ভ্রমণ — বিদেশের / তিন শহরের ইতিকথা
সুমন চ্যাটার্জী
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ১৬ মে ২০২৬
যা দেখা যায়, সেটুকুই সবটা নয়, ভিয়েনা, এক নিরপেক্ষ ও নীরব শহরের বৃত্তান্ত
শীতযুদ্ধের দিনগুলিতে এই ভিয়েনা নিরপেক্ষতার নামে এক আলাদা ও স্বতন্ত্র ভূমিকা নিয়েছিল। এই সময় ভিয়েনা হয়ে উঠেছিল এমন এক জায়গা, যা ওই সমকালীন বিশ্বের সকল মহাশক্তিগুলির গোয়েন্দা ও গুপ্তচর সংস্থার জন্য ছিল খোলা ময়দান। সোভিয়েতের কেজিবি, আমেরিকার সিআইএ, ইজরায়েলের মোসাদ, ইংল্যান্ডের এমআই সিক্স, ভারতের র, ইস্ট জার্মানির স্তাসি, ওয়েস্ট জার্মানির বি এন ডি, পোল্যান্ডের এমবিপি কিংবা পাকিস্তানের আইএসআই, সকলের জন্য ভিয়েনা ছিল এক এমন শহর, যেখানে একসাথে পাশাপাশি থেকে নিজেদের কাজ এবং তথ্যের আদান-প্রদান চালানো যেত বন্ধু ও শত্রু উভয়ের সাথেই।
সুন্দরী ভিয়েনা সবকিছু জেনেও নিজের জীবনেই ব্যস্ত থাকত।
এখানে সবাই ছিল, এবং সেই সবাইরা একে অপরের কথা জানতও কিন্তু সহাবস্থানের নীতি সকলেই মেনে চলত। ভিয়েনা শহর সকলকে নিয়ে এবং একই সাথে সকলকে আড়াল করে নিজের গতিতে এগিয়ে যেত।
এই দ্বৈততা ভিয়েনার শরীরের প্রতিটি অংশে আজও বিদ্যমান। প্রথম নজরে দেখতে পাওয়া শহর এবং কাছ থেকে দেখতে পাওয়া শহরের জীবন এক ব্যবধান নিয়েও বিদ্যমান।
বিভিন্ন দেশের লাইন দিয়ে দাঁড়ানো দূতাবাসগুলির সামনে দিয়ে চলার সময় যখন আজকে আমরা তৎকালীন দুই জার্মানির প্রায় মুখোমুখি কিংবা সামান্য দূরে আজকের রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত) এবং মার্কিন দূতাবাসের ভবনগুলো দেখি, আমরা হয়তো বা ভাবতেও পারব না, সেই চাপা উত্তেজনার দিনগুলি এই একই রাস্তার ধারে আজও দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল বাড়িগুলিতে কী রকম ছিল।
শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কল্লোলিনী দানিয়ুব নদীর দিকে গেলেই কিংবা শহরের ব্যস্তসমস্ত রাস্তাগুলির থেকে একটু বাইরে বেরোলেই সেই পুরনো আবাসনগুলি এখনও চোখে পড়ে। একেবারেই নতুন কিছু না কিন্তু সেগুলিকে ফেলে রাখাও হয়নি। দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্যতার মধ্যেই তারা ঠিক টিকে আছে। সময়ের সাথেই সেই আবাসনগুলির দিকে তাকালে দেখা যায় বদলের ছায়া কিন্তু তাদের উপস্থিতি আজও প্রবল।
ভিয়েনা তার অতীতকে অস্বীকার করে না, সরিয়েও রাখে না, আবার তাকে আলাদা করে চোখের সামনে তুলেও ধরে না; বরং সময় এবং ইতিহাসের স্বাভাবিক প্রগতি ও পরিবর্তনের মতন তার অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি, অনতিদূরে টিকে থাকে। কোনো বিরোধ বা সংঘাত ছাড়াই এই শহর তার ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করে, অস্বীকার করে না।
প্রাগে যেভাবে ইতিহাসকে লুকিয়ে রাখা হয়, ভিয়েনাতে তা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। এমনভাবে যাতে আলাদা করে খুঁজে নিতে না হয়। পার্থক্যটা এখানেই; একটি শহর তার অতীতের থেকে মুখ ঘুরিয়ে বসে এবং আরেকটি শহর এখনও এক আন্তরিক কথোপকথনে ব্যস্ত।
চোখ ছোট করে, মন দিয়ে দেখলে সেটাই মনে হয়।
শেষ বিকেলে, অফিসের শেষে, ঘরফেরতা মানুষজনকে নিয়ে যখন সুদৃশ্য ট্রামগুলি চলতে থাকে, সূর্যের আলো ধীরে ধীরে হাইরাইজের পিছনে হারিয়ে যায়, হোটেলের সুবিশাল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সুন্দরী ভিয়েনাকে দেখলে মনে হয় সবকিছু একদম সঠিক জায়গায় আছে, কোনো অদরকারি তাড়াহুড়ো নেই, অতিরিক্ত শব্দ নেই। কিন্তু সেই পরিপাট্যের ভেতরেই থেকে যায় এক অদৃশ্য স্তর, চোখে দেখা যায় না কিন্তু আবার সেটা হারিয়েও যায় না। এই ইউনিক ব্যাপারটিই ইউরোপের অন্যান্য রাজধানীগুলির থেকে ভিয়েনাকে আলাদা করে তোলে। কারণ এই শহরকে একবারে বোঝা যায় না; যা দেখা যায় সেটুকুই, বাকিটুকু লুকিয়ে থাকে সময় ও যাপনের অন্তরালে।
চলবে
Comments :0