এককথায় অসাধারণ বা অভূতপূর্ব বললেও কম বলা হবে। মোদী সরকারের একতরফা ও একগুঁয়ে জনবিরোধী নীতি ও কাজের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে প্রতিবাদে ঝলসে ওঠার যে অকুতোভয় সাহস দেখিয়েছেন দেশের শ্রমজীবী মানুষ তা ভারতের ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক নতুন অধ্যায়। দেশের ১০টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন এবং একাধিক শিল্প ক্ষেত্রের ফেডারেশনগুলি জোট বেঁধে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের যে ডাক দিয়েছিল তাতে যোগ দেয় কৃষক ও খেতমজুর সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ সংযুক্ত কিষান মঞ্চ। ফলে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে শহর-শিল্পাঞ্চল ছাড়িয়ে গ্রাম-গঞ্জের প্রান্ত পর্যন্ত। ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ এই ধর্মঘটে অংশীদার হলেও আরও অনেক শ্রমজীবী মানুষ আছেন যারা ধর্মঘটের সমর্থক হলেও নানা অনিবার্য কারণে অংশ নিতে পারেননি।
নিতান্তই ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিশেষ করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের রুটি-রুজির জন্যই ধর্মঘটে নেমেছিলেন তারা। সরকারকে বুঝিয়ে দিয়েছেন দেশটা শাসক নেতাদের ব্যক্তিগত নয় বা তাদের অতি ঘনিষ্ঠ কর্পোরেট মালিক ও বিত্তবানদের নয়। দেশটা ১৪০ কোটি মানুষের। এই দেশে মোদী-আদানি-শাহ-আম্বানিদের যতটা হক ততটাই একজন খেতমজুর, একজন গিগ কর্মী এবং একজন মিড ডে মিল কর্মীরও। দেশের সংবিধান বড়লোকদের সেবা করার নির্দেশ সরকারকে দেয়নি। দেয়নি ধর্মের ধ্বজা ওড়ানোর অধিকারও। দেশ সেবার নামে ভণ্ডামির অধিকারও দেয়নি প্রধানমন্ত্রীকে।
দেশটা ১৪০ কোটি মানুষের। তাই সরকারের দায় সকলের স্বার্থে কাজ করা, হাতে গোনা কোটিপতিদের সেবা করা নয়। মানুষ ভোট দিয়ে সরকার গড়ে। কিছু কোটিপতির ভোটে সরকার তৈরি হয় না। প্রতিটি নাগরিকদের জন্য যে মৌলিক অধিকারের কথা বলেছে তাকে সুরক্ষিত ও প্রসারিত করা সরকারের কাজ। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তাদের সকলের জন্য স্বাস্থ্যকর বাসস্থান, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাই সরকারের প্রাধান্য হওয়ার কথা। অথচ সেটা গুরুত্ব পায় না। সরকার যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অনুধাবন করে তাহলে ন্যায্য ও সমতা তাদের কাজের প্রথম শর্ত হবে। কিন্তু আগাগোড়া বিত্তবান-কর্পোরেটের সেবায় মত্ত। তাই ন্যূনতম মজুরি অর্থাৎ সপরিবারে বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু মজুরি প্রয়োজন তা এদেশে মোট শ্রম শক্তির ৯৫ শতাংশ পান না। অথচ তাদের উপর অনবরত বোঝা চাপানো হচ্ছে। শিক্ষার খরচ, চিকিৎসার খরচ, খাদ্যের খরচ, বাসস্থানের খরচ এতটাই লাগামছাড়া যে সাধধারণ মানুষের অবস্থা খুবই সঙ্গিন।
সরকারের নীতি কর্পোরেট-বিত্তবানদের নানাভাবে ছাড় দিয়ে এবং সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের আয় বৃদ্ধির ঢালাও ব্যবস্থা করা। তার ফলে রাজস্ব সংগ্রহের বোঝা চাপে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। সরকারের আইন সংশোধিত হয় শিল্পে-বাণিজ্যে মালিকদের দায় কমিয়ে মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। শ্রমিকরা যাতে রুখে দাঁড়াতে না পারে, জোট বেঁধে আন্দোলন করতে না পারে তার জন্যই আইন সংশোধন। সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি প্রকল্প সঙ্কুচিত হয়, বরাদ্দ ছাঁটাই হয়। সাধারণ শ্রমজীবীদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রত্যাহৃত হয়। অর্থাৎ শ্রমজীবীদের অসহায়তা ও বিপন্নতা বাড়িয়ে কর্পোরেট-বিত্তবানদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির ব্যবস্থা হয়। তার ফল দ্রুত অসাম্য-বৈষম্য বৃদ্ধি। অর্থাৎ সংবিধানের নির্দেশের বিপরীত পথে চলছে এই সরকার। এর বিরুদ্ধেই গর্জে উঠেছে ভারতের শ্রমজীবী জনগণ। নজিরবিহীন ধর্মঘটে সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে স্বেচ্ছাচারী পথে সরকার চলবে না। দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে অস্বীকার করা যাবে না। ভবিষ্যতে বুঝে-শুনে চলতে হবে। না হলে দেশ অচল করে দিতে শ্রমিকরা দু’বার ভাববেন না।
12th February Strike
সতর্কবার্তা
×
Comments :0