সূর্য মিশ্র
নির্বাচন একটা রাজনৈতিক সংগ্রাম। কিন্তু আমরা রাজনৈতিক সংগ্রামকে মতাদর্শগত সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে পারি না। নির্বাচনের রাজনীতির মৌলিক চরিত্র হলো রণকৌশলগত বিষয়। মতাদর্শ হলো রণনীতি সম্পর্কিত। আমরা নীতিবিবর্জিত কৌশলের বিরোধিতা করি। সেটা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেই জন্য দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় পরিস্থিতির মধ্যে যে দ্বন্দ্বগুলি তীব্রতর হয়ে উঠছে সেগুলি উপেক্ষা করা যায় না। বিশ্বজুড়ে গণসংগ্রামের শক্তি বাড়ছে।
তাছাড়াও নির্বাচনী সংগ্রামের মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগ্রাম ও সংগঠনের গুরুত্বগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মতাদর্শগত প্রশ্নে সমসাময়িক বিশ্বের প্রধান দ্বন্দ্বগুলির মধ্যে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব অর্থাৎ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বনাম চীনের গণপ্রজাতন্ত্রের সমাজতন্ত্রের অভিমুখে সংগ্রামকেই কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব ছাড়াও অপরাপর মৌলিক দ্বন্দ্বগুলির কোনও একটা যে কোনও সময়ে সাময়িকভাবে তীব্ররূপে সামনে চলে আসতে পারে। যেমনটা আমেরিকা এবং ইজরায়েল জোটের ইরান আক্রমণে সূচনা হয়েছে ইরানের ‘সর্বোচ্চ নেতা’ আয়েতুল্লাহ খামেইনি সহ কয়েকজন নেতৃত্বকে হত্যার মধ্য দিয়ে। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বাতিল না করেই একতরফা আক্রমণের সাফল্য সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন। বিশ্বজুড়ে এই ধারণা দৃঢ় হচ্ছে যে এপস্টিন ফাইলে মার্কিন রাষ্ট্রপতির যে কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে নজর ঘোরাতেই ট্রাম্প তড়িঘড়ি যুদ্ধের পথে গিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই আক্রমণের আগের দিনই খোদ ইজরায়েলে রাষ্ট্রপতি নেতানেয়াহুর পক্ষে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি তখন কিছুই জানতেন না, এটা মেনে নেওয়া যায় না। সবাই জানে স্বাধীনতার পর ভারত ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্যালেস্তাইনের পক্ষ অবলম্বন করেছে, এমনকি অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনও ভারতের এই অবস্থান বহাল ছিল। এসব সত্ত্বেও বর্তমান ভারত সরকার ইরানের দূতাবাসে খামেইনির মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠাতে ৫ দিন সময় নিয়েছে। ইউরোপে স্পেন ফ্রান্স সহ ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধে নিরপেক্ষতার বার্তা দেওয়া হলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী এমন অবস্থানও ঘোষণা করতে পারেননি। তিনি কেবল করোনাকালের মতো আসন্ন সঙ্কট সম্পর্কে লোকসভায় হঠাৎ সতর্কবার্তা দিয়ে গেলেন।
আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও দুনিয়া ও দেশব্যাপী আসন্ন সঙ্কট সম্পর্কে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তাঁর মার্কিন প্রীতি এবং তাঁর প্রতি মার্কিন শাসকদের আস্থার দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে, মহাকরণে তিনি ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে ও পরে হিলারি ক্লিন্টন ও তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। বিজেপি’র মার্কিনসখ্যতার সঙ্গে তৃণমূলের নেত্রীর অবস্থান পৃথক নয়। জ্যোতি বসু বলেছিলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ তিনি বাংলায় বিজেপি’কে ডেকে এনেছেন। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন আর এ রাজ্যে বিজেপি’র বিষবৃক্ষের চারা পুঁতেছিলেন। বাংলায় বামপন্থীদের দুর্বল করে নিজেদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে আরএসএস তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছে। আরএসএস’র পত্রিকা প্রকাশের অনুষ্ঠানে তারা মমতা ব্যানার্জিকে ‘মা দুর্গা’ সম্বোধন করেছিল। মমতা ব্যানার্জিও আরএসএস’কে দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়ে তাদের বাংলায় আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপরে তৃণমূল সরকারে আসীন হওয়ার পরেই বাংলার বুকে আরএসএস’র সক্রিয়তা বেড়ে ওঠে, রাজ্যে তাদের শাখার সংখ্যা, প্রশিক্ষণ শিবির ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের পর্বেও বাংলার মানুষ এই প্রেক্ষাপটকে কিছুতেই ভুলবেন না। বিশ্বের প্রধান শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতে প্রধান বিপদ সঙ্ঘ পরিবার এবং আমাদের রাজ্যে তৃণমূল সরকার— এই তিন শত্রু এক এবং অভিন্ন নয়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র ডবল ইঞ্জিন সরকার হলে, এমনকি তাদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে পশ্চিবঙ্গ রাজ্যটাই ছারখার হয়ে যাবে। তৃণমূল এরাজ্যে ১৫ বছর ক্ষমতাসীন একটা আঞ্চলিক দল যার ছত্রছায়ায় বিজেপি’র সংখ্যাবৃদ্ধি হয়েছে। দুই দলের মধ্যে আনাগোনা বাড়ছে। তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিজেপি’র শক্তি আরও কমাতে হবে। গত একমাসে দুনিয়াজুড়ে শ্রেণি ভারসাম্যের পরিবর্তন হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গেও তার ছাপ পড়বে।
ইতিহাস বলে যখনই জীবন-জীবিকা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপরে আক্রমণ নেমে আসে, তখনই গরিব প্রান্তিক মানুষজন, তফসিলি জাতি, আদিবাসী, অন্যান্য অনগ্রসর অংশের মানুষ, সংখ্যালঘু এবং মহিলাদের অধিকার সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল এবং বিজেপি একসঙ্গেই শিল্পায়নের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় রাজ্যের নতুন প্রজন্মকে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে চলে যেতে হচ্ছে, ভিনরাজ্যে গিয়েও তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে আক্রান্ত হতে হচ্ছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন রাজ্যের ভোটার তালিকায় ‘অনুপ্রবেশকারী’ রয়েছে বলে মিথ্যাচার করেছিলেন। এবার বিধানসভা নির্বাচনের ঘোষণার আগেই বিজেপি নেতারা ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এখন এসআইআর’র নামে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ বলে অথবা সরাসরি নাম বাদ দিয়ে বিপদে ফেলা হয়েছে। অধিকার বিপন্ন হওয়া এই মানুষদের বেশিরভাগই সেই প্রান্তিক অংশের। এঁদের বৃহত্তর সংগ্রামে শামিল করতেই হবে।
বিগত বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী পাঁচ বছরের সময়কালে দুনিয়া দেশ ও রাজ্যের পরিস্থিতির অপেক্ষাকৃত দ্রুত বদল ঘটছে, ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটছে। এই সময়কালে আমাদের পার্টি ও বামপন্থীদের কর্মতৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরানো কায়দায় শাসকদল আর সন্ত্রাস চালাতে পারছে না। নতুন প্রজন্মের বামপন্থীদের এবং বামপন্থী শ্রেণি সংগঠনগুলির দুটি ব্রিগেড সমাবেশে বামপন্থীদের সংগ্রামের তীব্রতা বৃদ্ধির ছবি দেখা গিয়েছে। কোভিড সংক্রমণের সময়কালে রেড ভলান্টিয়াররা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন এসআইআর’এ যাদের ভোটাধিকার আক্রান্ত সেই সব মানুষদের পাশেও বামপন্থী আইনজীবীরা আইনি সাহায্য করতে নেমেছেন। দেশব্যাপী শ্রমিক, কর্মচারী, কৃষকদের আন্দোলন সংগ্রামও তীব্র হয়েছে। নেটে এবং হেঁটে অর্থাৎ চিরাচরিত পদ্ধতির পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারেও বামপন্থীদের সক্রিয়তা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তাদের নিজস্ব দাবি নিয়ে জমায়েত ও সংগ্রামের ক্ষমতা বেড়েছে। তরুণ প্রজন্ম থেকে বামপন্থী যুবক যুবতী কর্মী, নেতৃত্ব এবং নির্বাচনী সংগ্রামের প্রার্থীও উঠে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা মানুষ অনেকাংশে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হচ্ছেন। বিজেপি তৃণমূলের পুরানো রাজনৈতিক খেলা ধরা পড়ে গেছে, আর সহজে সেটা চলছে না।
অন্যদিকে বিশ্ব পরিস্থিতির জন্য জনজীবনের সঙ্কট বাড়ছে। রান্নার গ্যাস ও অটো চালনার গ্যাস, পেট্রল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি তীব্র হয়েছে। সারের দাম বাড়ছে। আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপরে শুল্ক চাপিয়েছে, আর ভারত সরকার ট্রাম্পের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। যদিও বাধ্য হয়ে রাশিয়া থেকে একমাস তেল আমদানির অনুমতি পেয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার সাফল্যের যে সব দাবি করছে, উন্নয়নের যে পরিসংখ্যান দিচ্ছে সেগুলি আদৌ আন্তর্জাতিক তথ্যের তুলনায় বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রকৃত হিসাবে দারিদ্র সীমারেখার নিচে চলে যাওয়া পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। খাদ্য, পুষ্টি, শীতবস্ত্র, বাসস্থান, নিরাপদ পানীয় জল এগুলির সঙ্কট বাড়ছে। শিক্ষা স্বাস্থ্য বিপন্ন, এরাজ্যে হাজার হাজার স্কুল বন্ধ। বেসরকারি স্কুলগুলি সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের আয়ত্তের বাইরে, কিন্তু সরকারি স্কুলপরিষেবার বেহাল দশায় তাদের ব্যবসা বাড়ছে হুহু করে। বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমের চিকিৎসার খরচ। বেকারি বাড়ছে, আধা বেকার, যোগ্যতা অনুসারে কাজ না পাওয়া, সামান্য মজুরিতে কাজ করার ঘটনা বাড়ছে। এরমধ্যে শিক্ষকপদে নিয়োগে বার বার এমন দুর্নীতি হয়েছে যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। দুর্নীতির জন্য এতজন নেতা মন্ত্রী বিধায়ককে একসঙ্গে জেলে যেতে আগে কখনো দেখা যায়নি। অথচ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির ঔদাসীন্যে মামলাগুলির নিষ্পত্তি হয়নি, ন্যায়বিচার এখনও মেলেনি। কর্মসংস্থান কমার সঙ্গে সঙ্গে শ্রম থেকে যে পুঁজির সৃষ্টি হয় তা কমছে, কিন্তু দক্ষিণপন্থার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে লুটেরা পুঁজি। এক্ষেত্রে কোনও উৎপাদন ছাড়াই পুঁজি থেকেই পুঁজি বাড়ে, মাঝখানে উৎপাদন বা শ্রমের কোনও ভূমিকা নেই। মার্কস যাকে পুঁজির আদিম সঞ্চয় বলেছিলেন, সেই লুটেরা পুঁজি পরিবেশ দূষণ সমস্যাটিকেই স্বীকার করে না।
এখনকার সংগ্রামের সাফল্যের আবশ্যকীয় শর্ত হচ্ছে বহুমাত্রিক মেরুকরণের জাল বা নেটওয়ার্ককে ছিন্নভিন্ন করে শ্রেণি ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সকল বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে আসন্ন সংগ্রামে ব্যাপক ঐক্যে শামিল করা। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের বাইরের বামদল, আইএসএফ’কে সঙ্গে নিয়ে এক ব্যাপক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলা যাতে নয়া ফ্যাসিবাদী ধাঁচের শক্তিকে রোখা, তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করা, এবং একটি বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প সরকার গড়ে তোলা যায়। অতীতের দুটি বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া হলেও এবারের বিধানসভা নির্বাচনে প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্বের অনীহার কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন এবং আইসএসএফ’র সঙ্গে আসন সমঝোতা হয়েছে। তাদের নিয়েই বাম গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প গঠনের লক্ষ্যে নির্বাচনী সংগ্রাম শুরু হয়েছে। এরজন্য অত্যাবশ্যক শর্ত হলো তৃণমূল এবং বিজেপি বিরোধী জনসাধারণের ব্যাপক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মঞ্চ গড়ে তোলা। উপরোক্ত রাজনৈতিক দলগুলির সাধারণ সমর্থকদের বাইরেও ব্যাপক অংশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন যারা পরিবর্তন চাইলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নেই। আমাদের আহ্বান ‘নিজের বুথ এলাকাকে ভালোভাবে জানো, এলাকার নির্বাচকমণ্ডলীর প্রত্যেককে চেনো।’ কমরেড বিনয় চৌধুরি বলতেন, আমাদের বিরোধী দলগুলির সর্বভারতীয় নেতৃত্ব, রাজ্য নেতৃত্ব, জেলা ও স্থানীয় নেতৃত্ব এবং তাদের সাধারণ সমর্থকদের সমানভাবে বিচার করা ভুল। বিভিন্ন দলের সাধারণ সমর্থকরাও সবসময় একটি নির্দিষ্ট পার্টিকে ভোট দেন না। তাদের কোনও একটি নির্দিষ্ট পার্টির ভোটার বলে দেগে দেওয়া ভুল। সেই কারণে দলমত নির্বিশেষে বুথ এলাকার সমস্ত সাধারণ মানুষের কাছেই যেতে হবে। আমাদের প্রার্থীকে সমর্থন করার জন্য বিনীত আবেদন জানাতে হবে। তাঁদের পরামর্শ শুনতে হবে, কেউ বলপূর্বক তাড়িয়ে না দিলে প্রত্যেকের কাছেই যেতে হবে। মানুষই ইতিহাস তৈরি করে, কিন্তু তাঁরা তা তৈরি করেন পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা অনুসারে। তাঁরাই আমাদের শিক্ষক।
নির্বাচনী সংগ্রামই আমাদের সংগ্রামের একমাত্র লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য জনসাধারণের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিপীড়িত সমস্ত অংশকে ঐক্যবদ্ধ করা। একবিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্রের উপযোগী সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনগণের ব্যাপক অংশকে জনগণতান্ত্রিক মোর্চা গঠনের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করা। আমাদের পার্টি বা কর্মী বিশেষের সম্পর্কে তাঁদের কোনও সমালোচনা থাকলে তাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য কমিটির বিভিন্ন দলিলে আমরা বহুক্ষেত্রেই ত্রুটি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নিয়েছি, পরে সেগুলি পর্যালোচনা করা হয়। সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার ঐক্যই হলো আলোচনা। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে আমাদের শক্তি বেড়েছে, বিপরীতে এই সত্যকে অস্বীকার করার জন্য কখনো তা কমেছেও বটে। আলোচনার প্রাথমিক শর্ত হলো, পার্টির দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলি যথাসম্ভব প্রতিটি বুথে একক বা যৌথভাবে কেনা ও পাঠ করা। একইভাবে জনগণের কাছ থেকে অর্থসংগ্রহ করতে হবে যাতে জনগণের ব্যাপকতম অংশ এই সংগ্রামের অংশীদার হতে পারেন। আমাদের পার্টির নির্বাচনী প্রতীক সম্পর্কে পরিচিত স্লোগান হলো, ‘সংগ্রামের আরেক ধাপ, কাস্তে হাতুড়ি তারায় ছাপ’। আমাদের সমর্থিত অন্য কোনো দল বা নির্দল প্রার্থী থাকলে এই স্লোগানকে সেই অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে হবে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের, রাজনৈতিক দলগুলির এবং আমাদেরও। সেই আত্মবিশ্বাস, প্রস্তুতি ও সাহসই হলো ফলাফলের সবচেয়ে বড় নির্ধারক— এটাই হলো আমাদের অতীতের সব দুর্দিনের অভিজ্ঞতার শিক্ষা।
Surya Misra
বিজেপি-তৃণমূল নয়, বাংলা বাঁচাবে বাম-গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি
×
Comments :0