গল্পগল্প
নতুনপাতা
--------------------------
ফটো
--------------------------
সৌরীশ মিশ্র
"মামদিদি, তুমি উঠে পড়েছো?" মামাতো দিদি মামের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কথাকটা বলল বাবাই।
মাম ওর বিছানায় বসে কোলে ল্যাপটপটা রেখে তার কলেজের একটা প্রোজেক্টের কাজ করছিল। বাবাই-এর কথাটা শুনে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে বাবাই-এর দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি কি তোর মতোন কুম্ভকর্ণ যে ন'টার সময় ঘুম থেকে উঠব?"
গত পরশু মামার বাড়ি এসেছে বাবাই। আজ চলে যাবে সে তার নিজের বাড়ি। সময় সুযোগ পেলেই সে চলে আসে এখানে। দারুণ সময় কাটে যে ওর এই বাড়িতে। তার প্রধানতম কারণ অবশ্যই, ও যে ওর মামদিদির ভীষণই ন্যাওটা।
যাই হোক। মামদিদির বলা এই ধরনের কথা বিশেষ ধরে না বাবাই। একরকম এ কান দিয়ে ঢুকিয়ে ও কান দিয়ে বের করে দেয়। সে মামের বিছানায় মামের পাশটায় আয়েস করে বসল। তারপর বলল, "তোমার ফোনটা একটু দেবে আমায় মামদিদি?"
"কি করবি? গেমস খেলবি?"
"না গো। একটা ইংলিশ নিউজপেপারের আজকের ই-পেপারটা একটু চেক্ করব।"
"নে।" নিজের মোবাইলটা বাবাই-এর দিকে এগিয়ে দেয় মাম।
মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে দ্রুত কয়েকবার আঙুল চালায় বাবাই। তারপর কয়েকক্ষণ দেখে কি যেন। তারপর ফোনটা ফের মামের দিকে এগিয়ে দিয়ে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে, "ধ্যুস্, আজকেও দেয়নি। আর দেবে না।"
ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে ফের চোখ সরিয়ে ছোট্ট ভাইটার দিকে তাকায় মাম। "কি ব্যাপার? এতো বিরক্তিই বা কিসের? আর কেই বা কি দেবে না?"
"ঐ যে ইংলিশ ডেইলিটার ই-পেপার চেক্ করলাম না," বাবাই বলতে শুরু করে, "ওরা রিডার্সদের কাছ থেকে তোলা ছবি ইনভাইট করে আর তার মধ্যের তিনটে করে সিলেক্ট করে ওরা ছাপে ওদের কাগজে প্রতি রবিবার। বাবা যে আমাকে বাবার পুরোনো ফোনটা দিয়েছে, তা তো তুমি জানো। আমি ওতে ছবি তুলে, বেছেবুছে কত্তোগুলো ছবি পাঠিয়েছি ওদের। তার মধ্যের একটাও ছাপেনি এখনও জানো! তাই বলছিলাম, আর ওরা ছাপবে না আমার তোলা ছবি।" বাবাই-এর গলায় হতাশা।
মাম ছোট্ট ভাইটার কথাগুলো শুনে ল্যাপটপটা কোল থেকে নামিয়ে বিছানায় রাখে। তারপর কিছু একটা ভাবে কয়েকক্ষণ। এরপর জিজ্ঞেস করে বাবাইকে, "আচ্ছা, দুটো কথা বল্ তো আমায়।"
"কি?"
"এই কন্টেস্টটা নতুন চালু করেছে কি ওরা? আর, তুই কতোদিন ধরে পাঠাচ্ছিস ওতে ছবি?"
"এই কন্টেস্টটা নতুন নয় গো মামদিদি। বহু বছর ধরে টানা চলছে এই কন্টেস্টটা। খুব পপুলার এটা রিডারদের কাছে। আর, আমি পাঠাচ্ছি ছবি, এই ধরো, মাস দুয়েক।"
"ও এইবার বোধহয় বুঝতে পেরেছি তোর ছবি এখনও ছাপেনি কেন।"
"কেন গো মামদিদি?" নড়েচড়ে ব'সে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে বাবাই।
"যেহেতু আগে থেকেই কন্টেস্টটা চলছিল, হতেই পারে, তোর ছবি পাঠানোর আগেই আরো কিছু ছবি সিলেক্ট হয়ে আছে ওদের কাছে। এটা স্বাভাবিকও। তাছাড়া, এও হওয়া আশ্চর্যের নয়, তুই এই দুই মাসে যেসব ফটো পাঠিয়েছিস তার মধ্যেও ছবি সিলেক্ট হয়েছে। কিন্তু, তুই তো আর লাটসাহেব নোস্ যে সবাইকে সুপারসিড করে তোর ছবিটা আগে ছেপে দেবে।"
"হ্যাঁ, এটা হতে পারে।" মাথা নেড়ে-নেড়ে বিজ্ঞের মতোন বলে বাবাই।
"আমি তো কনফার্ম বলতে পারব না, তবে আমার মনে হয় এটাই হয়েছে। আর একটা কথা সব সময় মনে রাখবি, কোনো কিছুতেই ইমপেশন্ট হ'বি না কখনো। পেশন্স তোকে রাখতেই হবে। তাই, ধৈর্য ধরো, বৎস।"
"মৎস্য? মৎস্য মানে তো মাছ। আমাকে মাছ বললে?"
"আজকাল কানেও কম শুনছিস না কি? আরো কুম্ভকর্ণ-এর মতোন ভোঁস ভোঁস করে ঘুমা যখন-তখন, দেখ্ না আরো কতো কিছু হবে তোর। আমি মৎস্য বলি নি ছাগল, বৎস বলেছি, বুঝলি?" শেষ বাক্যটা বেশ একটু চেঁচিয়েই বলে মাম।
বাবাই দু'হাত দিয়ে দু'কান চাপা দিয়ে কোনোমতে বলে, "বুঝেছি, বুঝেছি।"
ঐ দিনের পর কেটে গিয়েছে আরো দু'-দুটো মাস পুরো। বাবাই এর মধ্যে ওর তোলা আরো কয়েকটা ছবি পাঠিয়েছে ঐ খবরের কাগজের দপ্তরে ই-মেল মারফত। কিন্তু, এখনও তার ছবি ছাপেনি ঐ ইংলিশ ডেইলি।
ঠিক এরপরের রবিবারের কথা। সকালবেলা। মামের মোবাইলটা বেজে উঠল হঠাৎই। ব্রেকফাস্ট করছিল সে। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখল খেতে খেতেই মাম। পিসিয়ার নাম স্ক্রিনে। বাঁহাতে ফোনটা ধরে ও।
"হ্যাঁ বলো পিসিয়া?"
"মা না, আমি বলছি মামদিদি।" বাবাই-এর কণ্ঠস্বরে মাম পরিস্কার বুঝতে পারে ছোট্ট ভাইটা তার রীতিমতো উত্তেজিত।
"হ্যাঁ বল্।"
"আমার একটা তোলা ছবি আজ ছেপেছে গো মামদিদি সেই যে ইংলিশ নিউজপেপারটার কথা বলেছিলাম না তোমায় কিছুদিন আগে সেইটায়। আমার প্রথম পাঠানো ছবিটাই ছেপেছে ওরা জানো। তার মানে, ছবিটা সিলেক্টেড করে ওরা কিউয়েই রেখেছিল। তুমি একদম ঠিক বলেছিলে। এখন ওটার টার্ন আসতে ওটা ছেপেছে। তুমি ছবিটা দেখো কেমন ই-পেপারটায়।" টানা কথাগুলো বলে এবার একটু দম নেয় বাবাই।
"সেটা আবার তোকে আমায় বলে দিতে হবে! দেখবো তো নিশ্চয়ই। তোর মামা, তোর মামিমা, এছাড়াও আমার জানোশোনো সব্বাইকে দেখাবো। আমার ভাই-এর তোলা ছবি ছেপেছে এতো বড় একটা কাগজে এ কি কম আনন্দের আমার কাছে?"
"থ্যাংক্স, মামদিদি।"
"থ্যাংক্স-ট্যাংক্স রাখ্ তোর কাছেই। ওসব ছাড়্। তাহলে, আমার কুম্ভকর্ণটা শুধু ভালো ঘুমোতেই পারে না, ভালো ফটোও তুলতে পারে।"
মামের কথাটা শুনে মজা পায় বাবাই। খিক্ খিক্ করে হেসে দেয় সে।
বাবাই-এর হাসির শব্দ ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসতেই এক চিলতে হাসি উঁকি মারে মামের ঠোঁটের কোনাতেও।
---------------------------------
Comments :0