পল্লব সেনগুপ্ত
কয়েকদিন সাবৎ বিভিন্ন গণমাধ্যমে একটি সহজলভ্য (এখনও!) নিত্য-আহার্য বস্তুর প্রসঙ্গ খুব গুরুত্ব পাচ্ছে। অবশ্য সেটা আহাম হিসেবে নয়, ‘প্রহার্য’ হবার সুবাদে। বস্তুটি হলো ‘ডিম’ ওরফে অন্ড। সাম্প্রতিক নির্বাচনে দোর্দণ্ডপ্রতাপ বলে আত্মশ্লাঘাধারী দল তৃণমূল কংগ্রেস পর্যুদস্ত, হীনবল হবার পরিণামে তাঁদের অহঙ্কার, ঔদ্ধত্ব দ্রুতই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ইংরেজি করে বললে ‘dim’ হয়ে চলেছে। এবং চতুর্দিকে তাদের দ্বারা যে বিচিত্র প্রকারের চুরি জোচ্চুরি, তোলবাজি, গুন্ডামি, খুন খারাপি, প্রতারণা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ এবং আরও অজস্র অপকর্ম সাধিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে রাজ্যের মানুষের জমিয়ে-রাখা রাগ এখন নানাভাবে ফেটে পড়ছে। যার একটি অভিনব (অন্তত এদেশে) অভিব্যক্তি হলো দাগী হিসাবে মানুষ দ্বনারা চিহ্নিত তৃণমূলী দেখলেই চড়-থাপ্পড় ইত্যাদির সঙ্গে ডিম ছুঁড়ে পেটানো— তা সেটা পচা বা টাটকা যা-ই হোক না-কেন!
এই সূত্রেই বাঙালির স্বভাবসিদ্ধ, সহজাত পরিহাস-প্রিয়তাই একটু সক্রিয় হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, ডিম কিনতে গেলেই ক্রেতাকে নাকি শুধোনো হচ্ছে: ‘‘দাদা, খাবার জন্যে, না পেটানোর জন্যে?’’ পেটানোর বাবদে যে ডিম, তাতে নাকি দামে কিছুটা ছাড়ও দিচ্ছেন ডিম বিক্রেতারা। বোধহয় ওইভাবেই পরোক্ষে ‘ডিমোচ্ছেন’ আর সেই সূত্রে এতদিন ধরে জমানো রাগও উশুল করছেন তাঁরা। এটা অবশ্যই পরিহাস-জল্পিত একটি চুটকি গল্প। কিন্তু তা যদি হয়ও, তবু এই ব্যঙ্গ মেশানো পরিহাসের মধ্যেও যে কঠিন এক সত্য তাজির আছে কি অস্বীকার করা যায়? যায় না। তাই পশ্চিম বাংলার রাজনীতির এই ‘ডিন্ডিম-বাজানো’ পালাবদলের প্রহরে ডিম-সহযোগে প্রহার আচমকা শুরু হলেও, এর কিন্তু একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে— যা একই সঙ্গে স্বদেশি এবং বিদেশি দু-ধরনের সামাজিক ইতিহাসের উত্তরাধিকারী।
দেশি উৎসটার কথাই আগে বলি। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিখ্যাত উপন্যাসের এক জায়গায় আছে প্রাচীন চেদী রাজ্যের দুরাচারী নৃপতি লক্ষ্মীকর্ণকে তাঁর মা অম্বিকা দেবী তিরস্কার করতে করতে কোনও সময়ে সাবধান করছেন এই বলে যে,‘‘প্রজারা ডিম্ব করিবে।’’ (তুমি সন্ধ্যার মেঘ)
স্পষ্টতই ‘ডিম্ব’ এখানে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এমন কী বিদ্রোহ ইত্যাদিরই প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহার করেছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতো প্রাচীন ভারত সম্পর্কে অন্বিষ্ট সাহিত্যিক অবশ্যই ওই সব বিশেষ অর্থেই ‘ডিম্ব’ যে ব্যবহার্য, তা খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই জনগণের ক্রোধের প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে ডিম্ব তথা ডিম শব্দটি নিশ্চয়ই প্রচলিত ছিল। কী ভাকে? বিক্ষোভ দেখাতে কি ডিম ছোঁড়া হতো উদ্দিষ্ট ব্যক্তি বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষ বিশেষ জায়গাকে লক্ষ করে?
প্রাচীন ভারতে অবশ্য জনসাধারণকে যেভাবে নির্জিত করে(নিংড়ে) রাখা হতো মনুসংহিতা, বৈদান্তিক মায়াবাদ এবং নিয়তি ও কর্মফলতত্ত্বের জাঁতায় পিষে, তাতে অপশাসকের বিরদ্ধে বিক্ষোভ- বিদ্রোহের বিশেষ অবকাশ ছিল না। তবু তেমন ব্যাপার যে আদৌ ঘটেনি, তাই বা কী করে বলি? শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিক’ তো পুরোপুরি সফল গণবিদ্রোহের নাটক। ওই ‘রাজপরিবর্ত’-এর ভাবনা তিনি কেমন করে সঞ্চয় করেছিলেন?...মানুষ কুশাসন অসহনীয় হলে রুখে উঠেছে অবশ্যই— ইতিহাসের অনিবার্য নিয়মেই। তবে তার দলিল সযত্নে মুছে দিয়েছে কায়েমি শ্রেণিস্বার্থ-ভোগীরা। শূদ্রকের বইটা এক ফাঁকে টিকে গেছে। তাই ‘ডিম্ব’ তো হয়েছে অবশ্যই। তবে তার হদিশ বেপাত্তা। কোনও এক বিস্মৃত সূত্র থেকে শরদিন্দু এই ‘প্রজাদের ডিম্ব’ করার কথাটা সঙ্কলন করে নিজের উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন, এটাই বুঝতে হবে। আর বঞ্চনা শোষণের বিরদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে অসুরদের স্বর্গ কেড়ে নেওয়ার মিথকথা কি শিকড়বিহীন ভাবেই গড়ে উঠেছিল? সমুদ্রমন্থনে দেবতারা তাদেরকে সেভাবে প্রতারিত ও বঞ্চিত করেছিল, তার প্রতিশোধে ওই স্বর্গজয়। বিদ্রোহ তো সেটাও। অর্থাৎ, ডিম্ব।
(২)
বিদেশে ডিম ছুঁড়ে মারার ট্র্যাডিশানও খুব প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতকের মানে, শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিক’ নাটকেরই সমসাময়িক মোটামুটি ভাবে। প্রাচীন কালে রোমানদের মধ্যে একটা বার্ষিক উৎসব প্রচলিত ছিল— ‘স্যাটার্নালিয়া’, যেখানে হৈ-চৈ হুল্লোড়ের এক মোচ্ছব লেগে যেত। ডিসেম্বরের শেষদিকের ওই উৎসবের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল পরস্পরের গায়ে ডিম ছুঁড়ে মারা। সে সময়ে অবশ্য ডিম দিয়ে পেটানোটা ক্রোধ বা বিরক্তির অভিব্যক্তি ছিল ছিল না। বরং ছিল মেয়ে-পুরুষের মধ্যে যৌনাকাঙ্ক্ষা প্রকাশেরই মাধ্যম। কালে দিনে ওই উদ্দাম-উৎসবের প্রথাটা স্তিমিত হয়ে যায় এবং উৎসবের রীতিটা রূপান্তরিত হয় বড়দিন ওরফে ক্রিশমাস অনুষ্ঠানে। এটা হয় খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতাব্দী থেকে, যখন রোমানদের মধ্যে প্রাচীন ‘পেগান’ ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে খ্রিস্ট ধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু ডিম- ছোঁড়ার ব্যাপারটা চালু হয়ে যায় দেশের অন্যত্র। রোমানদের নাট্য ঐতিহ্য খুবই সমৃদ্ধ ছিল। তাই নাটক অভিনয়ের সময়ে যদি কোনও ধরনের গলদ দর্শকদের চোখে পড়ত, বা তাদের কোনও সংলাপ বা অভিনয় অপছন্দ হতো, তখনই প্রেক্ষাগৃহে শুরু ডিম-ছোঁড়াছুঁড়ি। স্যাটার্নালিয়ার সূত্রে যে- ডিম্ব প্রহার ছিল যৌন কামনাসূচক, সেটা পরিণতি পেল ক্রোধ, বিরক্তি প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলস্ রোমানদের অধীনে থাকার সময়ে (খ্রিষ্টাব্দ ৪৩- খ্রিষ্টাব্দ ৪১০ অব্দ) ওই দুই দেশের ব্যবহারিক এবং সামাজিক জীবনে নতুন পর্বের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও অনেক কিছু রোমান প্রভাব পড়ে সেই সূত্রে। খুবই সম্ভাব্য তখনই ডিম ছুঁড়ে বিরক্তি প্রকাশের পদ্ধতিটাও সেখানে রপ্তানি হয়ে গিয়েছিল। তবে সেটা খুব ব্যাপক ছিল না। কিন্তু কালক্রমে যে বিলুপ্ত হয়েও যায়নি তার প্রমাণ মেলে পরবর্তীকালে লন্ডনের বিভিন্ন রঙ্গমঞ্চে নাটক অভিনয়ের সময়ে দর্শকদের কোনও কিছু মনঃপুত না হলে ডিম-ছোঁড়ার ব্যাপারটার মধ্যে। এমন কি এলিজাবেথের শাসনকালে স্বয়ং শেক্সপিয়রের সময়ে গ্লোব ও অন্যান্য সব রঙ্গমঞ্চে বিরক্ত দর্শককুল নানা ভাবে সেই বিরাগ প্রকাশ করত, ‘ডিমোনো’-ও তার অন্তর্গত ছিল। এটা পরে আবার ব্রিটিশ রাজনীতিতেও অনুপ্রবিষ্ট হয়।
ঔপনিবেশিক বিড়ম্বনার বাবদে ওই রেওয়াজ ইংরেজদের সঙ্গে ‘ঘুসপেটিয়া’ হয়ে এদেশেও আসে একসময়ে। তারা বিদেয় হলেও, তাদের ভালমন্দ অনেক কিছুর সঙ্গে এই ডিম্ব নিক্ষেপটাও অবশ্যই থেকে গিয়েছিল। তবে অলক্ষে। তা নইলে, বিক্ষোভের হাতিয়ার হিসাবে ইট-পাটকেল- ঢিল-পাথর-কর্দম-গোময় ইত্যাদি সব ‘সনাতনী’ উপকরণের মধ্যে আচমকা এই ‘বিধর্মীয়’ আমিষ খাদ্য বস্তুটির এমন প্রবল ব্যবহার শুরু হতো না!
(৩)
ওই রোমানদের প্রসঙ্গ সূত্রেই আরও একটা কথা মনে পড়লো। এক ইংরেজ ঐতিহাসিক অসামান্য একটি বই লিখেছিলেন। তাঁর নাম এডওয়ার্ড গিবন। বইটির নাম ‘ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব রোমান এম্পায়ার’ (১-৬খন্ড: ১৭৭৬-১৭৮৮)। এই বইয়ের নামের আদলেই হয়তো পরে কেউ আরেকটা বই লিখবেন, যার নাম হয়তো হবে ‘ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব ‘মমান’ এম্পায়ার’! ‘মমান’ কী কারনে বলছি, সুধী পাঠকরা সেটি অবশ্য বুঝবেন। তাতে ‘মমান’ সাম্রাজ্যের এই অন্তিম পর্বে ডিম-পেটানোর অজস্র ঘটনা কতটা উল্লেখিত হবে ঠিক জানি না। কারন এদেশের রাজনীতিতে এই ‘ডিমার’ প্রতিবাদীদের প্রসঙ্গ যথেষ্টই উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠছে।
তবে ‘মম্-সাম্রাজ্যের’ পতন ঘটেছে বলে আহ্লাদে অষ্ট আশি হওয়ার কোনও কারন নেই। নতুন যে শাসকরা ভোটে জিতে এলেন(হিটলারও ভোটে জিতে এসেছিলেন, মমতা ব্যানার্জিও), তাঁরা যে বুলডোজারি শুরু করেছেন গরিব মানুষের রুজি রুটির ওপর, তাকে ডিম ছুঁড়ে রোধ করা যাবে না। নতুন শাসকরা যতই ‘রিডীমার’(অর্থাৎ পরিত্রাতা) রূপে আত্মপ্রচার করুন না কেন, সেটার ওপর ভরসা করা যাচ্ছে না। বঙ্গবাসীর জন্য ভবিষ্যৎ আবারও ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ বরাদ্দ করছে কিনা তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। কারন বুলডোজার সর্বক্ষেত্রে যদি চলে তাহলে একদিন ফের ‘প্রজারা ডিম্ব করিবে।’ ইতিহাস সেটাই বলছে।
Comments :0