প্রতীম দে
ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি টুর্নামেন্ট কেবল শিরোপা নির্ধারণ করে না, বদলে দেয় পুরো একটি যুগের সংজ্ঞা। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ তেমনই এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই বিশ্বকাপ শুধু বিশ্বসেরার মুকুট কার মাথায় উঠবে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে না। একই সঙ্গে সাক্ষী থাকবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত প্রজন্ম বদলের।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে নিজেদের পায়ের জাদুতে শাসন করেছেন লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার জুনিয়র ও লুকা মদ্রিচ। বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ঘরোয়া লিগ ফুটবলের প্রতিটি বড় মঞ্চে তাদের পদচারণায় লেখা হয়েছে অসংখ্য ইতিহাস। কোটি কোটি সমর্থকের কাছে তারা শুধু ফুটবলার নন। তারা একটি প্রজন্মের পরিচয়, আবেগ এবং অনুপ্রেরণার নাম।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে তাই আবেগের রংটা অন্যরকম। কারণ ফুটবলবিশ্ব বিশ্বাস করছে, এই মঞ্চই হতে পারে এই চার কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপ। যে বিশ্বমঞ্চে তারা বছরের পর বছর কোটি মানুষের স্বপ্ন বুনেছেন, সেই মঞ্চ থেকেই হয়তো বিদায় জানাবেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। একসময় পেলের বিদায়ের পর বিশ্ব ফুটবল অপেক্ষা করেছিল নতুন নায়কের। তারপর এসেছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। মারাডোনার যুগ শেষ হলে ফুটবল নতুন করে চিনেছিল জিনেদিন জিদান, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহোদের। এরপর মেসি ও রোনালদো প্রায় দুই দশক ধরে এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দেন, যা ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত লড়াই হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজ সেই অধ্যায়ের শেষ পাতায় দাঁড়িয়ে ফুটবল আবার নতুন গল্প লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ উঠেছিল ২০২২ সালে। সেই মুহূর্ত অনেকের কাছে ছিল ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তিগুলোর একটি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি পূর্ণ করেছিলেন নিজের অসমাপ্ত স্বপ্ন। অন্যদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও ইউরোপীয় ফুটবলে তার অর্জন, গোলের পর গোল এবং অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের আসনে বসিয়েছে। নেইমার ব্রাজিলের সৃজনশীল ফুটবলের প্রতীক হয়ে এক দশকের বেশি সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর লুকা মদ্রিচ প্রমাণ করেছেন, কেবল গতি বা গোল নয় মধ্যমাঠের বুদ্ধিমত্তা, নেতৃত্ব এবং নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ দিয়েও একটি দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা যায়।
তাদের বিদায় মানে কেবল চারজন ফুটবলারের অবসর নয়। বিদায় নিচ্ছে এমন একটি যুগ, যেখানে কোটি সমর্থক নিজেদের দলকে যেমন ভালোবেসেছেন, তেমনি ভালোবেসেছেন প্রতিপক্ষের জার্সি গায়ে খেলা কিংবদন্তিদেরও।
তবে ফুটবল কখনও শূন্যতা পছন্দ করে না। ইতিহাসের নিয়ম মেনেই নতুন সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
বিশ্ব ফুটবলের নতুন মুখ এখন কিলিয়ান এমবাপ্পে। নিজের গতি, গোল করার ক্ষমতা এবং বড় ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম প্রধান তারকা হিসেবে। এবারের বিশ্বকাপে তার কাঁধেই থাকবে নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
ব্রাজিলের আশা ভরসার নাম ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ড্রিবলিং, গতি এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার অসাধারণ দক্ষতায় তিনি ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় অবশ্য স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। অল্প বয়সেই যে পরিপক্বতা, আত্মবিশ্বাস এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতা তিনি দেখিয়েছেন, তাতে অনেকেই তাকে আগামী দশকের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে দেখছেন। বিশ্বকাপের মতো বিশাল মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার এটাই তার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
শুধু এই তিনজনই নন। জুড বেলিংহ্যাম, জামাল মুসিয়ালা, পেদ্রি, গাভি, এন্ড্রিক, খভিচা কোয়ারাত্সখেলিয়া এবং আরও অনেক তরুণ ফুটবলার বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দাবিদার। ফলে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ এক অর্থে পুরোনো এবং নতুন প্রজন্মের মিলনমেলা।
বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে তাই থাকবে দ্বৈত আবেগ। একদিকে দর্শক চাইবেন মেসির জাদু আরেকবার দেখতে। অন্যদিকে একই দর্শক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবেন ইয়ামাল কিংবা এমবাপ্পের পায়ের শিল্পের দিকে। এক প্রজন্ম বিদায় নেবে করতালির মধ্য দিয়ে, আরেক প্রজন্মকে স্বাগত জানাবে সেই একই গ্যালারি।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ফুটবলের গতি, কৌশল এবং শারীরিক সক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা আরও বহুমাত্রিক। তারা আক্রমণ, রক্ষণ এবং ট্রানজিশন তিন ক্ষেত্রেই সমান কার্যকর। ফলে আগামী দশকের ফুটবল হবে আরও দ্রুত, আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
তবে পরিসংখ্যান বা কৌশলের বাইরে ফুটবল শেষ পর্যন্ত আবেগের খেলা। আর সেই আবেগই এবার বিশ্বকাপকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কারণ কোটি সমর্থক জানেন, এই টুর্নামেন্টের প্রতিটি মুহূর্ত হয়তো ইতিহাস হয়ে থাকবে। মেসির শেষ কর্নার, রোনালদোর শেষ ফ্রি-কিক, নেইমারের শেষ ড্রিবল কিংবা মদ্রিচের শেষ নিখুঁত পাস সবকিছুই ভবিষ্যতে স্মৃতির অ্যালবামে জায়গা করে নেবে।
অন্যদিকে এমবাপ্পের আরেকটি দুরন্ত দৌড়, ভিনিসিয়ুসের বক্সের ভেতরে জাদুকরী নৈপুণ্য কিংবা ইয়ামালের অপ্রত্যাশিত কোনো গোল হয়তো ঘোষণা করবে ফুটবল তার নতুন রাজাকে খুঁজে পেয়েছে।
প্রতিটি প্রজন্মই বিশ্বাস করে, তাদের সময়ের নায়কেরাই ছিলেন সেরা। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য হলো, এখানে কোন যুগ স্থায়ী নয়। একজন কিংবদন্তি বিদায় নিলে আরেকজন তার জায়গা নেন। ইতিহাস থেমে থাকে না, বদলে যায় শুধু নায়কের নাম।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ তাই কেবল আরেকটি বিশ্বকাপ নয়। এটি বিশ্ব ফুটবলের স্মৃতির খাতায় এমন একটি অধ্যায়, যেখানে একই সঙ্গে লেখা হচ্ছে বিদায় এবং অভিষেকের গল্প। একদিকে কিংবদন্তিদের শেষ বিশ্বমঞ্চ, অন্যদিকে ভবিষ্যতের তারকাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বের পরীক্ষা।
হয়তো বছর দশেক পর ফুটবলপ্রেমীরা এই বিশ্বকাপের কথা স্মরণ করবেন এক বিশেষ কারণে। তারা বলবেন, এটাই ছিল সেই বিশ্বকাপ, যেখানে মেসি-রোনালদোদের যুগের শেষ বাঁশি বেজেছিল। আর একই সঙ্গে বাজতে শুরু করেছিল এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস, ইয়ামালদের নতুন ফুটবল সাম্রাজ্যের প্রথম শিস।
বিশ্বকাপের ট্রফি শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে, সেই উত্তর সময় দেবে। কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যেই নিশ্চিত এই আসর শেষ হওয়ার পর বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র আর আগের মতো থাকবে না। কারণ ইতিহাসের নিয়ম মেনেই একটি যুগ শেষ হচ্ছে, আর নতুন এক যুগ আত্মপ্রকাশ করছে কোটি কোটি দর্শকের চোখের সামনেই।
Comments :0