ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায়, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য হয়েছে। এই মর্মে উদ্বেগ জানিয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের তিন বিশেষ আধিকারিক (Special Rapporteur) এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে অসন্তোষ জানিয়েছেন। ভারত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ দেশ। সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বৈষম্য এই আইনের বিরোধী। ফলে এসআইআর প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
সংখ্যালঘু বিষয়ক বিশেষ আধিকারিক নিকোলাস লেভরা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা ও প্রসার বিষয়ক বিশেষ আধিকারিক আইরিন খান এবং ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ আধিকারিক নাজিলা ঘানেয়া গত ১ মে কেন্দ্র সরকারকে ওই চিঠি পাঠান। সেখানে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সরকারের মতামত জানতে চাওয়া হয়।
পাশাপাশি, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে যোগ্য ভোটাররা যাতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কেও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়ার বৈধতা বহাল রাখে। আদালত জানায়, নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের বিশেষ পুনর্বিবেচনা চালানোর সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশেষ আধিকারিকদের চিঠিতে বলা হয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়া যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে তাঁদের বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বহু বাংলাভাষী মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাদের ঐতিহাসিকভাবে ‘বিদেশি’ বা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতার কারণে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে, প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকরাও সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে অনৈতিক ভাবে বাদ পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এসআইআরের দ্বিতীয় পর্যায়ে বহু ব্যক্তি বৈধ পরিচয়পত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে অনুপাতের তুলনায় অনেক বেশি। বিভিন্ন নথিতে নামের বানানে সামান্য অমিল, যা ভারতে প্রশাসনিক কারণে অস্বাভাবিক নয়, সেটিকেও ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের আধিকারিকরা জানিয়েছেন যে এমন বৈষম্যের অভিযোগ তঁদের কাছে এসেছে।
বিহারে পরিচালিত এসআইআর নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই আধিকারিকরা। তাঁদের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া এবং নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর একটি ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যার স্বচ্ছতা, সম্ভাব্য ত্রুটি এবং পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
চিঠিতে এসআইআরকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি আধিকারিকদের কিছু মন্তব্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মতে, কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সরকারি ব্যক্তিত্বের বক্তব্য মুসলিম, বাংলা ভাষাভাষী এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক প্রচারকে উৎসাহিত করতে পারে। অভিযোগ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টিকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত করার সঙ্গে যুক্ত করে মন্তব্য করেছেন। যার ফলে ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের বিদেশিদের সঙ্গে এক করে দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করেছিলেন, যা একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ব্যবহৃত হয়েছে বলেই অভিযোগ।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশেষ আধিকারিকরা অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, তারা এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চান না। তবে অতীতেও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেছেন, অভিযোগগুলি সত্য হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংক্রান্ত একাধিক দায়বদ্ধতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাঁদের মতে, এসআইআর প্রসঙ্গে সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের কিছু বক্তব্য আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR) অনুযায়ী বৈষম্যকে উসকে দেওয়ার শামিল বলে বিবেচিত হতে পারে। উল্লেখ্য, ভারত ১৯৭৯ সালে এই আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন করে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুনে বিহারে এসআইআর শুরু করে নির্বাচন কমিশন। পরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১০টি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেও এই প্রক্রিয়া চালু হয়। পশ্চিমবঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে। তাদের প্রায় ৩৪ লক্ষের আবেদন এখনও সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
SIR UN
এসআইআর-এ বৈষম্যের শিকার সংখ্যালঘুরা, প্রশ্ন তুলে কেন্দ্রকে চিঠি রাষ্ট্রসঙ্ঘের
×
Comments :0