আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখের দিকে তাকিয়েই ভারতে বিদেশনীতি নির্ধারিত হচ্ছে? এমন গুরুতর প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠে আসছে বিরোধী মহল থেকে। স্বাধীন সার্বভৌম ভেনেজুয়েলার উপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে গিয়ে আমেরিকার আদালতে বিচারের নামে প্রহসনের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতের দায়সারা অবস্থান থেকে স্পষ্ট মোদী সরকার ট্রাম্পের রোষানলে পড়ার ভয়ে ত্রস্ত। সমস্ত ধরনের আইন-বিধি লঙ্ঘন করে আমেরিকা যেভাবে কার্যত গুন্ডামি করেছে তার বিরুদ্ধে চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, কিউবা থেকে শুরু করে, ইরান, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলি কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ৫৬ ইঞ্চির বিশ্বগুরুর নেতৃত্বে ভারত নিছক উদ্বেগ প্রকাশ করেই দায় সেরেছেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী ইউরোপের একাধিক দেশ যখন নিন্দা বা বিরোধিতা করতে দ্বিধা করেনি তখন ট্রাম্পের বিরাগভাজন না হবার বাসনায় এমন বিলম্বিত নিরামিষ বিবৃতি শুধু বিস্ময়ের নয়, উদ্বেগেরও। উদ্বেগ এই কারণে যে, ভারত কি তার কঠোর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জোট নিরপেক্ষ নীতি থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে। স্বাধীন সার্বভৌম দেশে বৈদেশিক আগ্রাসনকে কি আর অপরাধ মনে করে না। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কোনও দেশের রাষ্ট্রপতিকে অর্থ, অস্ত্র ও ক্ষমতার জোরে তুলে নিয়ে যাওয়াকে সমর্থন করে।
যাত্রা শুরুর সময়কাল থেকেই ভারত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। ভারত চিরকালই যে কোনও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে। সেটা আক্রান্ত হলে সোচ্চারে প্রতিবাদ করে। ভারত চিরকালই যে কোনও দেশে সামরিক আগ্রাসন, যুদ্ধ, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর ঘোরতর বিরোধী। বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সংহতির পক্ষে। সেই ভারতের এখন ট্রাম্পের ভয়ে পা কাঁপছে।
যে ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য আমেরিকায় গিয়ে ভোটে প্রচার করেছিলেন মোদী, ভারতে এসে ট্রাম্পকে নিয়ে আদিক্ষেতার অন্ত ছিল না, যে ট্রাম্পকে মোদী তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে জাহির করতেন সেই ট্রাম্পই হয়ে উঠেছেন মোদীর সবচেয়ে বিড়ম্বনার কারণ। মোদী চেয়েছিল ট্রাম্পকে ধরে আমেরিকার বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে দুনিয়াজুড়ে কেউকেটা হতে। সে জন্য আমেরিকার বিদেশনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতের বিদেশনীতি দ্রুত বদলানোর ব্যবস্থা করেন। ট্রাম্পকে খুশি রাখার জন্য ট্রাম্পের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, মরজিকে মূল্য দিতে থাকেন। চীনের বিরুদ্ধে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় ন্যাটোর মতো জোট গড়ায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ভারত। অর্থাৎ পদে আমেরিকার ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়ে নকল বিশ্বগুরু হতে চেয়েছেন।
কিন্তু ট্রাম্পের শুল্কনীতির ধাক্কায় এবং পাক-ভারত সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের বিরাগভাজন হয়ে পড়েছেন মোদী। ট্রাম্পের মরজিমাফিক রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমালেও বন্ধ করেনি ভারত। অথচ ট্রাম্পের হুমকি মেনে ইরান, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যাবতীয় বাণিজ্য সম্পর্ক কার্যত ছিন্ন করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও ট্রাম্পের মন পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপায় ট্রাম্প। প্রায় ছ’মাস ধরে আলোচনা চলার পরও এখনও কোনও মীমাংসা হয়নি। তার মধ্যেই ভেনেজুয়েলায় হামলা। এই অবস্থায় ট্রাম্প ক্ষেপে যেতে পারেন এই আশঙ্কায় মোদী কড়া প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহস পাননি। কিন্তু তাতেও খুশি নন ট্রাম্প। তাই আরও শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছেন। নিজেই সাংবাদিক সম্মেলনে মোদীর প্রশংসা করে বলেছেন, আমি যে খুশি নই সেটা জানা উচিত ছিল।
অর্থাৎ ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁকে খুশি রাখা, তাঁর মরজিমাফিক চলা, ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম দেওয়া মোদীর ভারতের দায়িত্ব। ভারতের স্বার্থ অপ্রাসঙ্গিক ট্রাম্পের পছন্দে সায় দেওয়াই অগ্রাধিকার। মোদী কিন্তু চুপ।
Modi Silent
মোদীর মুখে রা নেই
×
Comments :0