editorial

ধ্বংসের পথে বাংলা

সম্পাদকীয় বিভাগ

পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ১৫ বছরের তৃণমূলী শাসনের দ্বিতীয় সংস্করণের যাত্রা শুরু হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে গোরুয়া শাসনের মধ্য দিয়ে। যেহেতু দ্বিতীয় সংস্করণ তাই বর্তমান সরকার আগের সরকারের পুরোপুরি জেরক্স কপি নয়। আগের সরকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বে‍‌শিরভাগটাই অপরিবর্তিত থাকলেও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বদলে নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়েছে। মূলত যে বৈশিষ্ট্যগুলির জন্য তৃণমূল ঘৃণিত, নিন্দিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, যেমন বেপরোয়া চুরি, লুটতরাজ, তোলাবাজি, কাটমানি ইত্যাদি, সেসব বিষয়গুলিতে নতুন সরকার খানিকটা রাশ টানার চেষ্টা করছে। তবে কোনও অবস্থাতেই পুরোপুরি রাশ টানতে পারবে না। কারণ তাতে ঠগ বাছতে গাঁ উজার হবার আশঙ্কা আছে।
মনে রাখা দরকার এরাজ্যে বি‍‌জেপি’র যেটুকু শক্তি ও প্রভাব বেড়েছে তা মোটেই আরএসএস-র জোরে হয়নি। বে‍‌শিরভাগটাই হয়েছে তৃণমূলের কল্যাণে। যতদিন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস দাঁত ফোটাবার সাহস বা সুযোগ পায়নি। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ রাজ্য আরএসএস’র মৃগয়া ক্ষেত্রে পরিণত হয়। সর্বত্র দ্রুত বাড়তে থাকে আরএসএস-র শাখা। সঙ্ঘ পরিবারের অন্যান্য সংগঠনগুলিও তাদের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে থাকে। গ্রামে গ্রামে তৈরি হয় আরএসএস পরিচালিত স্কুল। প্রকাশ্যে বিজেপি’র সঙ্গে মল্লযুদ্ধ দেখানও হলেও বিজেপি’র আদর্শগত স্বত্ত্বাধিকারী আরএসএস-কে সব রকমের সুযোগ দেওয়া হয় বাংলার বুকে শক্ত ঘাটি তৈরি করার জন্য।
আরএসএস ক্রমাগত শক্তিশালী হলেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিজেপি’র সংগঠন বাড়েনি। রাজ্যস্তরে নেতাদের হম্বিতম্বি মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারিত হলেও নিচুতলায় কর্মী-সংগঠন ছিল না বললেই চলে। তথাপি এমন একটা নড়বড়ে দলকেই বাংলার মানুষ ভোটে জিতিয়ে দেয় প্রধানত তৃণমূলের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পাবার আশায়। কিন্তু তৃণমূল এবং বিজেপি যে আসলে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ মানুষ অতটা তলিয়ে দেখেননি। যদিও বিজেপি গড়ে ওঠার পর্বে দেখেছেন বিজেপি-র নেতাদের বেশির ভাগটাই তৃণমূল থেকে ডেপুটেশনে আসা নেতা। এদের অনেকেই আবার তৃণমূলে ফিরে গেছেন। কেউ কেউ একাধিকবার যাতায়াত করেছেন।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভাল তৃণমূলী তকমা দিয়ে বে‍‌শিরভাগ তৃণমূলীকেই বিজেপি’র ওয়াশিং মেশিনে ধুইয়ে বিজেপি করে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শাসক বিজেপি’র নেতা, কর্মী, সমর্থকদের তিন চতুর্থাংশই আদতে তৃণমূলী। ফলত ১৫ বছরের তৃণমূলী ধারাই উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করছে বিজেপি। এটাই তৃণমূলের দ্বিতীয় সংস্করণ।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি যে ডিম ছোঁড়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রচলন করছে সেটা আসলে তৃণমূল থেকে আসা নেতা-কর্মীদের আড়াল করার জন্য। সর্বত্র বেছে বেছে কিছু কুখ্যাত তৃণমূলীকে ডিম ছুড়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তায় ঘুরিয়ে, গণধোলাই দিয়ে দেখাতে চাইছে তারা তৃণমূল থেকে আলাদা। পাশাপাশি তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকাশ্যে আনতে শুরু করেছে। বিজেপি যে শুধু মুসলিম বিরোধী নয়, তীব্রভাবে গরিব বিরোধী তার প্রমাণ রেখেছে বেপরোয়া হকার উচ্ছেদ ও বুলডোজার দিয়ে গরিবের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দিয়ে। তেমনি তাদের গণতন্ত্র বিরোধী ও সংবিধান বিরোধী স্বৈরাচারী চেহারাটাও দ্রুত প্রকাশ্যে আনতে শুরু করেছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে কার্যত পদদলিত করে এনকাউন্টার রাজ চালু হয়ে গেছে। সেটা মুখ্যমন্ত্রী সদম্ভে ঘোষণা করছেন। প্রতিটি ঘটনায় ধর্মীয় বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক উসকানিকে সামনে এনে বিপজ্জনক খেলা শুরু হয়েছে। রাজ্যে পুলিশ রাজ কায়েম করে দ্রুত ফ্যাসিবাদের দিকে পা বাড়াতে চাইছে। এখনই সচেতন প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে না তুললে বাংলার ধ্বংস অনিবার্য।

Comments :0

Login to leave a comment