Fundamentalism

মৌলবাদের সামাজিক অ্যা জেন্ডা, বিপদ- কাঁটাতার পেরিয়ে জান্তব উল্লাস

উত্তর সম্পাদকীয়​

দেবাঞ্জন দে
‘‘পূজাগৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা-
দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা,
অনেক যুগের লজ্জা ও লাঞ্ছনা,
বর্বরতার বিকার বিড়ম্বনা-
ধর্মের মাঝে আশ্রয় দিল যারা,
আবর্জনায় রচে তারা নিজ কারা।’’-

গলায় জ্বলন্ত টায়ার, গায়ের চামড়াগুলো প্রচণ্ড আগুনে পুড়তে পুড়তে খসে পড়ছে, চারপাশে মাংস পোড়ার গন্ধ, খুলি ফাটার শব্দটা ঢেকে দিল জনতার উন্মত্ত তাণ্ডব আর রণডাক- জয় শ্রী রাম! মানুষই পোড়াচ্ছে মানুষকে। মৃত্যুর পর চিতায় নয়, বিষণ্ণতায় নয়, প্রিয়জন হারানো হৃদয় নিংড়ানো বেদনায় নয়- মানুষ পোড়াচ্ছে আরেক জ্যান্ত মানুষকে যুদ্ধ জয়ের উন্মত্ত উল্লাসে! ধর্মের নামে এই উল্লাস আসলে সংখ্যার আস্ফালন। যেখানে সংখ্যাটা উলটে যায় সেখানেই উলটপুরাণ। গাছ থেকে ঝুলন্ত দেহ ঝলসে যাচ্ছে আগুনে, চারপাশে সেই একই মাংস পোড়ার গন্ধ, শুধু পোড়া মাংসের ধর্মটা বদলে গেছে! আর বদলে গেছে বিজয়োল্লাসের রণডাক- আল্লা হু আকবর। সংখ্যার গাণিতিক সূত্রটাও স্বাভাবিকভাবেই সীমানা পার করে বদলে গেছে এক অন্য দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। শুধু বদলায়নি মানুষ হয়ে আরেক মানুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার জান্তব উল্লাসের আনন্দটা!

মৌলবাদ তার মৌলিক ছন্দে ধর্মের গন্ধ গায়ে মেখে মানুষের ভেতরের জন্তুটাকে বাইরে টেনে হিঁচড়ে বার করে আনতে চায়। এই যে হিংস্র আত্মাটাকে মনের গহন থেকে বার করে আনা তার জন্য সামনে রাখতে হয় পরমাত্মার সন্ধান! বিষয়টা এমন যেন তুমি যতো হিংস্র, জান্তব, আদিম হতে পারবে ততোই তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত পরমাত্মার কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারো। আত্মার সাথে পরমাত্মার এই বিকৃত যোগাযোগ ঘটাতেই মৌলবাদ আশ্রয় নেয় ধর্মের, ধর্মগ্রন্থের, ধর্মীয় আচারের। যদিও হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের চেতন, অবচেতনের সংযোগ ঘটিয়ে তাকে দুঃখে শান্তি, আনন্দে কান্না অথবা কান্নায় আনন্দ, শান্তিতে দুঃখ যাপনের অনুভূতির ক্রীড়ানক ধর্মের কিন্তু কখনো প্রয়োজন পড়েনি মৌলবাদের সাথে হাত মেলানোর। কারণ মানব মন নিজের প্রয়োজনেই গড়ে পিঠে নিয়েছে ধর্মকে। গড়েছে তার স্বকীয় চলাচলের রাস্তাকে, গড়েছে এক ধর্মের সাথে আরেক ধর্মের রীতিনীতি, আচার, আচরণের মিশে যাওয়ার বিক্রিয়াকে, গড়েছে জীবনের পরিপূর্ণতাকে খোঁজার জন্য খোদার কসম বা ভগবানের দিব্যি।

কিন্তু তা দিয়ে মৌলবাদ তার সংখ্যার ডিমে তা দিতে পারবে না! মানুষের অবচেতনের দানবটাকে বার করে আনতে মৌলবাদকে দখল নিতেই হবে সেই অবচেতনের অন্ধকারকে। তবেই তাকে টেনে এনে বসানো যাবে চেতনের আলোয়। তাই ধর্ম, সমাজ আর গণিতের এক জটিল কারুকাজে মৌলবাদ তার মতো করে নিজের ময়দান প্রস্তুত করে মানুষকে মানুষ থেকে জন্তুতে পরিণত করতে। সংখ্যাগুরুর সামাজিক অবস্থান আর সংখ্যালঘুর সামাজিক অবস্থানের বৈষম্য যতো বেশি বাড়তে থাকে ততোই মৌলবাদের পাখা দু'দিকেই পাখনা মেলার সুযোগ খোঁজে। যে কাঁটাতারের এপারে সংখ্যাগুরু, সে যে কাঁটাতার পেরোলেই সংখ্যালঘু হয়ে যেতে পারে সেই বাস্তববোধ থেকে মানব মস্তিষ্ককে বিয়োগ করতেই মৌলবাদ হাত ধরে শাসকের, রাষ্ট্রের! অবশ্য সেই রাষ্ট্র যদি চায় মৌলবাদের উনুনে রাজনীতি, সমাজনীতির রুটি সেঁকতে তবেই।

জাতি, ধর্ম, নেশন, ন্যাশানালিটি সম্পর্কে মানুষের জানা বোঝা গড়ে ওঠে শৈশবের ইতিহাস পাঠ্য থেকেই। অতএব এ প্রসঙ্গে অতীতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। ঠিক সেই কারণেই অতীতকে বিকৃত না করতে পারলে মৌলবাদের বিকৃত বোধ চেতনের দখল নিতে পারে না। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে বিকৃত করার লক্ষ্য আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার লক্ষ্যও তাই এক ও অভিন্ন। বিভিন্নতা আছে অবশ্য প্রয়োগে- এদেশে সাহিত্য আকাদেমি, সঙ্গীত আকাদেমি, কলা আকাদেমিতে যেমন মাথার অস্ত্রোপ্রচারের মাধ্যমে স্লো পয়জন ফর্মুলায় ঘিরে ফেলা হচ্ছে মৌলবাদের পাঁচিল দিয়ে, ওদেশে একদম ধ্বংসের মোডে মুছে ফেলার চেষ্টা উদীচী, ছায়ানটকে। অবশ্য যেদিন ধানমণ্ডি গুঁড়িয়ে দেওয়ার উল্লাস প্রতিধ্বনিত হয়েছিল বাংলাদেশের হাওয়ার। সেদিনই উদীচী, ছায়ানট, প্রথম আলোর ডেথ সার্টিফিকেট লেখার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়।

ভারত আর বাংলাদেশের সংস্কৃতির কাঠামো গড়ে ওঠার শেকড় বেশ খানিকটা এক। রবীন্দ্রনাথের গান দু'দেশের জাতীয় সঙ্গীত তো এমনি এমনি নয়! রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, সত্যপীর, জসীমউদ্দিন, আল মাহমুদ, শামসুর, রুদ্রর পথ হেঁটেই দু'দেশের ধ্যান, জ্ঞান, সাধন, ভজন, জীবনের অনুসন্ধান গড়ে ওঠা। এখন সেই অনুসন্ধানে মৌলবাদের গাণিতিক সূত্র ঢোকাতে গেলে তছনছ করতে হবেই নির্দিষ্ট এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটাকে। অতীতের পরই তাই ধাক্কা দাও সেই অতীতের ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা চিন্তা, চেতনার অগ্রগতির ল্যান্ডস্কেপে। ভারতবিদ্বেষ যত শক্তিশালী হবে ওপারে, ততোই এই সাংস্কৃতিক সুস্থতা পর্যবসিত হবে অসুস্থতায়। আবার এপারেও বাংলা বিদ্বেষের হাওয়ায় পাল লাগানোর সুবিধা তৈরি হবে অচিরেই। ওপারের মৌলবাদ আর এপারের মৌলবাদের গাঁটছড়ায় তাণ্ডবের মাত্রা যেমন বাড়বে তেমনই উপমহাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে উঠে আসার জায়গা পাবে দু'দেশেরই সংখ্যাগুরু মৌলবাদী শক্তি আর তাদের ডালপালা মেলার পয়সা জোগানো তাবড় ক্রোনি ক্যাপিটাল।

মৌলবাদের চিরকালীন ধান্দাই মূলে প্রভেদ ঘটানো। ঐ যে মানুষ পোড়ানোর জান্তব উল্লাস, সেটা যে সামাজিক মন থেকে উঠে আসছে সেই মনের জোর যতো বাড়বে বাংলাদেশে, ততোই বিষাক্ত হয়ে উঠবে ভারতের মনও, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার। এপার বাংলায় এসআইআর আবহে মেরুকরণের অঙ্ককে মজবুত করার চেষ্টা হবে এই বিষবাষ্পের মধ্যে। কিন্তু মূল ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা যুগ যুগ ধরে বয়ে আসা গঙ্গা-পদ্মা যুক্ত সাধনায়। সামাজিক মনে পচন ধরানোর যে কাজ দুই দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে তা বেশ খানিকটা ত্বরান্বিত হবে মৌলবাদের সংখ্যার দম্ভ ও আস্ফালনকে সামনে রেখে। এপারে বিপন্ন হবে প্যাটিস বিক্রেতা রিয়াজুল, ওপারে বিপন্ন হবে কারখানার মজদুর দীপু দাস। নির্বাচনে শান্তি,  গণতন্ত্র, শিক্ষা, উন্নয়ন, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান, জীবনযাপনের মানোন্নয়নের, মর্যাদার ওপরে জায়গা করে নেওয়া যাবে মৌলবাদের অ্যা জেন্ডাকে। ঐ মানুষ থেকে জন্তু হয়ে ওঠার অ্যা জেন্ডাকে আর কি! আবার যে মানুষ একবার এই অমানুষের জুতোয় পা গলাবে তাকে ফের মানুষের চামড়ায় ঘষা লাগা অ্যা জেন্ডায় ফেরাতে অনেকটা সময় চলে যাবে। সেই সারপ্লাস সময়টুকু মৌলবাদ কাজে লাগাবে তাদের জান্তব মন নির্মাণকে আরও প্রসারিত করতে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, ঐক্য, সংহতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়ে যাবে মৌলবাদ। সামাজিক প্রতর্কের এই আমূল পরিবর্তনটাই মৌলবাদের লক্ষ্য- দু’দেশেই।

মৌলবাদের হাত শক্ত করতেই ‘অপর’ নির্মাণ করা হয়। সংখ্যাগুরুর সংস্কৃতি, রীতি, ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাাসের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা হয় সেই 'অপর'কে চিহ্নিত করে কোণঠাসা করতে। ভাষার আধিপত্য এদেশের বুকে নতুন করে চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে বর্তমান হুকুমতে। নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমে ভাষার এই আধিপত্য একদম স্কুলস্তর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে ছাত্র মনে। আবার ওপার বাংলাতেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথেই মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় লড়াইকে- কারণ তার মধ্যেই নিহিত ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয়। ভারতে নানা ভাষার চলাচলে এক ভাষার একাধিপত্য দেশের ইতিহাস, বর্তমান, ভবিষ্যতের লেখাপড়ার কাঠামোকেই একমুখী করে দিতে পারে। ভারতের ছাত্র ফেডারেশন লড়াই করছে এই একাধিপত্যের বিরুদ্ধে। কলকাতার মৌলালি যুব কেন্দ্রে সংগঠিত হতে চলেছে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির ত্রি-ভাষা ফর্মুলা সম্পর্কিত সেমিনার। মাতৃভাষায় লেখাপড়ার অধিকারকে দেশের বহুত্বের অক্ষে সূত্রায়িত করার লড়াই চলছে।

মনে রাখতে হবে পোড়া মাংসের গায়ে কোনও ধর্মের লেবেল সাঁটা নেই। যারা পোড়াচ্ছে তাদের মনেও সেই লেবেল সাঁটা হয়েছে পরিকল্পিতভাবেই। যাতে তারা খিদে, কাজ, শিক্ষা ভুলে ছুটতে থাকে দুশমনের সন্ধানে। সেই সন্ধিক্ষণেই দুশমন নির্মাণ করে মৌলবাদ। প্লেটে সাজিয়ে সেই অলীক দুশমনের মাংস খেয়ে তৃপ্তি পায় মানুষ! বোঝেনা যে সেটা মানুষেরই মাংস। বোঝে না সেই পুড়ে যাওয়া মানুষও সবার মতোই রোজ পুড়ছে না পাওয়ার আগুন— এমন এক আগুন যাতে যে পুড়ছে সেও পোড়ে, আবার যারা পোড়াচ্ছে তারাও পোড়ে রোজ, প্রতিদিন, প্রতিরাতে। তাই পাওয়ার সাথে না পাওয়ার দ্বন্দ্ব তীব্র হলেই পিছু হটবে মৌলবাদ। এই দ্বন্দ্বের ওপরেই দাঁড়িয়ে দু'দেশের গঠন। সেই ইতিহাস, ঐতিহ্য, লড়াইকে তীব্র করেই রুখতে হবে মৌলবাদকে। বাঁচাতে হবে এই উপমহাদেশকে মৌলবাদের ভয়ঙ্কর আগ্রাসনের হাত থেকে। তবেই স্বাধীনতার প্রকৃত পরিচয়ে পৌঁছে যাওয়ার রাস্তা প্রশস্ত হবে। যে স্বাধীনতার জন্য-

‘‘হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী ব’লে নৌকা চালায় উদ্দান ঝড়ে
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ’তে চলেছে –
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।’’

Comments :0

Login to leave a comment