BOOK | SAHITYA | SHYAMAL BHATTACHARJEE | MUKTADHARA | 4th YEAR | 9 JUNE 2026

বই | সাহিত্যের গহীন শেকড় থেকে এক আশ্চর্য যাত্রা | শ্যামল ভট্টাচার্য | মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ৯ জুন ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

BOOK  SAHITYA  SHYAMAL BHATTACHARJEE  MUKTADHARA  4th YEAR  9 JUNE 2026

বই | সাহিত্যের গহীন শেকড় থেকে এক আশ্চর্য যাত্রা

      শ্যামল ভট্টাচার্য 

মুক্তধারা | ৪র্থ বর্ষ | জুন ২০২৬
 

সাংস্কৃতিক সংগঠক, লেখক, কবি ও নাট্যকার শ্যামল সেনগুপ্ত প্রাবন্ধিক হিসাবে আমাদের ভাবিয়ে তোলেন তার সদ্য প্রকাশিত ‘সাহিত্যের গহীন শেকড় থেকে’ প্রবন্ধ সংকলনের বিষয় বিন্যাসে। উপস্থাপনার অভিনবত্বে। সমকালীন আধুনিকতার তির্যক বিশ্লেষণসহ ধ্রুপদি ও প্রগতিশীল সাহিত্যের কয়েকজন অবিস্মরণীয় লেখকের সাহিত্য সম্ফর্কিত তন্নিষ্ঠ আলোচনা আমাদের নতুন করে ফিরে দেখতে শেখায়। সংকলনের প্রথম প্রবন্ধটিই অতি বিস্তৃত গবেষণাধর্মী অনুসন্ধানের পরিচয় বহন করে ‘বাংলা নাট্যসৃজন ও মঞ্চায়ন : প্রসঙ্গ বিদ্যাসাগর’। শৈশবে রবীন্দ্রনাথকে ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের তর্জমা শোনাতে হয়েছিল বিদ্যাসাগরের সামনে বসে। সেছিল এক অভূতপূর্ব নাট্যযোগ। বিদ্যাসাগরের সুগভীর শেক্সপিয়ার প্রীতির সমস্ত সুলুকসন্ধান লেখক দিয়েছেন এখানে। নাট্যানুবাদ, নাট্যপর্যালোচনা, নাট্যচর্চার প্রচারের সর্বোতভাবে ঈশ্বরচন্দ্রের বিস্তৃত আখ্যান লেখক সংগ্রহ করেছেন। দ্বিতীয় প্রবন্ধটি যথেষ্ট বৌদ্ধিক উৎকর্ষ দাবি করে ‘রবীন্দ্রনাটক : প্রসঙ্গ জনতা’। বাংলা থিয়েটারের পথচলা শুরু থেকে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব নাট্যদর্শন, পর্যন্ত এক বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস সংক্ষিপ্ত পরিসরে স্হান পেয়েছে। বঞ্চিত মানুষেরা কিভাবে রবীন্দ্র নাটকে চরিত্র হয়ে উঠেছে তা বিভিন্ন নাটক থেকে সংলাপ তুলে ধরে একটা পরম্পরার সন্ধান করা হয়েছে যেখানে রবীন্দ্রনাথ ‘অচলায়তন’ থেকে ‘রক্তকরবী’ হয়ে ‘রথেররশি’ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন। কার্যত ‘রথেররশি’ নাটকের চিন্তার ঐক্যসূত্রে তৃতীয় প্রবন্ধটি এসেছে ‘রবীন্দ্রনাথের সুকান্ত’ শিরোনামে। ফ্যাসিজমের ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের কলম যখন গর্জে ওঠে ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস / শান্তির লোলিতবাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস / বিদায় নেবার আগে তাই / ডাক দিয়ে যাই / দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে / প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে’। সুকান্ত এই বিদ্রোহের উত্তরকালের কবি, তিনি লিখেছেন, ‘তাই আজ আমারো বিশ্বাস, / শান্তির লোলিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।/ তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে / দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে’। যোগ্য ব্যাখ্যাটি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লেখেন, ‘আধুনিক বাংলা কবিতার দ্বার বহুজনের জন্য সে খুলেদিয়ে গেছে’। রবীন্দ্র নাটকে বিপ্লবী চেতনার উত্তোরণ ঘটে যেখানে ঠিক সেখানেই সুকান্তর যাত্রা শুরু। এই যে কাব্যে ও সাহিত্যে একটি আধুনিক প্রতিস্পর্ধী ধারার সূচনা হল, সেই ধারাকে মনে রেখেই এসেছে পরবর্তী প্রবন্ধটি ‘শতবর্ষে প্রগতির অগ্রপথিক সোমেন চন্দ’। সোমেন চন্দকে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় উত্তাল হয়ে ছিলেন তৎকালীন লেখক, শিল্পী, কবিরা। এমনকি বুদ্ধদেব বসুও এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে লিখেছেন, ‘ক্ষমা ? / এরও ক্ষমা আছে ? / এ উন্মত্ত হনন বৃত্তিরে/ নীরবে সহিতে পারে, এতবড় মানবমহিমা / জানি না সম্ভব কিনা’। তাঁর গল্পগুলির অত্যন্ত নির্মোহ বিশ্লেষণ করেছেন লেখক।
পরবর্তী প্রবন্ধ ‘ভূমিলগ্ন গল্পকার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ’-এ এসেছে মৌলিক সন্ধান। মধ্যবিত্ত আবেগ সর্বস্বতা বাদ দিয়ে ‘নিম্নবিত্ত জীবন প্রবাহে অবগাহন করেছেন’ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। ছাত্রজীবনে বামপন্হী রাজনীতি ও ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যুক্ত ছিলেন তিনি। সমগ্র সাহিত্য নির্মাণে সেই দর্শনের বাইরে কখনও যাননি। তাঁর ‘গোঘ্ন’ গল্পটির বিশ্লেষণ লেখকের স্বতন্ত্র দৃষ্টির পরিচয় বহন করে। পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা আবার ফিরে পাই বিদ্যাসাগরকে। এবার ‘শিশু সাহিত্যের ভগীরথেরা: প্রসঙ্গ বিদ্যাসাগর’।এই প্রবন্ধে শিশু সাহিত্যের অনুষঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ এসেছে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের অবদান নিয়ে। বিদ্যাসাগরের শিশু সাহিত্যের গভীরতা এবং সর্বাধুনিকতার পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘বিদ্যাসাগরের রচনা শ্রমের আর একটি গৌরবগাথা হল বোধোদয়’। পাশাপাশি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’ ১ম, ২য়, ও ৩য় ভাগের সুবিস্তৃত আলোচনায় পাঠক ঋদ্ধ হবেন নিঃসন্দেহে। মনের অনেক অন্ধকার কেটে গিয়ে মনে হবে ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল’।
ভিন্নতর আঙ্গিকে লেখা হয়েছে ‘একুশের স্রোতধারা : কিছু প্রসঙ্গ’। ভিন্নতর এই অর্থে যে, বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিকায়ন ও তার পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের পথ বেয়ে খিচুড়ি ভাষায় পরিণত হওয়ার বিপদের শংকা গভীরভাবে ব্যক্ত হয়েছে। যেমন এসেছে অধুনা বাংলাদেশ বেতারে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা উর্দুতে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার সরকারি ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে অস্বীকার করবার ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্রের কথা।
‘কিছু টুকরো স্মৃতি : ইসলাম ধর্মাবলম্বী মায়েরা মেয়েরা’। অকপট মাধুর্যে ভরা সাক্ষরতা আন্দোলন, মুসলিম মা-বোনেদের শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে আসার অদম্য প্রয়াস, শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া মুসলিম মেয়েদের ইতিহাসে ‘অধোগতিনয়, অগ্রগতি এবিষয়ে সমীক্ষা করা দরকার’ – মন্তব্য জননেতা মাসুদাল হোসেনের। বড় সুখপাঠ্য এই স্মৃতিমেদুর আলেখ্যটি।
এই সংকলনে সবশেষে পাই একটি অবাধ্য আহ্বান – ‘মোবাইল নয়, আসুন বইপড়ি’। প্রকৃতপক্ষে এই নিবন্ধটি ২০২৩ সালে লালগোলা বইমেলায় প্রদত্ত ভাষণের লিখিত রূপ। বিষয়বস্তু সুনির্দিষ্ট হয়ে গেছে শিরোনামেই। এই যান্ত্রিক সংযোগ মাধ্যম আমাদের সমস্ত মানবিক লেনদেন রুদ্ধ করে দিচ্ছে। অনেক প্রশ্ন ও বিতর্ক উত্থাপিত হয়েছে এই নিবন্ধে। শেষ প্রস্তাবে বলা হয়েছে ‘জনচেতনা জাগরণে সাহিত্য-পুস্তক অনিবার্য প্রয়োজন, সেকথা বারবার জাতিকে বোঝাতে হয়, সে কাজে আপনারা সবাই এগিয়ে আসুন’। ভিন্নস্বাদের ব্যতিক্রমী একটি সংকলন, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
 

সাহিত্যে গহীন শেকড় থেকে। শ্যামল সেনগুপ্ত। উপসেক প্রকাশনী। ৭,বৃন্দাবন বাগচী লেন। কাশিমবাজার। বহরমপুর। ৩০০টাকা।

Comments :0

Login to leave a comment