চা বাগান আর পাহাড় ঘেরা ডুয়ার্সের নাগরাকাটা আজ এক গভীর সঙ্কটের আবর্তে। ২০১১ পরবর্তী সময়ে যে পরিবর্তনের ঢক্কানিনাদ শোনা গিয়েছিল, তা কার্যত শ্রমজীবী মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে চরম অন্ধকার। বন্ধ বা রুগ্ন চা বাগান, ক্রমবর্ধমান কর্মহীনতা আর ভেঙে পড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিবাদে এবার বিধানসভা নির্বাচনে জোরদার লড়াইয়ের ডাক দিল বামফ্রন্ট। হারানো অধিকার ফিরে পেতে মরিয়া ডুয়ার্সের এই জনপদ।
শুক্রবার নাগরাকাটা পার্টি অফিস থেকে নাগরাকাটা বাজার হয়ে সুলকা মোড় পর্যন্ত এক বিশাল প্রচার মিছিল ও জনসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছান বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী ও বাম নেতৃত্ব। মিছিলে শামিল হওয়া শয়ে শয়ে মানুষের চোখেমুখে ছিল দীর্ঘ বঞ্চনার ক্ষোভ। দীর্ঘদিনের দাবিপূরণ না হওয়া আর কর্মহীনতার জ্বালায় পিষ্ট সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জানান দিচ্ছে, নাগরাকাটার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে।
এলাকার অর্থনীতির মূল ভিত্তি চা শিল্প আজ ধুঁকছে। নাগেশ্বরী, কিলকোট, ধরণীপুর থেকে কেরন— সর্বত্রই শ্রমিকদের অবস্থা শোচনীয়। বাম জমানায় শ্রমিকরা যে সমস্ত ‘ফ্রি-বেনিফিট’ বা বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পেতেন, বর্তমান সরকারের জমানায় তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। মজুরি নিয়ে টালবাহানা আর পিএফ-গ্র্যাচুইটির অনিশ্চয়তা শ্রমিক পরিবারগুলোকে দারিদ্র্যের অতলে ঠেলে দিয়েছে। বকেয়া পাওনা মেটানোর দাবিতে সরব শ্রমিক মহল।
নাগরাকাটার শিক্ষা মানচিত্র আজ কার্যত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ব্লকের প্রায় ৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। বাম আমলে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার যে সুযোগ সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা পেতেন, তা আজ সুদূরপরাহত। ঝরে পড়া বা ড্রপ-আউটের সংখ্যা আকাশছোঁয়া। আশ্চর্যের বিষয়, ব্লকে এতগুলো স্কুল থাকলেও কোনোটিতেই বিজ্ঞান বিভাগ নেই। ফলে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই জনপদের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা। এর পাশাপাশি চা বাগানগুলোর স্বাস্থ্য পরিষেবা আজ স্রেফ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
এলাকায় কর্মসংস্থান না থাকায় যুবসমাজ কেরালা, দিল্লি বা ভিন রাজ্যে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে, কৃষকদের অবস্থা আরও করুণ। বন ও জমি মাফিয়ার দাপটে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় লোকালয়ে বাড়ছে হাতির আনাগোনা। হাতির উপদ্রবে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলেও ক্ষতিপূরণ মিলছে যৎসামান্য। জমি ও জঙ্গল রক্ষার লড়াই আজ সেখানে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রচার চলাকালীন বামফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী দিলকুমার ওঁরাও বলেন, ‘‘আমাদের মূল লক্ষ্য চা বাগান শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং তাঁদের কণ্ঠস্বর বিধানসভায় পৌঁছে দেওয়া। তৃণমূল ও বিজেপি'র জনবিরোধী নীতির ফলে যে শোষণ চলছে, তার বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকব। চা শিল্পের উন্নয়ন ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নই আমাদের প্রথম অঙ্গীকার।’’
জেলা সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য রামলাল মুর্মু শাসক ও বিরোধী উভয় শিবিরকে আক্রমণ করে বলেন, "আমরা কোনো ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’ বা কর্পোরেটদের থেকে অনৈতিক উপায়ে টাকা নিয়ে রাজনীতি করি না। আমাদের শক্তি জনগণের সাহায্য। টাকা বা প্রলোভনের ফাঁদে না পড়ে প্রকৃত ‘জনগণের সরকার’ গঠনের জন্য বামপন্থীদের সমর্থন করুন।"
এদিনের কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা ও স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে সিকান্দার মাঝি, এরিয়া সম্পাদক শের বাহাদুর লিম্বু এবং কৃষ্ণা ওঁরাও সহ অন্যান্যরা। লাল ঝান্ডার এই পদযাত্রা এদিন নাগরাকাটার অলিতে-গলিতে পরিবর্তনের নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
Election 2026 Nagrakata
জ্বলছে চা বলয়, বাড়ছে ক্ষোভ: নাগরাকাটায় হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে বামপন্থীরা
×
Comments :0