গল্প | বাবা-মেয়ের গল্প
সৌরীশ মিশ্র
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ১৩ জুন ২০২৬
গৌরীর মোড়ে এক প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে গোলাইটা ঘুরে রথতলার রাস্তাটা ধরল রিকশাচালক মেঘনাদ। তার স্ট্যান্ড হরিতলার বাজারে। তাই, এই রাস্তাটা ধরলে তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যায় ওখানে। ভর দুপুর এখন। ভীষণ গরম পড়েছে ক'দিন হোলো। কাঁধে ফেলা গামছাখানা দিয়ে রিকশা টানতে-টানতেই মুখের ঘাম মোছে সে।
একটু এগিয়ে বাঁদিকের মোড়টা ঘুরে হাইস্কুলের রাস্তাটায় এবার পড়ল মেঘনাদের রিকশা। সামনেই রাস্তার ডানহাতে ছেলেদের হাইস্কুল। স্কুলের গেটের সামনে বেশ ভিড়। আজ শনিবার। তাই, দেড়টায়, একটু আগে, ছুটি হয়েছে ডে-সেকশন।
স্কুলের সামনের ভিড়টা দেখে মনে মনে ভাবে মেঘনাদ, ভালোই হয়েছে এই রাস্তাটায় এসে। ঐ ভিড়ের মধ্যে কোনো প্যাসেঞ্জারও পেয়ে যেতে পারে ও।
রিকশা আস্তে করে মেঘনাদ। তারপর স্কুলের গেটের একটু আগে দাঁড়ই করিয়ে দেয় সে সেটাকে।
কিন্তু, কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েও যখন কেউ তার রিকশা ভাড়া নিতে এল না আর স্কুলের সামনের ছাত্র আর তাদের অভিভাবক-অভিভাবিকাদের ভিড়ও কমে গেল, মেঘনাদ বুঝে গেল সে বেকারই দাঁড়িয়ে রয়েছে ওখানে। সে তাই প্যাডেলে চাপ দিল ফের।
একটু সবে এগিয়েছে সে তাঁর রিকশা নিয়ে, হঠাৎই ফের রিকশার ব্রেক চাপল মেঘনাদ। স্কুলের গেটের বাইরের ফুটপাথের এক পাশে কয়েকজন বিক্রেতা কিছু সামগ্রী নিয়ে বসে আছে। তাদেরই মধ্যের একজনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে মেঘনাদ এই মুহূর্তে! এরপর রিকশাটা থেকে নামলো সে। রিকশাটা রাস্তার ধারে সাইড করলো। তারপর পায়ে-পায়ে ফুটপাথের উপর বসা ঐ দোকানটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে।
দোকানটায় ব'সে বছর পঞ্চাশের একটি লোক। সে বিক্রি করছে এই যে ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে তার নামকরা প্লেয়ারদের সব পোস্টার। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, ছাত্ররাও প্রায় সবাই-ই চলে গেছে, তাই আজ বিক্রিবাট্টার আর আশা নেই বুঝে, দোকান তার গুটিয়ে ফেলছিল সেই বিক্রেতা। মেঘনাদ তার দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতেই মেঘনাদের দিকে মুখ তুলে তাকালো ঐ বিক্রেতা। শুধোলো, "পোস্টার লাগবে?"
"মেসির পোস্টার আছে?" জিজ্ঞেস করে মেঘনাদ বিক্রেতা লোকটাকে।
"আছে।" বলে দোকানদার।
"কই, দেখছি না তো?" ফের জিজ্ঞেস করে মেঘনাদ।
"এই মাত্তর গুটিয়ে রাখলাম। দাঁড়াও বের করি।" বলেই পাশে রাখা ক্যালেন্ডারের মতোন করে মোড়ানো কয়েকটা মোড়কের মধ্যে থেকে একটা মোড়ক তুলে নিয়ে, খোলে সেটা সে। মেঘনাদ দেখে ঐ মোড়কটার মধ্যেই ছিল চারখানা মেসির পোস্টার। বিক্রেতা লোকটা এবার একটা-একটা করে সেগুলোকে মেলে ধরতে থাকে মেঘনাদের চোখের সামনে। আর বলতে থাকে, "আরো সাত-আটটা ছিল। সব বিক্রি হয়ে গেছে। ওর পোস্টারেরই তো সবচেয়ে বেশি চাহিদা।"
মেঘনাদ একটা একটা করে সব ক'টি পোস্টার দেখে হাতে নিয়ে নিয়ে। অনেক ভাবনা-চিন্তা ক'রে তারপর তারই মধ্যে বেছে দরাদরি করে কেনে একটা। তারপর পায়ে-পায়ে রিকশার কাছে এসে প্যাসেঞ্জারের বসার সিটটা সড়িয়ে সযত্নে পোস্টারটাকে রাখে তার ভিতরে। নিজের সিটে উঠে বসে ফের চাপ দেয় প্যাডেলে। রিকশা এগোতে থাকে তার। মেঘনাদের এখন চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছে তার একমাত্র মেয়ে মৌ-এর মুখখানা। মৌ-এর এখন ক্লাস এইট চলছে। পড়াশোনায় মোটামুটি হলেও ফুটবল খেলাতে দারুণ সে। ওই তো ওদের স্কুলের ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন এখন। কতো মেডেলও তো পেয়েছে এরই মধ্যে ঐ ফুটবল খেলেই! মেয়েকে নিয়ে খুব গর্ব মেঘনাদের। বড় টানাটানির সংসার তাঁর। তাই, বেশির ভাগ সময়ই মেয়ের খেলাধুলার সরঞ্জাম কিনে দিতে পারে না সে। এই দুঃখ যে তার কি দুঃখ, তা শুধু মেঘনাদই কেবল জানে। তাই ক'দিন আগে মেঘনাদ দুপুরে যখন খাচ্ছিল ভাত বাড়িতে, ওর বউ কি যেন কথায়-কথায় ওকে বলেছিল, মেয়ের নাকি খুব সখ তাদের ঘরে একটা মেসির পোস্টার লাগিয়ে রাখে দেওয়ালে। মেসির ভীষণ ভক্ত যে তার মেয়ে তা ভালোই জানে মেঘনাদ। সে মেয়ের খেলাধুলার চাহিদা অনুযায়ী বড় কিছু না দিতে পারে, কিন্তু এইটা দেওয়ার মতোন ক্ষমতা তার আছে। তাই তারপর থেকেই তক্কে তক্কেই ছিল সে, মেসির পোস্টার কোথাও পায় যদি। এর মধ্যে দু'-এক জায়গায় খোঁজও করেছিল, কিন্তু পায়নি। তাই, আজ পেতেই কিনে নিয়েছে সে।
মেঘনাদের রিকশা এখন ঘড়িমোড়ের ঠিক সামনে। এই মোড় থেকে দুটো রাস্তা গেছে দু'দিকে। ডানদিকের রাস্তাটাই যাচ্ছে হরিতলার বাজারের দিকে, অর্থাৎ মেঘনাদদের রিকশার স্ট্যান্ড যেদিকে, সেই দিকে। মেঘনাদের তো আগে ঠিক ছিল সে স্ট্যান্ডে যাবে, কিন্তু, গোলাইটা থেকে ডানদিকে না গিয়ে বাঁ দিকের রাস্তাটা ধরল মেঘনাদ। সে যে তার স্ট্যান্ডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছে পোস্টারটা কেনার পরেই। মেঘনাদ এখন চলেছে মুকুন্দবস্তি। ঐ বস্তিতেই ও, ওর বউ-মেয়েকে নিয়ে থাকে টালির ছাউনি দেওয়া একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে। হ্যাঁ, মেঘনাদ ওর বাড়িতেই যাচ্ছে। আজ শনিবার হওয়ায় মেয়ে চলে এসেছে নিশ্চয়ই স্কুল থেকে ইতিমধ্যেই বাড়ি, মনে মনে সময়ের হিসেব করে নিয়েছে মেঘনাদ। ঘন্টা দুয়েক বাদেই মেয়ে আবার চলে যাবে স্কুলের মাঠে প্র্যাকটিস করতে। মেঘনাদ যদি এখনই না যায় বাড়ি, মেয়েকে মেসির পোস্টারখানা হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ পাবে মেঘনাদ, সে-ই রাত্রিবেলা, রিকশা চালিয়ে সে বাড়ি ফিরলে তারপর। মেঘনাদ অতো দেরী করতে চায় না। মেয়েকে কিছু একটা দিয়ে তাকে খুশি করতে পারার সুযোগ তার মতোন গরিব বাবা কমই পায়। তাই, এইসব ভাবতে-ভাবতেই মেঘনাদ এখন তার সাইকেল-রিকশা চালাচ্ছে যতটা দ্রুত সম্ভব ততটা।
Comments :0