World Cup and Immigration

বিশ্বকাপ ফুটবলে নাগরিকত্ব অভিবাসন জাতীয় পরিচয়

স্পটলাইট বিশ্বকাপ ২০২৬

সুমিত গাঙ্গুলি

ফুটবল বিশ্বকাপ সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান। যেখানে ক্রীড়ার পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়, নাগরিকত্ব, অভিবাসন এবং রাষ্ট্রের ধারণা বহুমাত্রিকভাবে প্রতিফলিত হয়। গবেষণা দেখায় যে একজন ফুটবলার কোন দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন, এই প্রশ্নটি কেবল আইনি নাগরিকত্বের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে জাতীয় পরিচয়ের বোধ, ঐতিহাসিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার নানা মাত্রা। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফুটবলারদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি ক্রীড়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতি, পরিচয় ও রাজনীতির বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
গবেষকরা দেখিয়েছেন যে নাগরিকত্ব, জাতি  এবং জাতীয়তা একই অর্থ বহন করে না। নাগরিকত্ব রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ নির্দেশ করে, কিন্তু জাতি একটি কল্পিত সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। ফলে একজন ব্যক্তি আইনি অর্থে কোনও রাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারেন, কিন্তু তাকে সেই জাতির ‘প্রকৃত’ সদস্য হিসাবে সবাই স্বীকার নাও করতে পারে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই দ্বন্দ্ব বহুবার দেখা গেছে।
ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া দিয়েগো কোস্টার উদাহরণ দেওয়া যায়। কোস্টা ব্রাজিলের হয়ে প্রীতি ম্যাচ খেললেও পরে স্পেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন ও স্পেনের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। এতে ব্রাজিলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেকেই মনে করেছিলেন তিনি নিজের জন্মভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। অথচ কোস্টার যুক্তি ছিল, স্পেন তাঁকে পেশাগত সুযোগ এবং নতুন জীবন দিয়েছে। এই ঘটনা দেখায় যে জন্মস্থান ও আবেগের সম্পর্ক সবসময় নাগরিকত্বের আইনি কাঠামোর সঙ্গে মেলে না।
অনেকেই মনে করেন, বিশ্বকাপে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের সংখ্যা নিয়ে যে ধারণা প্রচলিত আছে, তা অনেকাংশে অতিরঞ্জিত। ১৯৩০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিশ্বকাপে বিদেশে জন্মগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের হার মোটামুটি ৮ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যেই ছিল। অর্থাৎ সাম্প্রতিক বিশ্বায়নের যুগে হঠাৎ করে এই প্রবণতা তৈরি হয়নি। বরং এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ।
তিনটি ঐতিহাসিক শ্রেণিতে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমটি হলো ডায়াসপোরা দল। ডায়াসপোরা বলতে এমন জনগোষ্ঠীকে বোঝায় যারা পূর্বপুরুষের দেশ থেকে অন্যত্র বসবাস করলেও তাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও আবেগগত সম্পর্ক বজায় রাখে। ১৯৩৪ সালের ইতালি এবং ২০২২ সালের মরক্কো এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ইতালি ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া ইতালীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। মুসোলিনির সরকার তাদের ‘ডায়াসপোরা ইতালীয়’ হিসাবে ইতালির সম্মান রক্ষার আহ্বান জানায়। লুইস মন্টি এর অন্যতম উদাহরণ। তিনি ১৯৩০ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে এবং ১৯৩৪ সালে ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেন।
দ্বিতীয় শ্রেণি হলো বিস্তারশীল ও ভেঙে যাওয়া রাষ্ট্র। এখানে ১৯৩৮ সালের নাৎসি জার্মানি এবং ১৯৯০-এর যুগোস্লাভিয়ার উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রিয়া জার্মানির সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর অস্ট্রিয়ান ফুটবলাররা জার্মানির হয়ে খেলার যোগ্যতা লাভ করেন। হিটলার পর্যন্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন যে নতুন জার্মান দলে নির্দিষ্ট সংখ্যক সাবেক অস্ট্রিয়ান খেলোয়াড় থাকতে হবে। ফলে ফুটবল এখানে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশে পরিণত হয়।
অন্যদিকে যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর নতুন রাষ্ট্রগুলো—ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া, সার্বিয়া—নিজেদের জাতীয় দল গঠন করে। কিন্তু অনেক খেলোয়াড় তাদের জন্মভূমি হিসাবে সুইডেন, জার্মানি বা সুইজারল্যান্ডকে বেছে নেন। লাতান ইব্রাহিমোভিচের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পারিবারিক শিকড় বলকান অঞ্চলে হলেও তিনি সুইডেনের প্রতিনিধিত্ব করেন। এটি দেখায় যে রাষ্ট্রের সীমানা পরিবর্তিত হলে জাতীয় পরিচয়ও নতুনভাবে গঠিত হয়।
তৃতীয় শ্রেণি হলো ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক বাস্তবতা। ১৯৬৬ সালের পর্তুগাল এবং ২০১৮ সালের ফ্রান্স এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। পর্তুগালের একনায়ক সালাজার মোজাম্বিক সহ উপনিবেশ থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করেন। ইউসেবিও এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ। তাঁকে পর্তুগিজ রাষ্ট্র ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসাবে বিবেচনা করত। অন্যদিকে ফ্রান্সের ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী দল ছিল বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত বহু খেলোয়াড় ফরাসি দলের অংশ ছিলেন। এ নিয়ে বিতর্কও সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ আফ্রিকান কৌতুকাভিনেতা ট্রেভর নোয়া মন্তব্য করেছিলেন যে ‘আফ্রিকা বিশ্বকাপ জিতেছে’, কারণ ফরাসি দলে বহু আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় ছিলেন। ফরাসি রাষ্ট্রদূত এর বিরোধিতা করে বলেন, তারা সবাই ফরাসি নাগরিক এবং ফরাসি জাতির অংশ। এই বিতর্ক দেখায় যে ঔপনিবেশিক ইতিহাস এখনও জাতীয় পরিচয়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ শুরুর আগে খুব কম মানুষই অনুমান করেছিলেন যে মরক্কো টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে পৌঁছাবে। তারা বেলজিয়াম, স্পেন এবং পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসাবে বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নেয়। কিন্তু তাদের এই সাফল্য শুধু ফুটবলীয় কারণে নয়, অভিবাসন ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্কও সৃষ্টি করেছিল। কারণ মরক্কোর ২৬ সদস্যের দলে ১৪ জন খেলোয়াড় বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী ১,২৪৮ জন ফুটবলারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এমন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন যেখানে তাদের জন্ম হয়নি। কিছু দলে এই হার আরও বেশি। কুরাসাওয়ের ৯৬ শতাংশ, কঙ্গো গণ-প্রজাতন্ত্রের ৮৫ শতাংশ এবং মরক্কোর ৭৩ শতাংশ খেলোয়াড় বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। মোট ৪৮টি দলের মধ্যে আটটি দলে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড় সংখ্যাগরিষ্ঠ। আজকের বিশ্বে অভিবাসন ও ডায়াসপোরা সম্প্রদায় জাতীয় দল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের ২৩ জনের মধ্যে ১২ জনের বাবা-মা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ছিলেন। এটি ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রতিফলন। ইংল্যান্ডের ২০২৬ বিশ্বকাপ দলও একই বাস্তবতা তুলে ধরে। আইভরি কোস্টে জন্ম নেওয়া মার্ক গেহির পাশাপাশি আরও অন্তত নয়জন খেলোয়াড়ের একজন অভিভাবক বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের অধিকাংশের শিকড় আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ানের সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ২৪ জন খেলোয়াড় অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যার মধ্যে ঘানা, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডও রয়েছে।
২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বকাপে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি হলে দলগুলো সাধারণত আরও দূর পর্যন্ত এগোয়। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, বৈচিত্রময় পটভূমির খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গঠিত দলগুলো গড়ে ভালো ফল করে। এর কারণ দুটি। প্রথমত, অভিবাসন একটি দেশের জন্য বৃহত্তর প্রতিভা ভাণ্ডার তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন পটভূমির খেলোয়াড়রা ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতা ও খেলার ধরন নিয়ে আসে, যা দলকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে।
তবে শুধু অভিবাসনই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা একটিও বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড় ছাড়াই বিশ্বকাপ জিতেছিল। অর্থনৈতিক শক্তি, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং অবশ্যই লিওনেল মেসির মতো অসাধারণ ফুটবলারের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। তবুও মরক্কোর সাফল্য এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের দলগুলোর গঠন দেখিয়ে দিচ্ছে যে আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিবাসন এখন একটি অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা, যা জাতীয় পরিচয় এবং ক্রীড়া সাফল্যের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

Comments :0

Login to leave a comment