Assembly election 2026: North Bengal

নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে অধিকার রক্ষার সংগ্রাম

সম্পাদকীয় বিভাগ

জীবেশ সরকার
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন যা বিজেপি-আরএসএস’র  কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্যের তৃণমূল সরকারের অপশাসন, স্বৈরাচার ও দুর্নীতিতে বিপর্যন্ত। সারা রাজ্যের সাথে উত্তরবঙ্গের জনগণ এই বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ পেতেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন দৃঢভাবে। এই সময়ে জনজীবনে আঘাত আসছে বহুমাত্রায়, আর তা মোকাবিলায় জনগণের আন্দোলনও হচ্ছে বহুমাত্রিক। নির্বাচনী সংগ্রামও তারই একটি রূপ।
কর্পোরেট পুঁজির আধিপত্য ও আরএসএস নির্দেশিত হিন্দুত্বের রাজনীতির বিপজ্জনক মিশ্রণ জনজীবনে যে বিপর্যয় সৃষ্টি করে চলেছে তার উদ্বেগজনক শিকার হলো নানা ভাষা, নানা সম্প্রদায়, নানা ধর্মের মানুষের সমাহার উত্তরবঙ্গ। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের নানা প্রকল্প প্রসারিত করা হচ্ছে। এই বিভাজনের রাজনীতি ও ‘ভোট দখল’-এর অপকৌশলী খেলায় তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এরা মৌখিকভাবে পরস্পরের বিরোধিতা করলেও আদতে উভয়েই আরএসএস’র প্রকল্প মতই রাজনীতি করে চলেছে। এভাবেই সৃষ্ট ‘‘বাইনার’’কে ব্যবহার করছে প্রচার মাধ্যমগুলির সাহায্যে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে এই ‘‘বাইনারি’’ ভেঙে বামপন্থী শক্তি পুনর্জাগরিত করাই লক্ষ্য।
ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্রের সাথে জনবিন্যাসের বিভিন্নতা উত্তরবঙ্গে রয়েছে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল, ডুয়ার্স ও তরাই এলাকা, প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ সহ পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসাম, বিহার, সিকিম ঘেরা উত্তরবঙ্গের জনসংখ্যা ১,৮৭,০২,০৬০ জন। এর মধ্যে তফসিলি জাতি ২৭.৩৫ শতাংশ ও আদিবাসী ১৫.৭৮ শতাংশ। উত্তরবঙ্গের জনসংখ্যার মধ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম উল্লেখযোগ্য। আদিবাসীদের মধ্যে মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের সাথে তরাই-ডুয়ার্সের চা বাগান শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা উল্লেখযোগ্য। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর ও শিলিগুড়িতে রাজবংশী সম্প্রদায়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও ‘‘মতুয়া’’ সহ অন্যান্য তফসিলি জাতির মানুষের সংখ্যাও কম নয়। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে আরএসএস তথা বিজেপি ‘‘সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং’’ এর মধ্য দিয়ে সমগ্র উত্তরবঙ্গেই এই জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে প্রভাব বৃদ্ধি করে নির্বাচনে অধিকাংশ আসনেই জয়লাভ করেছে। আবার নির্বাচনে আসন কম পেলেও তৃণমূল-কংগ্রেস রাজনৈতিক সুবিধাবাদের প্রতিযোগিতায় তৎপর। উত্তরবঙ্গের চা বাগান শ্রমিক, কৃষক ও গরিব মানুষ দীর্ঘদিন বামপন্থী আন্দোলনের অংশীদার ও জনবিন্যাসে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য স্থাপনে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছে। তৃণমূ- বিজেপি’র প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপে সেই ঐক্য বিঘ্নিত। সেই ঐক্যকে বজায় রাখার  এবারের নির্বাচনে বামপন্থীদের চ্যালঞ্জ ।
জল (নদী), জঙ্গল (বনাঞ্চল) ও জমির বৈচিত্রে ভরা উত্তরবঙ্গ যেমন পর্যটনের ‘‘ল্যান্ডস্কেপ’’, তেমনই কর্পোরেট পুঁজি ও মাফিয়াদের লোভী নজরে বিদ্ধ। প্রকৃতিতে লুট ও ধ্বংস করার লাগাতার যে প্রক্রিয়া কেন্দ্র ও বাজোর  দুই সরকার করে চলেছে তার বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন নির্বাচনে ঘটাতে হবে। গঙ্গা নদীর ভাঙন যেমন মালদা ও মুর্শিদাবাদের ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে গৃহহীন ও জীবিকাহীন করছে দিনের পর দিন, কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারের উদাসীনতায়। তেমনই উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান নদী তিস্তাতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বড় বড় বাঁধ নির্মাণ করে নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত করে পাহাড় ও সমতলের ভূমি ধ্বংস ও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে গরিব পাহাড় ও সমতলবাসীকে। ধ্বংসহচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। আবার তোর্ষা, মহানন্দা, বালাসন, জলঢাকা, মানসাই, রায়ডাক সহ ছোট-বড় সমস্ত নদীতে চলেছে জমি মাফিয়াদের দাপট। শাসকদলের  মদতে চলেছে অবাধে বালি, পাথর উত্তোলন। পাল্টে যাচ্ছে নদীগুলির স্বাভাবিক গতিপথ, নাব্যতা ও জলপ্রবাহ। ফলে অতিবৃষ্টিতে ধস ও বন্যা হয়ে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। অসাধু ব্যবসায়ী ও মাফিয়াদের ‘সিন্ডিকেট’ পাহাড় ও সমতলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে,  বিপদও বাড়ছে। বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের মানুষ এই প্রশ্নের  কৈফিয়ত চাইছে  দুই শাসকদলের কাছেই ।
উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ বনাঞ্চল ও চা বাগানের জমি এখনো লুটেরা কর্পোরেটের নজরে। অরণ্য ধ্বংস করে উন্নয়ন ও নগরায়নের নামে জমি গ্রাস করে নিচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে সংরক্ষিত ও অসংরক্ষিত বনাঞ্চলে হোটেল, রিসর্ট ও বহুতল আবাস তৈরি করা হচ্ছে। একই সাথে উচ্ছেদ করা হচ্ছে অরণ্যবাসীদের। তাদের দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বিনা ক্ষতিপূরণে, সরকার-প্রশাসন-কর্পোরেটের যৌথ উদ্যোগে। যুক্ত শাসকদলের নেতা ও মন্ত্রীরাও।
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির মেরুদণ্ড  চা শিল্প। চা বাগান শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন ধরেই ন্যূনতম মজুরি ও বাস্তুজমির অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করে চলেছে। কিন্তু মালিক গোষ্ঠীর অনমনীয় মনোভাব প্রশ্রয় পাচ্ছে সরকারের কাছ থেকে। চা বাগান শ্রমিকদের আবাসনের নামে তথাকথিত ‘‘চা-সুন্দরী’’ প্রকল্প কার্যত ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ। অথচ অনেক চা বাগানের মূল্যবান জমি "টী-টুরিজম" এর নামে পুঁজিপতিদের হাতে দেওয়া হচ্ছে নামীদামি বিলাসবহুল তারকা হোটেল নির্মাণের জন্য। সরল আদিবাসী চা শ্রমিকরা সেখানে ব্রাত্য। অভিযোগ উঠছে যে এই ব্যবস্থার ফলে চা বাগানের প্ল্যান্টেশনের জমি হ্রাস পাচ্ছে। ফলে শ্রমিক সংখ্যা হ্রাস পাবে। সামাজিক পরিবেশেরও ভারসাম্য হচ্ছে। কর্মহীনতার কারণে অনেকে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বাইরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। সরকারের উপেক্ষা অবহেলার একটি মর্মান্তিক ফল হলো যে চা বাগান ও বস্তি এলাকা থেকে মহিলা ও নাবালক মানব পাচারের মতো বিপজ্জনক ঘটনা বেড়ে চলা। সামাজিক সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে।
সারা রাজ্যের সাথে উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে যন্ত্রণার একটি বিষয় হলো উদ্দেশ্যমূলক এসআইআর (SIR)।  নির্বাচনের নির্ঘণ্ট মোহিত হয়েছে, কিন্তু এখনো ভোটাররা হয়রানি ও উদ্বেগের শিকার। আরএসএস ও বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডা উদ্বেগজনকভাবে নির্বাচন কমিশনের নানা সিদ্ধান্তে পরিষ্কার বোঝা যায়। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলো মালদা, উত্তর দিনাজপুর ও পার্শ্ববর্তী মুর্শিদবাদ জেলায়। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় দেখা যাচ্ছে যে এই জেলাগুলিতে অনেক বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। বিচারাধীনের তালিকায় অস্বাভাবিক বেশি মালদায় ২৭.৭৩ শতাংশ ও উত্তর দিনাজপুরে ২২.৩৫ শতাংশ। মুর্শিদাবাদে আরও অনেক বেশি। আবার রাজবংশী সহ তফসিলি সম্প্রদায় অধ্যুষিত কোচবিহার জেলায় বাতিল ভোটারের সংখ্যা অন্য জেলাগুলির থেকে অস্বাভাবিক বেশি, ১,১৩,৩৭০ জন যা অবশ্যই সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, তফসিলি ও প্রান্তিক মানুষরাই যে এই আক্রমণের লক্ষ্য তা পরিষ্কার। এ যেন ফ্যাস্টিস্ত হিটলার জার্মানিতে ‘‘নুরেমবার্গ আইন’’ করে যে ভাবে ইহুদি ও অন্যান্যদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছিল তারই একটি পরিবর্তিত রূপ।
বিগত নির্বাচনে যারা বিজেপি-কে সমর্থন করে অধিকাংশ আসনে জিতিয়েছিল তারা এখন মোহমুক্ত হচ্ছে। বিজেপি’র নেতাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই প্রাক্তন তৃণমূল কংগ্রেসী। বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে ঘর অদল বদল এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি, স্বৈরাচার ভোটের লোভে ধর্মীয় তাস খেলার রাজনীতি সারা রাজ্যের সাথে উত্তরবঙ্গের মানুষও ক্ষুব্ধ। তারা এখন বুঝতে পারছে যে বিজেপি-কে দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করা বা তৃণমূল কংগ্রেসকে দিয়ে বিজেপি-কে প্রতিহত করার ধারণা শুধু ভ্রান্তই নয়,  রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। কেননা ঘটনাক্রম বলছে যে বিজেপি যদি আরএসএস’র প্ল্যান ‘‘এ’’ হয়, তা হলে তৃণমূল আরএসএস’র প্ল্যান ‘‘বি’’। মূল লক্ষ্য বামপন্থীদের বিশেষ করে সিপিআই (এম)’র অগ্রগতি আটকানো। তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক রাজ্যসভার সাংসদের মনোনয়নে পরিষ্কার  যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও তার সরকারের যাবতীয় দুর্নীতির অন্যতম "রক্ষাকবচ" পুলিশের প্রাক্তন ডিজি কিংবা আরএসএস পরিবারের আইনজীবী সদস্যকে স্থান দেওয়াতে তৃণমূল-কংগ্রেসের সাথে বিজেপি’র রাজনীতি ও দুর্নীতির মেলবন্ধন কতটা গভীরে। 
উত্তরবঙ্গের জনগণ নিজেদের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছে এবারের  নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপি দুই দলকেই পরাজিত করতে হবে। বাংলায় বামপন্থার পুনর্জাগরণের আহ্বান জানিয়ে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার থেকে যে "বাংলা বাঁচাও যাত্রা" শুরু হয়েছিল তাতে শ্রমিক-কৃষক সহ সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের উৎসাহ উদ্দীপনায় বোঝা যায়, মানুষ তৃণমূল ও বিজেপি’র বিকল্প শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহায়ক হলেই হয় না, প্রয়োজন বুথস্তর পর্যন্ত নির্বাচনী সংগঠন, জনগণের মধ্যে নিবিড় প্রচার ও মতাদর্শ বলীয়ান আত্মবিশ্বাস ও  কর্মীদের সক্রিয়তা। জনগণ বামপন্থীদেরই কাছে পেতে চাইছে। আমাদের সহযোগীদের বৃত্তও প্রসারিত করা গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরবঙ্গে পাহাড়, সমতলে, নানা জনগোষ্ঠী, কিছুদিন আগে পর্যন্ত যাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ক্ষীণ তাদের সাথে বাপন্থীদের বন্ধুত্বের পরিসর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নির্বাচনী সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জনমুখী নীতি, গণসংগ্রাম ও জনগণের অংশগ্রহণ। এবারের বিধানসভা নির্বাচনী সংগ্রামে উত্তরবঙ্গে কৃষক, চা বাগান শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিকসহ সমস্ত স্তরের শ্রমজীবী মানুষ, আর্থিক অনটনে বিপর্যন্ত মধ্যবিত্ত, বস্তিবাসী কিংবা এসআইআর’এ হয়রানির শিকার ভোটার, রান্নার গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হওয়া ক্ষুব্ধ নাগরিক ও যুব-ছাত্র-মহিলা সবার কাছেই ইতিবাচক পরিবর্তন ও রাজ্যে বামপন্থার পূর্ণজাগরণের বার্তা নিয়ে এসেছে বামফ্রন্ট। পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক স্বার্থেই এই নির্বাচনে সাফল্য অর্জন করতে হবে।

Comments :0

Login to leave a comment