Editorial

তেলের লোভে বেপরোয়া

সম্পাদকীয় বিভাগ

আর কোনও রাখঢাক নয়, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প একেবারে সাংবাদিক সম্মেলনেই তার আসল উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। বলেছেন তিনি চান ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের উপর আমেরিকার পূর্ণ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ। এই মুহূর্তে বিশ্বের যে কোনও দেশ থেকে বেশি তেল মজুত আছে ভেনেজুয়েলার মাটির গর্ভে। গত আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই তেল আমেরিকা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তার আগে সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়েই ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত পুতুল সরকার। গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও কোথায় ছিল না। সব দেশেই প্রায় ছিল হয় সামরিক জুন্টা সরকার অথবা স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র। সিআইএ’র অতি সক্রিয়তা এবং মার্কিন সেনাদের উপস্থিতিতে এই সরকারগুলি প্রধানত আমেরিকার অঙ্গুলি হেলনে ওঠা বসা করত। তখন সমগ্র মধ্য ও দক্ষিণ আ‍‌মেরিকা পরিচিত হয়ে ওঠে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের খিড়কির উ‍‌ঠোন হিসাবে। আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির অধীনে ছিল সব দেশের অর্থনীতি। খনিজ সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার লাতিন আমেরিকা তেল, তামা, লোহা, জিঙ্ক সহ সমস্ত খনিজের মালিক হয়ে ওঠে আমেরিকা-ইউরোপের বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থা। কৃষিও চলে যায় তাদের হাতে। বনজ সম্পদেরও দখল নেয় তারা। যুগ যুগ ধরে লাতিন আমেরিকার সম্পদ লুট করে উন্নত বিশ্বে সম্পদের পাহাড় জমেছে তেমনি নিঃস্ব হয়েছে লাতিন আমেরিকার মানুষ।
যুগ যুগ ধরে শোষণ-বঞ্চনা-লুটের বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকায় জনজাগরণ শুরু হয় ৯০-র দশক থেকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে দেশের সম্পদে দেশের মানুষের অধিকারের দাবিতে যে লড়াই দানা বাঁধতে শুরু করে ভেনেজুয়েলায় সেই লড়াইয়ের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন উগো সাভেজ। তাঁর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার বলিভারিয়ান বিপ্লব সংগঠিত হয়। মার্কিন অনুগত স্বৈরাচারী জুন্টা সরকারের পতন ঘটিয়ে সাভেজের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচিত হয় গণতান্ত্রিক সরকার। মানুষ প্রথম আস্বাদ পান গণতন্ত্রের, নাগরিক অধিকারের। পান নিজেদের সরকার। এই সরকার দেশ থেকে সমস্ত বিদেশি বহুজাতিক সংস্থাকে উৎখাত করে তেল সহ সমস্ত খনিজ, বনজ সম্পদের উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যবস্থা করে।
তখন থেকে ক্রোধে ফুঁসছে সাম্রাজ্যবাদ। স্বাধীন সার্বভৌম ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে তাদের মদতপুষ্ট পুতুল সরকার গঠনে গত আড়াই দশক ধরেই নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নানা সময় নানা মনগড়া অজুহাত খাড়া করে হস্তক্ষেপ করার বা হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু পেরে ওঠেনি। আমেরিকা বুঝে গেছে বিশ্বের বৃহত্তম তৈল ভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ কবজা করা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ধরে রাখা যাবে না। তাই যেভাবেই হোক ভেনেজুয়েলাকে হাতের মুঠোয় আনতেই হবে। মার্কিন বৃহৎ পুঁজিরও প্রবল চাপ তেল দখলে। বৃহৎ পুঁজি বিশেষ করে ধান্ধার পুঁজির সেরা প্রতিনিধি ট্রাম্প তাঁর প্রথম জমানার শেষে ২০২০ সালে ভেনেজুয়েলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাদের তেল অর্থনীতি ভেঙে চুরমার করে দেবার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তাতেও মাথা নত না করায় এবার একেবারে সরাসরি সামরিক হামলা চালিয়ে সস্ত্রীক রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করেছেন ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার অধীনে আনার জন্য।
 

Comments :0

Login to leave a comment