Krishak Sabha

সহায়ক মূল্যে ধান না কেনার সিদ্ধান্ত সরকারের, কোচবিহার জেলা জুড়ে আন্দোলনের ডাক কৃষকসভার

জেলা

জয়ন্ত সাহা: কোচবিহার
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেই রবি মরসুমে কোচবিহার জেলা থেকে সহায়ক মূল্যে ধান না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! বিজেপি সরকারের এই কৃষকস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কোচবিহার জেলা জুড়ে আন্দোলনের ডাক দিল কৃষকসভা। সংগঠনের জেলা সম্পাদক আকীক হাসান রবিবার বলেন, ‘‘জেলার রবি মরশুমে সহায়ক মূল্যে সরকার ধান কিনুক এই দাবি সহ আরও চার দফা দাবিতে ১৮ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত জেলার ১২ টি ব্লকে কৃষকদের নিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। চলবে ব্লকে ব্লকে বিক্ষোভ। আগামী ৭ জুলাই একই দাবিতে জেলাশাসকের কাছে ধানচাষীরা লালঝান্ডা হাতে স্মারকলিপি দেবে। এবং বিক্ষোভ মিছিলে শামিল হবে। এদিন তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘রাজ্য সরকারের ধান কেনার সহায়ক মূল্য যেখানে প্রতি কুইন্টাল ২৩৬৯ টাকা। সেখানে কোচবিহার জেলার হাটে হাটে শুরু হয়েছে অভাবী বিক্রি। ফড়েরা কুইন্টাল প্রতি ১২০০ থেকে ১২৫০ টাকার বেশি দিচ্ছেই না। এরকম চললে ধান চাষীর আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া ছাড়া অন্য কোন পথ থাকবে না। 
উল্লেখ্য ধান চাষীদের অভাবী বিক্রি ঠেকাতে বামফ্রন্ট সরকার ব্লকে ব্লকে নগদ টাকায় সহায়ক মূল্যে ধান কিনতো। সাধারণত ১ জুন থেকে রবি মরশুমের ধান কেনা শুরু হত। আর ১ নভেম্বর থেকে সহায়ক মূল্যে খারিফ মরসুমের ধান কিনতো সরকার। গত ১৫ বছরে ধান কেনা হলেও তৃণমূলের মদত পুষ্ট ফড়েদের কব্জায় চলে গেছিল সহায়ক মূল্যে ধান ক্রয় কেন্দ্রগুলি। আর বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এসেই ৯ জেলায় ধান ক্রয় বন্ধের পাশাপাশি ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধান চাষীদের সর্বনাশের মুখে দাঁড় করালো।

রবি মরশুমে এবারেই প্রথম বিজেপি শাসনে সহায়ক মূল্যে ধান কেনা শুরু হয়েছে রাজ্যে। ধান কেনার তালিকায় নেই কোচবিহার, জলপাইগুড়ি জেলার নাম! ফলে এই দুই জেলায় ধান কেনার প্রস্তুতিও নেই খাদ্য দপ্তরের! আবার পাশের জেলা আলিপুরদুয়ারে ধান কেনা হবে। কিন্তু সেখানেও নাকি ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, এমনই খবর মিলছে জেলার খাদ্য দপ্তর থেকে! এই জেলায় গত বছর রবি মরশুমে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার মেট্রিক টন। এবারে সেই লক্ষ্যমাত্রা করা হয়েছে ২ হাজার মেট্রিক টন!
উল্লেখ্য, প্রশাসনিক সূত্রেই জানা গেছে, রাজ্যের ২৩ টি জেলার মধ্যে ২১ টি জেলাই কৃষি অধ্যুষিত। এর মধ্যে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি সহ ৯ টি জেলায় রবি মরসুমে ধান কেনা হবে না বলে নির্দেশিকা এসেছে বলে জেলা খাদ্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। ২০ মে ওই নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে।
ধান চাষী সত্যেন রায়, মনসুর আলী, দীপক বর্মনরা গত এক সপ্তাহ ধরে মান্ডিতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন সরকার আর সহায়ক মূল্যে ধান কিনবে না। ধান বেচতে হবে ফড়েদের কাছেই! রবিবার নয়ারহাটের ধান চাষী সত্যেন রায় বলেন, এতদিন মান্ডিতে ধান বিক্রি করতে পারতাম না তৃণমূলের ফড়েদের দাপটে। তবুও সহায়ক মূল্যে ধান কেনা হওয়াতে ধানের দাম কিছুটা হলেই মিলতো। এবারে তো মাথায় হাত। বীজ, সার সব বাকিতে কিনেছি। দেনা কি করে মেটাবো?
ঘোকসাডাঙার ধান চাষী মনসুর আলী বলেন, ‘‘রবি মরশুমের এই সময়ে গতবার ফড়েরা ধান কিনতো ২০০০ টাকা কুইন্টাল দরে। এবারে সেই ধানের দাম ১২০০-১৩০০ টাকার বেশি বলছেই না। এই দামে ধান বেচলে খরচের টাকাই তো উঠবে না!’’
সাতমাইলের ধান চাষী দীপক রায় বলেন,‘‘আলু চাষ করে স্বর্বস্বান্ত হয়ে ঋণে টাকা নিয়ে ধান চাষ করেছি। এবারে দাম না পেলে ঋণের ফাঁস গলায় চেপে বসবে। নতুন সরকার তো ধান চাষীকে মেরেই ফেলবে এভাবে!’’
কৃষকসভার কোচবিহার জেলা সভাপতি বিপীন শীল এদিন মেখলিগঞ্জে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘ব্লকগুলিতে এবং জেলা শাসকের কাছে স্মারকলিপিতে আমরা দাবি করবো এসআইআরে যাদের নাম ট্রাইবুনালে আছে তাদের রেশন থেকে ভাতা, এমনকি সব সরকারি সুযোগ থেকে নাম কাটার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাদ পড়া এই নাগরিকদের ৯৫শতাংশ হল কৃষক। এদের বাদ রেখে সমাজের উন্নয়ন কি করে হবে? এরা তো এদেশেরই নাগরিক। অবিলম্বে বৈধ ভোটারদের তালিকাভূক্ত করতে হবে। এছাড়াও জেলায় ছোট বড় সব মিলিয়ে ৩২ টা নদী রয়েছে। বর্ষা এসে গেছে। শুরু হয়েছে ভাঙনের তীব্রতা। সংগঠনের পক্ষ থেকে খোঁজ চালিয়ে দেখা গেছে জেলায় ৪৭ কিমি নদীবাঁধ জরুরী। অথচ নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বাঁধের জন্য কোন বরাদ্দ ঘোষণা করেনি। এবারেও নদী তীরবর্তী এলাকায় চাষের জমি আর কৃষকের ভিটেমাটি নদী গিলে নেবে। আমরা চাই প্রশাসন রবি মরসুমে জেলার ধান চাষীদের ধান সহায়ক মূল্যে কেনার সিদ্ধান্ত নিক। পাশাপাশি এসআইআরে যারা তদন্তের আওতায় আছে তাদের দ্রুত সব সরকারি সুযোগের আওতায় আনুক। নদী ভাঙ্গন রুখতে সরকারের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে জানাক।’’

Comments :0

Login to leave a comment