Post Editorial

মেরুকরণই যখন লক্ষ্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধির

সম্পাদকীয় বিভাগ

সেখ সাইদুল হক
 

বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্র বিক্রি, কৃষক শ্রমিকদের  সঙ্কট, দলিত ও নারী নির্যাতন, বুলডোজার রাজ প্রভূতি ইস্যুগুলি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দিয়ে মেরুকরণের রাজনীতিকে মান্যতা দিতেই  বিজেপি আবার সারাদেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের বিষয়টিকে সামনে এনেছে। ডাবল ইঞ্জিন সরকারগুলি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছে। সঙ্ঘ পরিবারের অ্যা জেন্ডাগুলি রুপায়িত করে চলেছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার প্রশ্নে উত্তরাখণ্ড, গুজরাট এবং আসামের সরকারের পর পর পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার প্রস্তাব পেশ করেছে।
বলা হচ্ছে এটা করা হচ্ছে সংবিধান ও আদালতের রায়কে মান্যতা দিতেই। সত্যি কি তাই? নাকি মেরুকরণের রাজনীতিকে মান্যতা দিতেই করা হচ্ছে? এটা ঠিক সংবিধানের নির্দেশাত্মক নীতির ৪৪ নম্বর ধারায় গোটা দেশের সমস্ত নাগরিকদের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের জন্য রাষ্ট্রকে প্রয়াস চালাতে বলা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই সংবিধানে প্রণেতারা এই ধারাকে নির্দেশাত্মক নীতির মধ্যেই রেখেছিলেন। একে বাধ্যতামূলক করেননি। সময়সীমাও দেয়নি। এটাও ঠিক মাঝে মাঝে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিতে কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্ন সময়ে কথা প্রসঙ্গে কিছু পরামর্শ দিয়েছে। কোনও নির্দেশ দেয়নি। যেমন ১৯৮৫ সালে শাহবানু মামলায়, ১৯৯৫ সালে সরলা মুদগ্যাল বনাম ভারত রাষ্ট্র মামলায়, ২০০৩ সালে খ্রিস্টানদের সম্মতি দান সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কিছু মন্তব্য করেছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনও নির্দেশ দেয়নি।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বলতে বোঝায় বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ, দত্তক গ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতি গোষ্ঠীর নিজস্ব ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা প্রথাগত যে বিধি আছে তাকে বাতিল করে সকলের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা। অর্থাৎ এই বিষয়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলি নস্যাৎ ও প্রথাগত ঐতিহ্যকে বাতিল করে হিন্দু আইনের কাঠামোকেই কিছু রদবদল করে তা উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। বলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে আসাম মডেল চালু হবে। এটা সঙ্ঘ মডেল। বিবাহ, বিচ্ছেদ,লিভ ইন সব বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় সীমায় রেজিষ্ট্রেশন বাধ্যতামূলক, লাভ জিহাদ বন্ধের নামে সংখ্যালঘুদের নিশানা বানানো ইত্যাদি।
অথচ ২০১৬ সালে মোদী সরকার যে ২১তম আইন কমিশন গঠন করে সেই কমিশন ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে মতামত সংবলিত যে পরামর্শ পত্র কেন্দ্র সরকারের কাছে জমা দেয় সেখানেই বলা হয় আমাদের দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি তা কাম্যও নয়।  সেই সাথে ২১তম আইন কমিশন "রিফর্ম অন ফ্যামিলি ল" নামে আলোচনা পত্র জমা দিয়ে পারিবারিক ও প্রথাগত ব্যক্তি আইনগুলির সংস্কারের কথা বলেছে। মোদী সরকার তা ঠান্ডা ঘরে ফেলে রেখেছে।
বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই হলো ভারতের সংবিধানের মূল মর্মবাণী। সংবিধানের ২৫-২৮ ধারায় ধর্মের স্বাধীনতার রক্ষার ও নিজধর্মের বৈশিষ্ট্যগুলি বজায় রাখার অধিকার দিয়েছে। ২৯(৩) ধারায় সাংস্কৃতিক বহুত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন এক দেশ এক বিধান হওয়া উচিত। এটাই সংবিধানের নির্দেশ। বিষয়টি সর্বৈব মিথ্যা। বরং সংবিধান দেওয়ানি বিষয়ে ভিন্নতায় মান্যতা দিয়েছে। দুটি বিষয়ে এখানে উল্লেখ করা দরকার। এক, আমাদের দেশে ফৌজদারি আইন অভিন্ন এবং বেশকিছু দেওয়ানি অভিন্ন যেমন ভারতীয় সাক্ষ্য আইন, নিবন্ধীকরণ আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, শিশু বিবাহ প্রতিরোধ আইন ইত্যাদি সকলের জন্য সমানভাবেই প্রযোজ্য। দুই, এটা নয় যে দেওয়ানি বিষয়ে কেবল মুসলমানরা ভিন্নতা ভোগ করেন। হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ প্রভৃতি ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব ব্যক্তিগত আইনও আছে। তারাও ভিন্নতা ভোগ করেন। দেশের সাত শতাধিক বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী নিজেদের প্রথাগত আইন দ্বারা পরিচালিত হন। আবার স্বাধীনতার পরে ১৯৫৬ সালে যে হিন্দু কোড তৈরি হয়েছে তার মধ্যেও ভিন্নতাকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। মুসলিমদের জন্য মুসলমান ব্যক্তি আইন ১৯৩৭ সাল থেকেই আমাদের দেশে চালু হয়েছে। হিন্দু আইনগুলির Codification হয়েছে ১৯৫৫-৫৬ সালে। হিন্দু কোডে হিন্দুদের কিছু জনগোষ্ঠীকে (যেমন কেরলার নায়ারদের) বিশেষ কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। হিন্দু যৌথ পরিবারকে কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। হিন্দু উপজাতি গোষ্ঠীগুলিকে নানা প্রথাগত অধিকার ভোগ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে।  সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের ২৪৪ নং ধারায় (যা জনজাতি এলাকার জন্য প্রযোজ্য) বলা হয়েছে এই ধারা মোতাবেক তারা পারিবারিক বিষয়ে নিজস্ব আইন রচনা করে এবং রাজ্যপালের অনুমতি নিয়ে তা কার্যকরী করতে পারবে। সংবিধানের ৩৭১ এ, বি, সি, এফ, জি, এইচ এই সব ধারায় উত্তর পূর্ব ভারতের জনগোষ্ঠীগুলি নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়গুলিতে প্রথাগত বিধির  দ্বারা পরিচালিত হবে। অভিন্ন বিধির বিরুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ প্রশমিত করতে বিজেপি সরকারগুলি আদিবাসীদের অভিন্ন বিধির আওতার বাইরে রেখেছে। তাহলে আক্রমণের লক্ষ্য কি কেবল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী?
বিজেপি বলছে গোয়াতে দীর্ঘদিন অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু আছে। তাহলে সারা দেশে হবে না কেন?  দেওয়ানি বিষয়ে পর্তুগীজ আমল থেকেই গোয়াতে কিছু সাধারণ পারিবারিক আইন আছে যা সব অংশের মানুষকেই মেনে চলতে হয়। কিন্তু গোয়ার পারিবারিক আইন হলো বিভিন্ন অংশের পারিবারিক আইনের কিছু কিছু অংশ নিয়ে একটি প্যাকেজ, যার মধ্যে বহু ক্ষেত্রে সমতা নেই। যেমন বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে ক্যাথলিকদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা আছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু স্বামীদের দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অভিন্ন বিধির লক্ষ্য যদি নারীদের প্রতি সমতা হয় তাহলে তা কি সত্যি থাকছে? 
একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় দেশের বর্তমান যেসব ব্যক্তিগত আইনগুলি আছে তাতে নারীদের সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত করেছে, তাই নারী সমতায় যদি মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে অভিন্ন আইন করলেই সমতা আসবে না। কেননা অভিন্নতা মানে সমতা নয়। বরং সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে  নারীদের প্রতি যে বৈষম্যের বিষয়গুলি আছে তাকে দূর করতে হবে। কেন বিজেপি রচিত অভিন্ন বিধিতে লিভ ইন রিলেশনকে বাধ্যতামূলক রেজিষ্ট্রেশন কিংবা জেল জরিমানা করা হবে? তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি এই বিধি কি সমতা দান করেছে? ১৯৫৪ সালের বিশেষ বিবাহ আইন কেন মডেল হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে না?,লাভ জিহাদ বন্ধের হুঁশিয়ারি কেন দেওয়া হচ্ছে? তাই বিষয়টিকে কেবল সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। এটা ঠিক মুসলমান শরীয়ত আইনে এমন কিছু সংবিধান আছে যা নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক। তার সংস্কার দরকার। কিন্তু তার মানে এটা নয় যে হিন্দু পারিবারিক আইনগুলিতে নারীদের সমতা দেওয়া হয়েছে।  যদি হিন্দু আইনগুলি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে ভ্রাতাদের সাথে পূর্বপুরুষদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেতে, পছন্দের জীবন সঙ্গী নির্বাচন করতে এবং স্বামীর সম্পত্তিতে মালিকানা পেতে, বিচ্ছেদের অধিকার পেতে নারীদের প্রতি সমতা দেওযা হয়নি। বিচ্ছেদ বা খোরপোশের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। পুনঃ বিবাহ করলে মৃত স্বামীর কাছ হতে প্রাপ্ত অধিকার হারানো বিবাহোত্তর অর্জিত সম্পত্তিতে মেয়েদের কোনও অধিকার না থাকা ইত্যাদি নানা প্রশ্নে নারীদের প্রতি বঞ্চনা করা হয়েছে। আইনসিদ্ধ না হলেও হিন্দুদের মধ্যে কারো একাধিক স্ত্রী নেই এমন নয়। বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া কঠিন হওয়ায়  বধূ হত্যার প্রবণতা বেশি। আবার দক্ষিণের টোডা এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের কিছু আদিবাসী গোষ্ঠীর মেয়েদের মধ্যে একাধিক স্বামী থাকার প্রথাও চালু আছে। তাই হিন্দু কোড অভিন্ন বিধির মডেল হতে পারে না, যা বিজেপি চাইছে। মনুবাদী ভাবাদর্শে লালিত বিজেপি কি সত্যি নারীদের প্রতি সমতা চান?  মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করাচ্ছে না কেন? নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারগুলির অবস্থান কি? হাথরাস,উন্যায় কি হয়েছে?
নারীর প্রতি সমতা যদি লক্ষ্য হয় তাহলে যা করা দরকার তা হলো বর্তমানে নারীদের অধিকার রক্ষায় যে আইনগুলি আছে যেমনি বিশেষ বিবাহ আইন, গার্হস্থ্য হিংসা হতে রক্ষা পাবার আইন, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্তা বন্ধের আইন নারী নির্যাতন বন্ধের আইন, পণপ্রথা বন্ধের আইন, অনার কিলিং বন্ধের আইন, কন্যা ভ্রুণ হত্যা বন্ধ আইন,বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ আইন ইত্যাদি। এইসব আইনগুলিকে আরও কঠোরভাবে সবার জন্য লাগু করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইনের যুগোপযোগী সংস্কার করতে হবে। তাই অভিন্ন বিধি উপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে সেই সেই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের, বিশেষ করে নারী সংগঠনগুলির সাথে আলোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী ও উপজাতি সম্প্রদায়ের জন্য প্রযোজ্য ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আইন ও প্রথাগত আইনগুলিকে সংস্কার করতে হবে। সেই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে আইন করলেই সমতা আসবে না।  তার জন্য চাই জনসচেতনতা। শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা চেতনার প্রসার। অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান।
এই প্রশ্নে বলা ভালো ব্যক্তিগত আইনের এই সংস্কার ধর্ম রক্ষার নামে বাতিল করা যাবে না। একটি বিধি বা আইনের প্রচলন সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।  তা অলঙ্ঘনীয় নয়। সেই কারণে বহু মুসলিম দেশে (তুরস্ক, টিউনেসিয়া, মরক্কো, ইরাক, পাকিস্তান আলজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ আরও বহু দেশে) শরিয়তী আইনের সংস্কার করা হয়েছে। এর জন্য ঐ সব দেশের মুসলমানদের মুসলমানত্ব নষ্ট হয়ে যায়নি। তাহলে আমাদের দেশেই বা সংস্কার হবে না কেন? সংখ্যালঘু অংশের বহু নারী সেই প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের মামলাতেই সুপ্রিম কোর্ট অমানবিক তাৎক্ষণিক তিন তালাক প্রথা বন্ধে রায় দিয়েছিল। গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন সংখ্যালঘু সহ সব অংশের মানুষকে ব্যক্তিগত আইনের সংস্কারের প্রশ্নে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সঙ্ঘ পরিবার নির্দেশিত বিজেপি’র ডাবল ইঞ্জিন সরকারগুলির মেরুকরণের রাজনীতিকে প্রতিহত করতে ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি থেকে রচিত নির্দেশাবলীকে বাতিল করতে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের সংগ্রামী ঐক্য‌‌‌ গড়ে তুলতে হবে ।
 

Comments :0

Login to leave a comment