তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে বিদ্রোহের জল্পনা ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন, লোকসভায় নিজেদের শক্তি আরও বাড়িয়ে আগামী বাদল অধিবেশনে ফের ডিলিমিটেশন বিল আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।
আগামী জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। সেই অধিবেশনেই সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিল বা ডিলিমিটেশন বিল পুনরায় পেশ করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর। ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভা ও বিধানসভা কেন্দ্রগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে আনা এই বিলটি গত এপ্রিলে সংসদে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায় পাস হয়নি।
এনডিএ বর্তমানে লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। সেই কারণেই এপ্রিল মাসে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের সাংবিধানিক সংশোধনী বিলও পাস করানো সম্ভব হয়নি। ওই বিলটি ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকায় সেটিও কার্যকর করা যায়নি।
এরই মধ্যে সোমবার তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেন, লোকসভায় দলের ২০ জন সাংসদের সমর্থন তার সঙ্গে রয়েছে। বিদ্রোহী সাংসরা জানিয়ে দিয়েছে তারা এনডিএতে যুক্ত হয়ে তিন বছর কাজ করতে চায়।
বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূলের ২৯ জন সাংসদ রয়েছেন। বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদ পৃথক গোষ্ঠী গঠন করে কেন্দ্রে এনডিএ সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তবে লোকসভায় এনডিএর সংখ্যা প্রথমবারের মতো ৩০০-এর গণ্ডি অতিক্রম করবে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত এম কে স্ট্যালিন-নেতৃত্বাধীন দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝগম-এর সঙ্গেও বিষয়ভিত্তিক সমর্থন নিয়ে আলোচনা চলছে বলে রাজনৈতিক সূত্রে খবর। ডিএমকের ২২ জন লোকসভা সাংসদের সমর্থন মিললে এনডিএ আরও বড় শক্তি অর্জন করবে।
বিজেপির এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, বর্ষাকালীন অধিবেশনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিল আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করার সাংবিধানিক সংশোধনী বিল এবং ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন’ সংক্রান্ত প্রস্তাব। তবে এই বিলগুলি পেশ করার আগে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার আরও কাছাকাছি পৌঁছতে চাইছে সরকার।
লোকসভার বর্তমান কার্যকরী সদস্যসংখ্যা ৫৪০, কারণ তিনটি আসন— বসিরহাট, শিলং এবং নওগাঁ শূন্য রয়েছে। ফলে কার্যকর সদস্যসংখ্যার ভিত্তিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৩৬০ জনের সমর্থন।
বর্তমানে এনডিএর সমর্থন রয়েছে ২৯৩ জন সাংসদের। তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ সাংসদ সমর্থন দিলে সংখ্যা বেড়ে হবে ৩১৩। ডিএমকের ২২ সাংসদের বিষয়ভিত্তিক সমর্থন পেলে তা দাঁড়াবে ৩৩৫-এ। পাশাপাশি শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে)-এর ৯ সাংসদের মধ্যে সম্ভাব্য ভাঙনের মাধ্যমে আরও ৬ জনের সমর্থন পাওয়ার আশাও করছে এনডিএ। সেক্ষেত্রে সংখ্যা পৌঁছতে পারে ৩৪১-এ।
এপ্রিল মাসে সাংবিধানিক সংশোধনী বিলের ভোটাভুটিতে এনডিএ ২৯৮টি ভোট পেয়েছিল, যা তাদের নিজস্ব শক্তির চেয়ে কিছুটা বেশি। সেই অতিরিক্ত সমর্থনের হিসাব ধরলে সম্ভাব্য সংখ্যা ৩৪৮-এ পৌঁছতে পারে, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার থেকে মাত্র ১২ কম। ছোট দল, নির্দল সাংসদ এবং সম্ভাব্য ক্রস-ভোটিংয়ের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের আশা করছে শাসক জোট।
সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করাতে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। অর্থাৎ, সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্তত অর্ধেক উপস্থিত থাকতে হবে এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে হবে।
রাজ্যসভাতেও এনডিএর অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত। তৃণমূলের রাজ্যসভার সদস্য সুখেন্দু শেখর রায় ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, তিনি বিজেপির সমর্থনে পুনরায় রাজ্যসভায় ফিরতে পারেন। তৃণমূলের আরও কয়েকজন সদস্য একই পথ অনুসরণ করতে পারেন বলেও জল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে রাজ্যসভায় এনডিএর সংখ্যা ১৫০-এর গণ্ডি অতিক্রম করেছে। সেখানে ডিএমকের ৮ সদস্যও বিষয়ভিত্তিক সমর্থন দিলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৬৪ আসনের লক্ষ্যের আরও কাছে পৌঁছে যাবে শাসক জোট।
সব মিলিয়ে, তৃণমূলে সম্ভাব্য ভাঙন, ডিএমকের অবস্থান এবং অন্যান্য ছোট দলের সমর্থনের সমীকরণকে সামনে রেখে আগামী বাদল অধিবেশনকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন জল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সমস্ত সম্ভাবনা এখনও রাজনৈতিক সূত্রনির্ভর এবং বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।
Parliament
তৃণমূলে ভাঙনের জল্পনার মধ্যেই ফের ডিলিমিটেশন বিল আনার প্রস্তুতি এনডিএর, নজরে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
×
Comments :0