে নিয়েছে, যে সব প্রশাসনিক আধিকারিকদের যুক্ত ছিলেন, তাঁরা সবটা করেননি। আমরা বলেছি, তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, সেটা জানাতে হবে।’’
ঘটনা হলো, গত ৩১ জানুয়ারি রাজ্য পুলিশের ডিজি’র পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন রাজীব কুমার। অবসর গ্রহণের পর তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের এখন রাজ্যসভার সাংসদ। আবার এদিন তিনিই তৃণমূল নেতা হিসাবে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকে ফিরহাদ হাকিম ও চন্দ্রিমা ভট্টচার্যের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। নাম না করে সেই প্রসঙ্গে রাজ্যে সুষ্ঠু অবাধ বিধানসভা ভোটে রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে মহম্মদ সেলিম জানান,‘‘ উপনির্বাচনের ভোট গণনার দিন খুন হয়ে গেল ছোট্ট শিশু তামান্না। একটা এফআইআর হয়েছে। কমিশন নির্বাচন রাজ্য প্রশাসন, দিল্লির প্রশাসনের যে সব ব্যবস্থার কথা বলছেন তারা তো সব পক্ষপাতদুষ্ট। গতকাল যিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন, আজকে তিনি দলের প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছেন। এরাজ্যে এমন পরিস্থিতি কখনও ছিল না।’’ 
সকালে সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগের সত্যতা বিকালের মধ্যেই ফিরে আসে ধরনা মঞ্চ থেকে। রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে কমিশনের বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সতর্কবার্তার খবর ধরনা মঞ্চে মমতা ব্যানার্জি কাছে আসা মাত্রই পালটা হুমকি দিতে আসরে নামেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘‘ আজকেও আমি শুনলাম আমার অফিসারদের অনেক ভয় দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, মে মাসের পরেও তারা নাকি ব্যবস্থা নেবে। তখন আপনি কোথায় থাকবেন? ভ্যানিশিং কুমার।’’ এমনকি তাঁর নির্দেশ মেনে কাজ না করলে আধিকারিকদের পালটা হুমকি দিয়ে এদিন মমতা ব্যানার্জি বলে রেখেছেন, ‘‘ সব রেকর্ড থেকে যাবে। কাল বিজেপি চলে যাবে। তখন কোথায় থাকবেন? তখন তো আমি আপনাকে প্রথম ট্রান্সফার করবো।’’ 
এরাজ্যে এসআইআর শুরু হওয়ার আগে থেকেই কমিশন ও রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব দেখে যাচ্ছেন রাজ্যবাসী। তার পরিণতি এখনও রাজ্যের ৬০ লক্ষ ভোটারের ভোটদান অনিশ্চিত। মঙ্গলবার সেই ভোটারদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার জন্য সবার নজর থেকে সুপ্রিম কোর্টে। কিন্তু তার আগে স্রেফ ভোট প্রস্তুতি বৈঠকে এসে কমিশনের ফুল বেঞ্চের রাজ্যে উপস্থিতির মধ্যেই ভোটারদের সুরক্ষার বদলে দুই সাংবিধানিক সংস্থার নজিরবিহীন সঙ্ঘাত এড়ানো গেল না।
গত রবিবার রাতে কলকাতায় আসেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সহ অন্য দুই কমিশনার সুখবিন্দার সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী। এদিন সকাল থেকে রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে বৈঠকের পরই রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন কমিশনের ফুল বেঞ্চ। ওই বৈঠকেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানতে চান, অন্য সব রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেই কেন এসআইআর নিয়ে এত সমস্যা? 
এরআগে এসআইআর নথি যাচাই পর্বে ডিইও(জেলাশাসক)’দের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করে ছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। সাদা কাগজ, খবরের কাগজের কাটিং কে নথি হিসাবে আপলোড করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে সমস্ত অবৈধ নথি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে হয়েছিল কমিশনকে।
এদিনও প্রায় সেই কায়দায় রাজ্যের পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের কাছে নির্দেশ দেন জ্ঞানেশ কুমার। এদিন বৈঠকে পুলিশ আধিকারিকদের রাজ্যে বোমা, বেআইনি অস্ত্র, মদ, বেআইনি নগদ টাকা বাজেয়াপ্ত করার কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশকর্তাদের রীতিমতো সতর্ক করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দেন, আজ রাত মানে। আজ রাত থেকেই। কালকের জন্য কোনও কাজ ফেলে রাখা যাবে না।’’ বৈঠকে উপস্থিত রাজ্য পুলিশের এডিজি (এসটিএফ) বিনীত গোয়েলকেও কমিশনের কড়া কথার মুখে এদিন পড়তে হয়েছে।
সকাল ১২টার কিছু পর থেকে রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক শুরু হয়েছিল। দুপুরের আহারের এক ঘণ্টার বিরতির পর সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বৈঠক। সেই বৈঠক শেষ হতেই জেলাশাসকদের একাংশকে ছুটতে হয় নবান্নে। কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের নির্যাস বুঝিয়ে আসতে হয় রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে। 
এদিকে, এদিন রাতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সর্বদলীয় বৈঠকে সব দলের পক্ষ থেকেই এসআইআর প্রক্রিয়াকে সমর্থন করা হয়েছে। মহম্মস সেলিম এর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এতদিন এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের কাজে যুক্ত ছিল নির্বাচন কমিশিন। এখন সেই তালিকায় মিথ্যাচারও যুক্ত হলো।    

‘‘

Comments :0

Login to leave a comment