Anubrata Mondal lottery corruption

হুমকি দিয়ে লটারি বিজেতার টিকিট হাতিয়েছিল অনুব্রত বাহিনী

জেলা

ঘরছাড়া থাকতে হয়েছিল এক সপ্তাহ। খাওয়া দাওয়া জোটেনি। পরিবারের সদস্যদের খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পুলিশকে বা মিডিয়াকে বললে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। হুমকি দিয়েছিল অনুব্রত মণ্ডলের অনুগত তৃণমূলের দুষ্কৃতী বাহিনী।
কিন্তু কেন তৃণমূলের এমন রোষানলে পড়তে হয়েছিল বোলপুরের বড় শিমুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা শেখ নুর আলিকে? মমতা ব্যানার্জির শাসনে শেখ নুর আলিকে ঘরছাড়া থাকা, মুখ বুঁজে তৃণমূলের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল স্রেফ একটিই কারণে। তা হলো, গ্রামের এই বাসিন্দা লটারির টিকিট কেটে এক কোটি টাকা পুরস্কার মূল্য জিতেছিলেন। সেই খবর পাওয়ার পরেই অনুব্রতর নির্দেশে তৃণমূলী বাহিনী অত্যাচার শুরু করে ওই লটারির টিকিট নিয়ে নেওয়ার জন্য। ১ কোটি টাকার পুরস্কার মূল্যের টিকিট মাত্র সাত লক্ষ টাকা দিয়ে ‘কিনে’ ফেলে অনুব্রতর বাহিনী।


আর তারপরেই ২০২২সালের ১৭ জানুয়ারি লটারি সংস্থার ওয়েবসাইটে তৃণমূলের বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের ছবি প্রকাশিত হয় ১ কোটি টাকার পুরস্কার বিজেতা হিসাবে! এজেন্সি-বিক্রেতা-গ্রাহক-তৃণমূল বাহিনী মারফত অনুব্রতর কোষাগারে আসে টাকা। সিবিআই’র তদন্তে এখন সেই লটারি-রহস্য ভেদ!
দশ বা তার বেশি লক্ষ টাকার কেউ লটারি জিতলেই খবর চলে যেত অনুব্রতর কাছে! তারপর নানা পথে সেই টিকিটের শেষ ঠিকানা হতো অনুব্রত মণ্ডল। এই তথ্য সামনে এসেছে সিবিআই’র তদন্তে! 
সেই লটারির দখল নিতেই কখনও দেওয়া হয়েছে শাসানি তো কখনও ঘরছাড়া করার হুমকি। গোরু পাচারের সাদা টাকা কালো করার তাগিদে কোটি টাকার লটারি জেতার দুর্দান্ত ‘খেলা’ চমকে দিয়েছে তদন্তকারীদের। 
বেশ কিছুদিন ধরেই সিবিআই মরিয়া ছিল অনুব্রতর লটারি জেতার রহস্য উন্মোচনে। বৃহস্পতিবার তা স্পষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল অনুব্রতর কোটি টাকা লটারি জেতার সেই বিজ্ঞাপন। ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর লটারিতে এক কোটি টাকা পান তৃণমূল বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল। সিবিআই তদন্তে আগেই উঠে এসেছিল এই লটারির টিকিটের হাতবদলের গল্প। বোলপুরে গাঙ্গুলি লটারি এজেন্সি থেকে রাহুল লটারি এজেন্সি। সেখান থেকে টিকিট নেন লটারি বিক্রেতা কালাম শেখ। তার কাছ থেকে লটারি টিকিট কেনেন বোলপুরের বড় শিমূলিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেখ নূর আলি। এদিন সাতসকালে কোটি টাকার লটারি জেতা নুর আলির বাড়িতে সিবিআই পা দিতেই কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসে। 
লটারি বিজেতা নুর আলির বাবা কটাই শেখের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি ঘুরিয়ে দিয়েছে তদন্তের মোড়। নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কিত বড় শিমুলিয়ার এই সাধারণ পরিবার আরজি জানান, গ্রামে নয়, যা বলার সিবিআই অফিসে বলবেন। সেই মতো বৃহস্পতিবার সেখ নুর আলি তাঁর বাবা কটাই শেখ ও ভাই মিঠুন শেখকে নিয়ে সিবিআই’র অস্থায়ী ক্যাম্প বোলপুরের রতনকুঠিতে হাজির হয়ে যান। 


কটাই সেখ সাংবাদিকদের এদিন বলেন, ‘‘লটারিতে এক কোটি টাকা পাওয়ার পরেই তৃণমূলের লোকজন বাড়ি যায়। হুমকি দেয়। টিকিট জোর করে কেড়ে নিয়ে চলে আসে। আপত্তি করেছিলাম তারজন্য ঘরছাড়াও হতে হয়েছিল। বলেছিল টাকা দিয়ে দেবে। কিন্তু দিয়েছে মাত্র ৭ লক্ষ টাকা। বুঝতেই পারছেন ওদের সাথে কি পারা যায়? ভয়ে কিছু বলতে পারিনি।’’ কটাই শেখের কথাতে উঠে এসেছে এই টিকিট ছিনিয়ে নেওয়ায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় বাহিরী-পাঁচশোয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলী প্রধান শুভঙ্কর সাধু ওরফে ভজা।
সিবিআই জেরায় ফের ডাক পড়েছিল গাঙ্গুলি লটারি এজেন্সির মালিক বাপি গাঙ্গুলির। তাঁর কথাতেও একই অভিযোগের সুর। তিনি বলেন, ‘‘নুর আলি লটারিতে টাকা পেয়েছিল। মুনের মারফত অনুব্রত মণ্ডল সেই টিকিট নিয়ে নেয় ৮৩ লক্ষ টাকা দিয়ে। আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি যা জানি সিবিআই-কে বলেছি।’’ এজেন্সি মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী ৮৩ লক্ষ টাকা পুরস্কার মূল্য ছিল। কিন্তু বিজেতার দাবি অনুযায়ী তাঁকে দেওয়া হয়েছিল মাত্র সাত লক্ষ টাকা। 
মুন মানে অনুব্রত ঘনিষ্ট তৃণমূল কাউন্সিলর বিশ্বজ্যোতি মুখার্জি। যাঁর বাড়িতে হানা দেওয়া থেকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিবিআই। যাঁর আকাউন্ট থেকে অনুব্রতর টাকা লেনদেনের তথ্যও হাতে এসেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের। জানা গিয়েছে, এই তৃণমূল কাউন্সিলর এখন রয়েছে দিল্লিতে। ইডি’র জেরার মুখোমুখি। এদিন সিবিআই’র জেরা পর্বে মুখোমুখি বসানো হয়েছিল লটারি বিজেতা নুর আলি, লটারি এজেন্সির মালিক বাপি গাঙ্গুলি এবং লটারি হাতানোর কাণ্ডারি শুভঙ্কর সাধুকে। 

 

0 Comments

Login to leave a comment