গল্প
শেষ চপ-মুড়ি ও এক টুকরো আকাশ
সায়ন সরকার
নতুনপাতা / ৪র্থ বর্ষ / ১৮ জুলাই ২০২৬
দমদম স্টেশনের ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মের সেই কোণটা এখন বড্ড ফাঁকা। যে জায়গায় বিনয় কাকা গত কুড়ি বছর ধরে চপ-মুড়ির পসরা সাজিয়ে বসতেন, আজ সেখানে কেবল ধুলো আর ঝাড়ুদারের বিড়ির ছাই। সরকার জায়গাটা 'ক্লিয়ার' করে দিয়েছে। স্টেশনের আধুনিকীকরণ হবে, সুন্দর হবে সবকিছু—এমনটাই শোনা গেছে। কিন্তু এই ‘সুন্দর’-এর নিচে যে হাজারো পরিবারের পেটে লাথি পড়ল, সেই হিসেবটা বোধহয় সরকারি ফাইলে কোথাও নেই।
বিনয় কাকার ছেলে অর্ণব। ক্লাস টেন-এর ছাত্র। অসম্ভব মেধাবী, কিন্তু পরিস্থিতি তাকে খুব তাড়াতাড়ি বড় করে দিয়েছে। বাড়িতে এখন চুলা জ্বলে না বললেই চলে। মা লোকের বাড়িতে কাজ করেন, আর বাবা? বাবা এখন বেকার। ইদানিং বিনয় কাকাকে সারাদিন চুপচাপ বাড়ির দাওয়ায় বসে থাকতে দেখা যায়। তার সেই পরিচিত মুখ, সেই হাঁকডাক—সব যেন কোনো এক অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে।
অর্ণবের প্রাইভেট পড়ার মাইনে জমানোটা এখন এক হিমালয় জয়ের মতো লড়াই। প্রতি মাসের শুরুতে স্যার যখন মাইনের কথা মনে করিয়ে দেন, অর্ণবের মনে হয় তার বুকের ভেতর কেউ ধারালো ছুরি চালাচ্ছে। সে বাড়িতে এসে দেখে, বাবা তার পুরোনো ঘড়িটা বা জামাটা বিক্রি করার চেষ্টা করছেন।
একদিন অর্ণব চিৎকার করে উঠল, “বাবা, আর কতদিন এভাবে চলবে? আমি কাল থেকে স্কুলে যাব না। পড়াশোনা ছেড়ে দেব।”
বিনয় কাকা ছেলের দিকে তাকালেন। সেই চোখে জল নেই, আছে এক গভীর প্রশান্তি। মৃদু হেসে বললেন, “অর্ণব, তুই এই স্টেশনের দিকে তাকিয়ে দেখিস না। তুই ওপারে ওই যে স্কুলটার দিকে তাকা। স্টেশনের চপ-মুড়ি শেষ হতে পারে, কিন্তু তোর স্বপ্নের উড্ডয়ন যেন শেষ না হয়।”
অর্ণবের খুব রাগ হলো। সে ভাবল, বাবা বাস্তবতা বোঝেন না। দারিদ্র্য যে কতটা অপমানজনক, তা শুধু সে-ই বোঝে। প্রাইভেট টিউশনে যাওয়ার সময় সে বাবার জীর্ণ পোশাক আর মলিন মুখ এড়িয়ে দ্রুত হাঁটত, পাছে বন্ধুরা দেখে ফেলে। স্টেশনের ধুলোমাখা এক হকারের ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতে তার লজ্জা হতো। সে চাইত, বাবা যেন অন্তত স্টেশনের ধারেকাছে না যান।
পরীক্ষার ফল বেরোলো। অর্ণব তার স্কুলের মধ্যে প্রথম হলো। চারিদিকে জয়ের আনন্দ, কিন্তু অর্ণবের মনে অদ্ভুত এক শূন্যতা। বাড়িতে গিয়ে সে বাবাকে কথাটা বলবে ভেবেছিল, কিন্তু বাবাকে ঘরে পাওয়া গেল না। মা বললেন, “তোর বাবা নাকি কোনো কাজে বাইরে গেছে। তুই চিন্তা করিস না।”
কিছুদিন পর অর্ণব বৃত্তি পেল। বড়সড় একটা চেক তার হাতে। সে ঠিক করল, এই টাকা দিয়ে বাবার পুরনো ব্যবসার মতো ছোট কোনো দোকান দেবে, যাতে বাবা আর এভাবে হাত পাততে না পারেন। সে দৌড়ে গেল সেই চিরচেনা স্টেশনে। যেখানে একসময় বাবার দোকান ছিল, সেখানে এখন নতুন চকচকে টাইলিংয়ের কাজ চলছে।
হঠাৎ অর্ণবের চোখ গেল একদিকের ভিড়ে। ট্রেনের কামরা থেকে নামছেন এক যাত্রী, হাতে ভারী দুটো ট্রলি ব্যাগ। হকারদের জায়গা দখলমুক্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ তো আর না খেয়ে থাকতে পারে না। ট্রেনের কামরায় কামরায় এখন যারা হকারি করছে, তাদের মধ্যে এক প্রৌঢ়কে দেখল সে। ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে, সিট থেকে সিটে হাপাতে হাপাতে খাবার বিক্রি করছেন সেই মানুষটা।
অর্ণব থমকে দাঁড়াল। বুকটা ধক করে উঠল। সেই মানুষটি অন্য কেউ নন, তার বাবা। বিনয় কাকা। তিনি তো হকার ছিলেন, এখন কুলির কাজ করছেন? না, তিনি হকারিই করছেন, কিন্তু নিষিদ্ধ হওয়ার ভয়ে এখন তিনি প্ল্যাটফর্মে বসেন না। ট্রেনের ভেতরে লুকিয়ে খাবার বিক্রি করেন।
অর্ণব এগিয়ে গেল। বিনয় কাকা তখন এক যাত্রীকে একটা প্যাকেট দিচ্ছেন। তার গায়ের শার্টটা ঘামে ভেজা, কপাল থেকে গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল। অর্ণব ডাকল, “বাবা!”
বিনয় কাকা চমকে উঠলেন। ছেলের পরনে স্কুল ইউনিফর্ম, চোখে জল। তিনি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলেন। বললেন, “অর্ণব! তুই এখানে কী করছিস? বাড়ি যা।”
অর্ণব বাবার হাতের ব্যাগটা কেড়ে নিল। কান্নাভেজা গলায় বলল, “তুমি এটা কেন করছ বাবা? আমি তো বলেছিলাম, আমি আর পড়ব না।”
বিনয় কাকা ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। চারপাশে ট্রেনের শোরগোল, কিন্তু সেই মুহূর্তে স্টেশনের সবকিছু যেন থেমে গেল। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, “অর্ণব, সরকার ফুটপাত খালি করতে পারে, কিন্তু বাপের স্বপ্ন খালি করতে পারে না। তুই যখন ক্লাসে বসে অংক করিস, তখন আমি ট্রেনের কামরায় বসি। তুই যখন বইয়ের পাতায় ভবিষ্যৎ লিখিস, আমি তখন আমার ঘাম দিয়ে সেই কালির জোগান দিই। তুই লজ্জা পাচ্ছিস আমার জন্য? তুই জানিস না, এই প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় আমার জীবন কেটেছে যাতে তোর জীবন ধুলো না হয়।”
অর্ণবের মনে হলো, সে আজই সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেল। দারিদ্র্য কোনো অপরাধ নয়, অপরাধ হলো হাল ছেড়ে দেওয়া। স্টেশনের চপ-মুড়ির দোকান উচ্ছেদ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এক বাবার অদম্য ইচ্ছাশক্তি কোনো বুলডোজার দিয়ে ভাঙা অসম্ভব।
সেইদিন স্টেশনের ভিড়ে অর্ণব বুঝতে পারল, তার বাবার এই পরিচয়টাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার। সে বাবার হাতটা শক্ত করে ধরল। স্টেশনের সেই নতুন টাইলস মোড়ানো প্ল্যাটফর্মে সেদিন হয়তো দাঁড়িয়ে ছিল এক ছেলে আর এক বাবা, কিন্তু পৃথিবী দেখল এক নতুন ইতিহাস—যেখানে দারিদ্র্য নয়, জেদই জয়ের গল্প লিখে যায়।
দ্বাদশ শ্রেণী
কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগণা
পাতুলিয়া, উঃ ২৪ পরগণা
Comments :0