ASHA Worker's death at Saltora

বিজেপি বিধায়কের অশালীন মন্তব্য  সইতে না পেরে মৃত্যু আশা কর্মীর

জেলা

শালতোড়ার বিজেপি বিধায়ক চন্দনা বাউরির অশালীন মন্তব্যের জেরে রুম্পা মণ্ডলের মৃত্যুর পর সোমবার দুপুরে অমরকানন হাসপাতালে আশাকর্মীদের বিক্ষোভ।

 শালতোড়ার বিজেপি বিধায়কের অপমানজনক মন্তব্য, অভব্য আচরণ ও হেনস্তার জেরে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা; তা থেকেই আচমকা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলো একজন পরিশ্রমী তরুণী আশা কর্মীর। এই ঘটনায় তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে বাঁকুড়ায়। প্রবল ক্ষোভ ছড়িয়েছে জেলার আশাকর্মীদের মধ্যে। কেন এভাবে অপমান করা হলো, বিজেপি বিধায়কের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তুলেছেন আশা কর্মীরা। অভিযুক্ত বিধায়ককে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিও উঠেছে জোরালোভাবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা সকলেই একযোগে বলছেন, বিজেপি বিধায়ক চন্দনা বাউরির চরম অপমান সইতে না পেরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন ওই আশা কর্মী রুম্পা মণ্ডল (৩৫)। তাঁর বাড়ি বাঁকুড়া জেলার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের বনাশুড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ভালুকাশোল গ্রামে। এই ঘটনার পর সোমবার সকাল থেকেই রুম্পার মরদেহ নিয়ে অমরকানন হাসপাতালের সামনে আশাকর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিধায়ককে গ্রেপ্তারের দাবিতে দেহ আটকে রাখেন তাঁরা। পুলিশ এসেও বিক্ষোভ সামাল দিতে পারেনি। পরে র্যাতফ নামিয়ে গায়ের জোরে আশা কর্মীদের সরিয়ে দেয় প্রশাসন, ছিনিয়ে নিয়ে যায় রুম্পার দেহ। তাতে অবশ্য অসন্তোষ কমেনি বিন্দুমাত্র।
সোমবার দুপুরে সেই মর্মান্তিক দৃশ্যের সাক্ষী রইলেন অমরকানন হাসপাতালে উপস্থিত রোগীর পরিজনরাও। মৃত সহকর্মী রুম্পা মণ্ডলের মাথার দিকে ধরে আছেন শোকাতুর আশা কর্মীরা, অন্যদিকে পা ধরে টেনে সেই দেহ হিংস্রভাবে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ। শেষপর্যন্ত পুলিশের গায়ের জোরের কাছে পরাস্ত হন আশাকর্মীরা। কিন্তু তাঁদের চোখে মুখে তখন একরাশ ঘৃণা ও প্রবল ক্ষোভ; বিজেপি বিধায়ক চন্দনা বাউরির অভব্য আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার।
পরে অভিযুক্ত বিধায়ক চন্দনা বাউরি হাসপাতালে এলে তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ শুরু হয়। তিনি ঘটনার সাফাই দিতে গেলে আশা কর্মীরা সরাসরি জানতে চান, কেন তাঁদের পেশাকে অপমান করা হলো? সেসময় ফের আঙুল তুলে ধমকানোর চেষ্টা করলে আশা কর্মীরা সরাসরি শাসকদলের বিধায়ককে বলেন, ‘‘আঙুল নামিয়ে কথা বলুন, আগে ভদ্র ব্যবহার শিখুন।’’ 
রবিবার ভালুকাশোল গ্রামে আশা কর্মীরা বাঁকুড়া জেলাশাসকের নির্দেশমতো আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের কাজ নিয়ে সভা ডেকেছিলেন। সেখানে হাজির হন শালতোড়ার বিধায়ক চন্দনা বাউরি। তিনি সভায় উপস্থিত হয়েই আশা কর্মীদের কাছে জানতে চান, কেন মিটিং ডাকা হয়েছে? জেলাশাসকের নির্দেশে এই মিটিং হচ্ছে জানার পরেও বিধায়ক থামেননি। এর পরই তিনি আশাকর্মীদের উদ্দেশ্যে খারাপ ভঙ্গিতে পরপর অসম্মানজনক কথা বলতে শুরু করেন।
আশা কর্মী পাপিয়া মাজির কথায়, ‘‘বিধায়ক আমাদের বলেন, তোমরা অপদার্থ। কেউ কোনও কাজ করো না। বাড়ির স্বামী ও অন্য পুরুষরা কাজ করে দেয়। তোমরা সব চুরি করে আশা কর্মী হয়েছো। ভালো করে কাজ না করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ পাপিয়া জানান, ‘‘সারাদিন আশা কর্মীরা পরিশ্রম করে কাজ করেন। কোথাও বাড়ির লোকজনের সাহায্য নেওয়া হয় না। আর আয়ুষ্মান প্রকল্পের কাজের ব্যাপারে আমাদের তো প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও প্রশিক্ষণই দেওয়া হয়নি। সব জেনেও কেন চন্দনা বাউরি প্রকাশ্যে এভাবে আশা কর্মীদের অসম্মান করলেন?’’ 
এখানেই শেষ নয়, বিধায়ক চন্দনা বাউরি আশা কর্মীদের যে ধমকাচ্ছেন, তাঁদের ‘চোর, অযোগ্য’ বলে সম্বোধন করছেন, সেই ভিডিওটি তিনি নিজেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ। সোমবার অমরকানন হাসপাতালে রুম্পা মণ্ডলের মৃতদেহ ঘিরে রেখে আশা কর্মী মনিকা দাস, সরস্বতী সিংহরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘এই ভিডিও দেশের মানুষ দেখলেন, আমাদের আত্মীয়স্বজন, এলাকার মানুষজন সবাই দেখলেন! তাঁরা দেখলেন কিভাবে একজন বিধায়ক আশা কর্মী মহিলাদের প্রকাশ্যে হেনস্তা করছেন। এর ফলে চরম অসম্মানিত বোধ করছি আমরা। সামান্য পারিশ্রমিকে চব্বিশ ঘণ্টাই আমাদের কাজ করতে হয়। সেখানে খোদ একজন মহিলা বিধায়কের কাছ থেকে এই অসম্মান কি আমাদের পাওনা ছিল!’’ 
রবিবার বিকেল থেকেই আশা কর্মীদের মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাঁদের অসম্মান করার সেই ভিডিও প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়তে দেখে অসন্তোষ চরমে ওঠে। আশা কর্মী মনিকা দাস জানান, ‘‘কাল রাতেও আমার সঙ্গে কথা বলেছে রুম্পা। বিধায়কের প্রকাশ্য অসম্মানে চরম মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিল সে। রাত একটায় আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের কাজ করে শুতে গেলেও ঘুমোতে পারেনি। সোমবার সকালেই বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল রুম্পা।’’
মৃত আশা কর্মীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কোনরকম শারীরিক অসুস্থতা বা হৃদযন্ত্রের কোনও সমস্যাই তাঁর ছিল না। বিধায়কের আচরণের ফলেই মনের মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর চাপ তৈরি হয়। আশা কর্মীরা এর পরই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গেট বন্ধ করে দিলেও সেই গেট টপকে বিক্ষোভে যোগ দেন একের পর এক আশা কর্মী। সকলের দাবি একটাই, চন্দনা বাউরিকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
আশা কর্মীদের বক্তব্য, বিধায়কের এই আচরণের ফলেই রুম্পা মণ্ডলের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। রাজ্যে এই ধরনের মৃত্যু প্রথম ঘটল। বাকি আশা কর্মীরাও মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন। প্রশাসনকে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এদিন আশা কর্মীদের বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন রূপালি বটব্যাল সহ মহিলা সমিতির কর্মীরাও। রুপালি বটব্যাল বলেন, আশা কর্মীদের বিক্ষোভ তুলতে পুলিশ অন্যায়ভাবে বেপরোয়া বলপ্রয়োগ করেছে। 

Comments :0

Login to leave a comment