অলকেশ দাস
প্রথমে চাকদহের প্রমথ মণ্ডল, দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজু সরদার, হালিশহরের বিপ্লব রায় শেষে কাঁকিনাড়ার ঝালমুড়ি বিক্রেতা কার্তিক সাউ। এরা সব অনাম্নী। ডাবল ইঞ্জিন সরকার না এলে হয়তো এদের কেউ চিনত না। গত দু’মাসের রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী নয়া ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যের আগ্রাসনের প্রতীক বুলডোজার সংস্কৃতির এরা বলি। এরা সবাই রেল হকার। স্টেশনে দোকান অথবা রেলের কামরায় কামরায় পণ্য ফেরি করার চলমান হকার। রেল, রাজ্যের সরকার, কেন্দ্রের সরকার সবাই মিলে ফন্দি করেছে স্টেশনে আর হকার রাখতে দেবে না। তাহলে খাব কি আর সংসারটাই বা চলবে কি করে? মনের মধ্যে এই আতঙ্কের ঘুরপাকে কারোর হৃদযন্ত্র বিকল অথবা কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। নতুন সরকার আসার পরেই যারা বলেছিল রাজ্যটাকে উন্নয়নে দিনরাত এক করে দেবে, তারা সত্যিই শ্রমজীবী মানুষের দিনকে রাত করে ছেড়েছে। রেল হকার উচ্ছেদ, পথ হকার উচ্ছেদ, রেল বস্তি উচ্ছেদ। যারা ভয় থেকে ভরসা জোগানোর কথা বলেছিল তারা আজ রাজ্যের আকাশকে আতঙ্কে ঢেকে দিয়েছে।
কৃষ্ণনগর রেলস্টেশন। গত জুনের ১৬ তারিখ। গভীর রাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রেল আর তার বাহিনী। আরপিএফ (কেন্দ্রীয় সরকারের, রেলের পুলিশ), জিআরপি (রাজ্য সরকারের রেল পুলিশ), সিআরপিএফ (কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ), কেবলমাত্র রেল হকারদের উচ্ছেদ করার জন্য নিযুক্ত এজেন্সির পুলিশ, রেলের আধিকারিকরা। স্থানীয় থানার অগুন্তি পুলিশ। রাজ্য পুলিশ আরও এসেছে পার্শ্ববর্তী থানাগুলি থেকে। আরপিএফদের টেনে আনা হয়েছে শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর অবধি যত পোস্ট আছে সেখান থেকে। রানাঘাট থেকে আগের দিন দুপুরে চলে এসেছে ৪০ জনের 'দুরমুশ' বাহিনী। হাতে শাবল,গাঁইতি, হাতুড়ি। দোকান ভাঙার জন্য। নিমেষে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য। যাতে ইতিহাসের কোনও চিহ্ন না থাকে। দুপুর বেলায় ইলেকট্রিক লাইন বন্ধ করা হয়েছে স্টেশনের। তবু ভাঙতে গিয়ে যদি আগুন লাগাতে হয় তার জন্য দাঁড় করানো হয়েছে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িকে। আর একটু দুরে দণ্ডায়মান বিশালাকার জলকামানের গাড়ি। প্রতিবাদীদের তীব্র জলের তোড়ে ধুইয়ে দেওয়ার জন্য। কৃষ্ণনগরের মানুষের অভিযোগ বিজেপি’র এমএলএ নাকি স্টেশনের বাইরে এসব তদারকির জন্য ছিলেন। সব কাজ হয়ে যাওয়ার পরই তার গাড়ি রওনা হয়। এরা ছিল ভাঙার দল। কিন্তু গড়া জিনিস ভাঙার বিরুদ্ধে রেল স্টেশনের শামিল ছিল প্রচুর শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। তাদের বন্দুকের মুখে রেখে ঘিরে ধরে স্টেশনে বুলডোজার চালিয়েছে বর্বরেরা। প্রথম আঘাত করেছে রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়নের অফিস। শ্রমজীবীদের সংগঠিত করার কেন্দ্র। সেই জন্য এর ওপর বুলডোজার সরকারের সবচেয়ে বড় আক্রোশ। যে জ্যোতি বাবু প্রথম বামফ্রন্টের সরকারের শুরুতে বলেছিলেন শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশ হস্তক্ষেপ করবে না তার ছবি যখন ভাঙতে গেছে পুলিশ একজন রেল হকার জীবনের পরোয়া না করে সেই ছবি উদ্ধার করে মাথার উপর তুলে ধরেছে। শত আক্রমণেও সজাগ থেকেছে শ্রমজীবীর চেতনার মস্তিষ্ক।
এইসব রাজনীতির পেছনে এক বড় অর্থনীতি কাজ করছে। করোনা পর্বের পূর্বে রাজ্যে প্রায় এক লক্ষ রেল হকার ছিল। এই সময়ে ছিটকে গেছে অনেক রেল হকার। আবার ওই পর্বে কাজ হারা অনেক হতদরিদ্র মানুষ রেল হকারিতে যোগ দিয়েছে। প্রায় বিনা পুঁজির এই পেশাতে। যদি ৭৫০০০ রেল হকারও টিকে থাকে, তাদের গড় আয় দিনে ২০০ টাকা। সব মিলিয়ে দিনে দেড় কোটি টাকা। বছরে ৬০০ কোটি। কুড়ি শতাংশও যদি লাভ থাকে তবে পণ্য বিক্রির পরিমাণ বছরে ৩০০০ কোটি টাকা। এই বাজার ধীরে ধীরে তৈরি করেছে রেল হকারেরা। রেল যাত্রীদের পছন্দ ও চাহিদা বুঝে। আর এক কৃতিত্ব তদানীন্তন বামফ্রন্ট সরকারের। যারা সাধারণ মানুষের, রেল যাত্রীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছিল। এই বিশাল অ্যানুয়াল টার্ন ওভারের দিকে যখনই নজর পড়েছে মহাধনীদের তখন থেকেই তারা রেলমন্ত্রক, রেল বোর্ডকে ব্যবহার করছে হকারমুক্ত রেলস্টেশনের অভিমুখে। তৃণমূল সরকারের শেষ দিকে রাজ্য সরকার আত্মসমর্পণ করেছিল পুঁজির কাছে। এখন ডাবল ইঞ্জিন সরকারের ফলে পুঁজির সওয়ারি হয়ে উদ্বাহু নৃত্য করছে হকার উচ্ছেদ নীতি। হকারের সর্বনাশে পৌষ মাসের দিন গুনছে কর্পোরেট ।
রেল হকারদের উৎখাত করতে রেল কর্তৃপক্ষ আর এক নতুন ষড়যন্ত্র রচনা করেছে। শুধু স্টেশন রেল হকারদের উচ্ছেদ করার পরিকল্পনাতেই ক্ষান্ত হয়নি রেল কর্তৃপক্ষ। এবার রেলের কামরায় সাধারণ যাত্রীদের মুখে জল, খাবার পৌঁছে দেওয়া রেল হকারদের উৎখাতের পরিকল্পনা করছে রেল। তার পিছনে ডাবল ইঞ্জিন সরকারের আশীর্বাদ। রেল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে লাইসেন্স বিহীন রেল হকারদের ফাইন ২০০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০০ টাকা করা হবে। চলমান রেল হকারদের প্রতিদিনের গড় আয় ১০০ টাকা। রেল হকারদের একদিন পাঁচ হাজার টাকা ফাইন করা মানে তার প্রায় দু’মাসের আয় চলে যাওয়া। রেল হকারেরা এর আগে তিন দশকের অধিক সময় ধরে লাইসেন্সের দাবি করে এসেছে। রেল কিছুতেই শুনতে চায়নি। এর আগে বিনা কারণে রেল হকারদের মহিলা কামরায় উঠেছে বলে ফাইন করা হতো। এবার সেই ফাইনও বাড়ানো হয়েছে আড়াই হাজার টাকা। আর এক জায়গায় রেল কর্তৃপক্ষ বলেছে বিপজ্জনক সামগ্রী বহন করলে ন্যূনতম দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। রেল হকারদের আশঙ্কা রেলের কামরায় তাদের পণ্য বিক্রি করা বন্ধ করতে এই আইন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হবে। রেল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ১৯ জুন থেকেই এই পদক্ষেপ কার্যকরী হচ্ছে। স্টেশনগুলিতে মাইকে সারাদিন ঘোষণা করা হচ্ছে যে লাইসেন্সবিহীন কোনও রেল হকার স্টেশনে থাকলে তাকে ৫০০০ টাকা ফাইন করা হবে। মাইকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে স্টেশনে কেউ ভিক্ষাবৃত্তি করলে তাকে আড়াই হাজার টাকা ফাইন করা হবে। রাজ্যের বিভিন্ন রেল স্টেশনে এইরকম ঘটনা ঘটছে। তিন দিনে কালনা থেকে কাটোয়া এই লাইনে প্রায় ৫০ জন হকারকে ফাইন করা হয়েছে। সারা রাজ্যে চলমান রেল হকারদের যাদের সাধারণভাবে রানিং হকার বলা হয় তারা এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের মধ্যে আছে। রানিং হকারদের রেল স্টেশনে পা দিতে দিচ্ছে না রেল পুলিশ। খুব সকালে অথবা খুব রাত্রে লুকিয়ে লুকিয়ে কোনোমতে পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করছে রানিং হকারেরা। অন্য এক ধরনের মানসিকতাও আছে। কোনও রেল হকারকে ফাইন করলে দলবদ্ধভাবে অন্য রেল হকারেরা ঘিরে ধরছে আরপিএফ’র ফাঁড়ি। তাদের চোখে চোখ রেখে হকের কথা বলছে রেল হকারেরা। মাথা নোয়াতে বাধ্য হচ্ছে রেল পুলিশ। শ্রমিকের সংখ্যা, দলবদ্ধতা নতুন মেজাজ তৈরি করছে। এরমধ্যেও রেল পুলিশের এক খেলা আছে। রেল হকারদের উঁচু মাত্রার ফাইনের ভয় দেখিয়ে তাদেরকে মাসোহারার বন্দোবস্তে আনতে চাইছে রেল পুলিশ। ঘুষ দাও আর হকারি করো। রেল হকারেরা তা মানতে নারাজ। তারা জানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘুষের হাঙরের হাঁ ক্রমশ চওড়া হয়। শুধু রেল হকারেরা নয়, এর ফলে ক্ষুব্ধ হয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। তারা ক্রমশ বুঝতে পারছেন দীর্ঘ রেল যাত্রায় পানীয় জল বা স্বল্প কোনও খাদ্য রেল কামরায় বা প্লাটফর্মে আর পাওয়ার উপায় থাকছে না। তারা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন যে যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য, উন্নয়ন, সৌন্দর্যকরণ ইত্যাদির জন্য রেল হকার উচ্ছেদ আসলে একেবারে ভুল ধারণা। গরিব রেল হকারদের তুলে শিয়ালদা স্টেশনে মল, সোনার দোকান, বড়লোকের খাবার দোকান তৈরি হয়েছে। সাধারণ যাত্রীদের কম পয়সায় খাবার কেনার দিন শেষ করতে চাইছে রেল। টয়লেট থেকে বসার জায়গার জন্য পয়সা দিতে হবে রেল যাত্রীকে। যারা রেল হকার তুলে দেওয়ার ভাবনায় সহমত ছিলেন তারা আফশোস করছেন যে তারা দাঁত থাকতেও দাঁতের মর্যাদা বোঝেননি।
এদিকে রেল যাত্রী ও রেল হকারদের বিভ্রান্ত করতে রেল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বিষয় ভাসিয়ে দিচ্ছেন। রেলস্টেশনের বাইরে যাত্রীদের খাবারের ভেন্ডিং জোন হবে বলছেন। কিন্তু সেখানে উচ্ছেদ হওয়া গরিব হকারদের কি জায়গা থাকবে? প্লাটফর্মের রেল হকারদের পুনর্বাসনের কি কোনও উপযুক্ত ব্যবস্থা রেল করতে পারবে? নাকি শিয়ালদহ , হাওড়ার মতো মহা ধনীদের দোকান বসবে? আসলে রেল হকারদের ভুলিয়ে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎখাত করতে চাইছে রেল কর্তৃপক্ষ।
বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের পেশা বাঁচানোর স্বার্থে স্থানীয় বিজেপি এমএলএ’র কাছে গিয়েছিলেন রেল হকারেরা। রেল হকারদের তারা পরিষ্কারভাবে তিন ধরনের কথা বলেছিলেন -১. এখন দোকান ভাঙুন ,পরে দেখবো ২. চুপচাপ দোকান ভাঙলে আপনাদের দোকান করে দেবো, বামেদের সঙ্গে আন্দোলন করলে কিচ্ছু পাবেন না ৩. রেলের জায়গা, রেল তার প্রয়োজনে সবকিছু করবে, আমি কিছু করতে পারবো না। এইসব কথা শুনে রেল হকারদের বেশিরভাগ অংশের বিজেপি’র জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কে মোহভঙ্গ হয়। রেল হকারেরা বুঝে নেন যে অধিনায়ক যদি ভোটের আগে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বুলডোজারের সামনে দাঁড়াবো বলে ভোটের পরে পুরো পাল্টি খান তাহলে তার দলের সদস্যদের ভাষ্য এইরকমই হবে।
হকারদের দীর্ঘশ্বাস আর এক জায়গায়। লালু প্রসাদ যাদব যখন রেলমন্ত্রী তখন ইউপিএ ওয়ান সরকার। বাসুদেব আচারিয়া, রেলওয়ে স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। রাজি হয়ে গিয়েছিলেন রেল হকারদের কিছু শর্তসাপেক্ষে লাইসেন্স দেওয়ার প্রশ্নে। কিন্তু তারপরেই ইউপিএ- টু সরকার। রেলমন্ত্রী হলেন মমতা ব্যানার্জি। লাইসেন্স আর হলো না। তারপরেও তৃণমূলের মুকুল রায় আর দীনেশ দ্বিবেদী রেলমন্ত্রী ছিলেন। সদিচ্ছা থাকলে রেল হকারেরা লাইসেন্স পেত। কিন্তু তা পায়নি। যেমন এখন বিপদের দিনে হাতে মাথা কাটা তৃণমূলের নেতারা উধাও। কেবল বামপন্থীদের লাল ঝান্ডা 'দুনিয়ার মজদুর এক হও '-এই অভিব্যক্তিতে তাদের পাশে।
কর্পোরেট কম্যুনাল নেক্সাস এখানেও প্রযোজ্য হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী ভোটের পরে যখন জনগণের সুবিধার জন্য হকারমুক্ত স্টেশন, পথঘাটের কথা বলছেন তখন নির্দিষ্ট করে উদাহরণ হিসাবে বলছেন পাক সার্কাস, খিদিরপুর, রাজাবাজারের কথা। ইঙ্গিত স্পষ্ট। রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের ঘোষণা বেরিয়ে আসছে। যে ক'টি স্টেশনে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হয়েছে তার মধ্যে বর্বরতম ও নির্মম উচ্ছেদ হয়েছে পার্ক সার্কাস স্টেশনে। আদালতের রেল হকার উচ্ছেদে স্থগিতাদেশকে তোয়াক্কা না করে বাহুবলির মতো রেল কর্তৃপক্ষ এককথায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে হকারদের স্টল এবং পাশের বস্তি।
গরিব রেল হকারদের উপর আক্রমণ রুখতে বহুমুখী কার্যক্রম অব্যাহত আছে। একদিকে আন্দোলন, অন্যদিকে আইনি পদক্ষেপ, সাধারণ মানুষের মতামত তৈরি করা চলছে। রেল হকারদের এক বড় অংশ গরিবস্য গরিব। এদের রুটি রুজি রক্ষা করতেই হবে। উপযুক্ত পুনর্বাসন দিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের দিকে এগোতে হবে। রেল প্রশাসন যদি তার মানসিকতায় হকারমুক্ত রেল স্টেশন চায়, সেই মানসিকতা নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। বাস্তবতার নিরিখে তাদের নমনীয় হতে হবে। রেল হকার উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ ঘোষণা করেই আলোচনার দরজা খোলা রাখতে হবে। অতীতের ইতিহাস, এ রাজ্যের সংস্কৃতি, রেল হকারদের অবদান, অসহায় মানুষের পাশে এ রাজ্যের মানুষের দাঁড়ানোর অতীত ইতিহাস সবকিছুকে মাথায় রেখেই আলোচনায় বসতে হবে।
Comments :0