নির্বাচনের আগে বিরোধী দলনেতা হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্য জনসভায় একাধিকবার ঘোষণা করেছিলেন বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্য থেকে ধর্ষণ শব্দটিই মুছে ফেলা হবে। যদি কেউ এমন কাজ করে তাকে সকালে জমা করে বিকেলে খরচ করে দেওয়া হবে, আদালত পর্যন্ত পৌঁছাবে না। অর্থাৎ ঘুরিয়ে তিনি এটাই বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন এবং আদালতে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উপযুক্ত সাজা দানের বিজেপি ধার ধারবে না। অভিযুক্তর অপরাধ প্রমাণ হবার আগেই তাকে খরচ করে ফেলা হবে এনকাউন্টারে। শুভেন্দু এটাও বলেছিলেন উত্তর প্রদেশের যোগী এবং আসামের বিশ্বশর্মার সরকারকে অনুসরণ করবেন তারা।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর শুভেন্দুরা ধর্ষণ শব্দ মুছে দেবার চেষ্টা মোটেই করেননি। সরকারের দু’মাস কাটতে না কাটতেই অন্তত দশটি ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ, নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েক ডজন। তবে যোগী রাজ ও হিমন্তরাজের অনুসরণে রাজ্যে এনকাউন্টারবাদের উদ্বোধন করে দিয়েছেন। বারুইপুরে ১১ বছরের পড়ুয়াকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্তদের একজনকে পুলিশি হেপাজতে থাকার সময় খরচ করে দিয়েছে শুভেন্দুর অধীনস্ত পুলিশ।
এমন একটা কিছু যে ঘটতে চলেছে তা কেউ কেউ অনুমান করেছিলেন নিহত নাবালিকার বাড়ি ঘিরে কথা বলা এবং এসপি’র অফিসে পদস্থ পুলিশকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রীর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য থেকে। তিনি বলেছিলেন এক সপ্তাহ পর আবার আসবেন এবং এর মধ্যে কি করেন সেটা দেখিয়ে দেবেন। তারপরই মানুষ দেখলেন খুন-ধর্ষণের অন্যতম অভিযুক্তদের অন্যতম একজনকে এনকাউন্টারের মাধ্যমে খুন করে দেওয়া হলো। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো খুন করা হয়েছে সেই আসামিকে যার কাছ থেকে পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি তথ্য ও সূত্র। সর্বপ্রথম ধৃত এই অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলই জড়িত অন্যান্যদের নাম বলেছিল। প্রভাসের সঙ্গে কথোপকথনের যে ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে তাতে দেখা গেছে প্রভাস অনেক তথ্য, তথ্যসূত্র, নাম বলছে। অর্থাৎ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর এক অপরাধচক্রের হদিশ পাবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। পুলিশি হেপাজতে জেরার যে ভিডিও সমাজমাধ্যমে দেখা গেছে তাতেও নতুন কিছু নাম ও ঘটনার কথা আছে। দেখা যাচ্ছে এই ভয়ঙ্কর ধর্ষণ-খুনের তদন্ত ও তাকে ঘিরে বৃহত্তর অপরাধ চক্রের হদিশ পাবার বিরাট সম্ভাবনা ছিল প্রভাসের দেওয়া তথ্যে। অথচ সেই প্রভাসই খুন হয়ে গেল তদন্তকারীদের হাতে। ফলে প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেল। তেমনি একে ঘিরে বৃহত্তর অপরাধচক্র এবং ষড়যন্ত্রের হদিশ পাওয়াও কার্যত অসম্ভব হয়ে গেল। তাই সন্দেহ দানা বাঁধছে তবে কি সেই বৃহত্তর অপরাধচক্র ও ষড়যন্ত্র দিনের আলো যাতে না পায় তার জন্যই কি এনকাউন্টার অনিবার্য হয়ে গিয়েছিল।
অতীতে এনকাউন্টার অনেক হয়েছে। তবে অবশ্যই এনকাউন্টার নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম। ভারতের সংবিধান তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটনের পর আদালতে বিচারের মাধ্যমে অপরাধীর শাস্তির অধিকার দিয়েছে। অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ হবার আগে আদালতের বাইরে তাকে সাজা দেবার বা মেরে ফেলার অধিকার দেয়নি। বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে এনকাউন্টার হয়তো জরুরি হয়ে পড়তে পারে, তৎসত্ত্বেও অভিযুক্তের মানবাধিকার ও বিচারের অধিকার বিবেচনায় রাখতে হয়। পুলিসের ব্যর্থতা বা অপদার্থতার কারণে যদি এনকাউন্টার করতে হয় তবে তার দায় পুলিশকেও নিতে হবে। তেমনি সরকার যদি বিচার ব্যবস্থাকে পাশে সরিয়ে রেখে নিজেই সাজা দেবার নীতি গ্রহণ করে বা পুলিশকে এনকাউন্টারে উৎসাহিত করে তবে সেটা গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা।
যে কারণেই এনকাউন্টার হোক, সেটা কাম্য নয়। এনকাউন্টার করে পুলিশ, সরকার বা শাসক দলের গর্ব করার মতো কিছু নেই। বাস্তবে বারুইপুরের ঘটনায় শাসক দল ও সরকারি কর্তাদের বুক ফুলিয়ে গর্ব করতেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মন্ত্রীদের ভাষ্যে এটাই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে বিজেপি সরকার তদন্ত বা বিচার ব্যবস্থার ধার ধারতে চাইছে না। শাসকের চোখে বেআইনি মনে হলে বুলডোজার দিয়ে তাদের বাড়িঘর দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। অপরাধী মনে হলে এনকাউন্টারে খরচ করে দেওয়া হবে।
Editorial
সকালে জমা বিকেলে খরচ
×
Comments :0