Editorial

রামের ঘরেও চুরি

সম্পাদকীয় বিভাগ

প্রায় আড়াই বছর আগে অযোধ্যায় নব নির্মিত রাম মন্দিরে প্রাণহীন রামলালার মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র প্রয়োগ করে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে ফেলা হয়েছিল মূর্তির মুখে। তাকে অলৌকিক ঘটনা বলে ব্যাপক প্রচার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে ২২ জানুয়ারি। গোটা দেশে সাড়া জাগিয়ে মহাসমারোহে অসমাপ্ত মন্দির উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই অনুষ্ঠানে বিশেষ, অতি বিশেষ অতিথি হিসাবে কয়েকজন ভিআইপি আমন্ত্রিত হলেও আমন্ত্রণ পাননি দেশের প্রধান আদিবাসী রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হয় প্রায় আরও দু’বছর পর ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। অসম্পূর্ণ মন্দিরের শুধুমাত্র গর্ভগৃহের নির্মাণ শেষ করে তড়িঘড়ি উদ্বোধন ও রামলালার মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হলো ভোটের কথা ভেবে। মোদী-শাহরা ভেবেছিলেন রামমন্দির নির্মাণের সাফল্যের জোয়ারে গোটা দেশ আবেগে ভাসবে। সেই ভাবনা থেকেই ভোটে ৪০০ আসন জেতার কথা দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে ঘোষণা হয় নির্বাচনী প্রচারের সর্বাগ্রে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিপুল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য মোদীর নেতৃত্বে সরকার গড়ার পর আরএসএস-বিজেপি ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে। ক্ষমতার অহঙ্কারে রাতারাতি সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে পূর্ণাঙ্গ রাজ্য কাশ্মীরকে ভেঙে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয় এবং কাশ্মীরের মানুষের বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া। এই পর্বেই অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির নির্মাণের জন্য হস্তান্তরিত করার রায় দেয় তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাংবিধানিক বেঞ্চ। পরের বছর ঘোর করোনা অতিমারীর মধ্যে সেই জমিতে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য ভূমিপূজা করেন নরেন্দ্র মোদী। অপেক্ষা করার সময় ছিল না। মাথায় তখন ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। তার আগেই মন্দির বানিয়ে প্রচারের ঝড় তুলে নির্বাচনী প্রচারে ঝাঁপাতে হবে।
মোদী-শাহর নেতৃত্বে আরএসএস-বিজেপি পরিকল্পনায় নিখুঁতভাবে সবই করা হয়েছে। কিন্তু ভোটের বাজারে বিজেপি’র মূলধন হিসাবে রাম মন্দির কাজে লাগেনি। ৪০০ আসন তো দূরের ব্যাপার সেই নির্বাচনে সরকার গড়ার মতো সংখ্যা গরিষ্ঠতাও মেলেনি। মাত্র ২৪০ আসনেই থেমে গিয়েছিল মোদী-শাহর ‘লম্বা রেসের ঘোড়া’। টিডিপি এবং জেডি(ইউ)-র সমর্থনের কল্যাণে কোনোরকমে সরকার গড়তে পেরেছিলেন মোদীরা।
ইতিমধ্যে মন্দির নির্মাণ শেষ হয়েছে। গোড়ার দিকে মন্দিরে দর্শনার্থী ভক্তরা লাখে লাখে ভিড় জমাতে থাকেন। অযোধ্যায় ঝাঁ চকচকে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ও রেল স্টেশন তৈরি হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে। গোটা অযোধ্যাকে সাজানো হয়েছে ছবির মতো করে। ভক্ত-দর্শনার্থীরা অকাতরে প্রণামী হিসাবে বিপুল অর্থ ও সোনার গহনা দান করতে থাকেন নিত্যদিন। দুর্ভাগ্যের ও অবিশ্বাস্য হলেও সত্য প্রণামীর সেই অর্থ ও অলঙ্কার মিলিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে মন্দির থেকে। সন্দেহের তির মন্দির কর্মীদের দিকেই। রামভক্ত হিসাবে যারা মন্দিরের কর্মী হবার যোগ্যতা অর্জন করেছেন তারাই বেমালুম রামের গহনা লোপাট করে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। অভিযুক্তরা রাতারাতি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়ে গেছেন রামলালার টাকা চু‍রি করে। ভক্তদের প্রণামী এভাবে আত্মসাতের ফলে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে কাদের হাতে মন্দিরের দায়িত্ব। রামভক্তির এটাই কি নমুনা।

Comments :0

Login to leave a comment