Petro prices

দাম বাড়ছে পেট্রল-ডিজেল-গ্যাসের

সম্পাদকীয় বিভাগ

দেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখতে কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমদানি করা পণ্য ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে দেবার পরামর্শ দিয়েছিলেন দেশবাসীকে। নির্দিষ্ট করে বলেছিলেন বিদেশ ভ্রমণ না করতে, সোনা-রূপা সহ মূল্যবাদ ধাতু কেনা বন্ধ করতে। সর্বোপরি বলেছিলেন তেল-গ্যাস আমদানি খরচ কমাতে গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে ট্রেনে-বাসে যাতায়াত করতে। এবার জনগণের ভরসায় অপেক্ষা না করে সরকার নিজেই এমন ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে মানুষ বাধ্য হয় সোনা-রূপা না কিনতে বা কম কিনতে। আর দু’-একদিনের মধ্যেই তেলের ক্ষেত্রেও যে অনুরূপ ব্যবস্থা সরকার নিতে চলেছে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত সরকারি, বেসরকারি নানা মহল থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। পেট্রলিয়াম মন্ত্রী হরদ্বীপ সিংপুরি এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রার কথা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে সরকার তেলের দাম বাড়ানোর সবুজ সঙ্কেত দিয়ে দিয়েছে। এখন তেল বিপণন সংস্থাগুলি বৃদ্ধির হার বা পরিমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবে।
অতীতে গৌরচন্দ্রিকা ছাড়াই যখন তখন পেট্রল-ডিজেল-গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিত সরকার। এবার অতিমাত্রায় গৌরচন্দ্রিকা সহ নানা নাটক চলছে। আসলে নির্বাচনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে অনেকদিন পেট্রল-ডিজেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলারের নিচে ছিল। দেশে যে দামে পেট্রল-ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল তাতে তেল কোম্পানিগুলির লোকসানের প্রশ্নই ছিল না। বরং ভালো পরিমাণে মুনাফা ঘরে তুলছিল বছর বছর। তাই অনেক বছর দাম বাড়েনি বলে এখন দাম বাড়াতে হবে এমন যুক্তি সাধারণ মানুষকে বোকা বানানোর কৌশল মাত্র।
সমস্যা দেখা দিয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল জোট বেঁধে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর। যুদ্ধের জেরে গত আড়াই মাস ধরে হরমুজ প্রণালী জাহাজ চলাচলের জন্য বিপজ্জনক হয়ে আছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ যায় এই প্রণালী দিয়ে। ভারত তার চাহিদার ৮৯ শতাংশ অশোধিত তেল আমদানি করে। তার অর্ধেকটাই আসে এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। তেমনি গ্যাস আমদানির ৬০ ভাগ আসে এই পথে। হরমুজ বন্ধ হয়ে যাবার ফলে ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছে ভারত। একদিকে ইরান যুদ্ধজনিত পশ্চিম এশিয়ায় সঙ্কট যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত ঘটাতে শুরু করে তখন থেকে বিশ্ব বাজারে বাড়তে শুরু করে তেলের দাম। গত আড়াই মাসে দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। ভারতের বিপদ আবার দ্বিমুখী। একদিকে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি অন্যদিকে জোগান ঘাটতি বা সঙ্কট। তারপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য হুহু করে পতন। একে তেল মিলছে না, যেটুকু মিলছে তারও দাম বেশি। টাকার দাম কমে যাবার ফলে খরচ বাড়ছে আরও এক দফা। ফলস্বরূপ বিদেশি মুদ্রা বেরিয়ে যাচ্ছে বানের জলের মতো। অথচ বিদেশি মুদ্রা অর্জনের রাস্তাগুলিও এই সময় সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে। বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের আয় আগের থেকে আসা কমেছে। বিদেশি লগ্নিকারীরা ভারত থেকে লগ্নি তুলে নিয়ে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় ছোট করে দিচ্ছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও আসছে না। এই অবস্থায় কার্যত দিশাহারা অবস্থা মোদী সরকারের। বিদেশি মুদ্রা রক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত দেশবাসীর কাছে হাত পাতছেন মোদী। অথচ ভোটের দু’মাস লাগাতার বলে গেছেন কোনও সমস্যা নেই। অর্থনীতির ভিত অত্যন্ত শক্তিশালী, কোনও প্রভাব পড়বে না। দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি আছে। আশঙ্কার কোনও কারণ নেই। কিন্তু ভোট শেষ হতেই জানা গেল কোনও কিছুই ঠিক নেই। সবটাই ভয়ানক সঙ্কটের আবর্তে। মোদীরা ভোটে জেতার জন্য মিথ্যা বলে মানুষকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করেছেন। আজ যখন ব্যর্থ সরকার অসহায় তখন দাম বাড়ানো ছাড়া কিছু ভাবতে পারছেন না। বন্ধু কর্পোরেটকে সুরক্ষিত রেখে সঙ্কটের যাবতীয় বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপাতে বদ্ধপরিকর। তখন নানা বায়নাক্কা করে জমি তৈরি করে দাম বাড়ানোর মওকা খুঁজছে। শেষ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি তেলে আটকে থাকবে না, ছড়াবে সব পণ্যে সব পরিষেবায়। সাধারণ মানুষের জীবন যন্ত্রণার নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।

Comments :0

Login to leave a comment