মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় দেশের মধ্যে ডাবল ইঞ্জিনের সরকারগুলিই অগ্রগণ্য সেটা কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশিত তথ্য-পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। তার থেকেও যেটা বেশি উল্লেখযোগ্য তা হলো অপরাধের তীব্রতায়, নৃশংসতায় এবং জান্তব বর্বরতায়ও অন্যদের বহু পেছনে ফেলে এগিয়েছে ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্যগুলি। গত এক দশকে মহিলাদের হাড় হিম করা যৌন বীভৎসতার যে ঘটনাগুলি গোটা দেশকে হতচকিত, স্তম্ভিত ও আলোড়িত করেছিল সেগুলি সবই প্রায় ঘটেছে ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্যে গেরুয়াযোগে। যোগীর রাজ্যে একের পর এক দলিত কন্যাদের দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে খুন হতে হয়েছে। অপরাধীরা তথাকথিত উঁচু জাতের গেরুয়া নেতা বা সমর্থক। ধর্ষিতা-নিহত কন্যাদের হয়ে কোনও ডাবল ইঞ্জিন কথা বলেনি। বরং ধর্ষকদের রক্ষার জন্য শাসক-পুলিশ সব রকমের প্রয়াস চালিয়েছে। মোদী-শাহদের আদর্শগত অভিভাবক সঙ্ঘ পরিবার যে মনুবাদী অনুশাসনের গন্ডিতে অনুগামীদের পরিচালিত করে সেখানে পুরুষতান্ত্রিকতার যূপকাষ্ঠে প্রতিদিন বলি প্রদত্ত হয় মহিলারা তাই মতাদর্শগত ও নৈতিক অবস্থানগত কারণে বিজেপি কোনোদিন কোনও অবস্থাতেই মহিলাদের সমানাধিকার, নারীর ক্ষমতায়নকে মেনে নিতে পারবে না। কেবলমাত্র এবং একান্তই সঙ্কীর্ণ ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে মহিলাদের মরাকান্না কাঁদবে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে। বিজেপি যদি আদর্শগত ও নৈতিকভাবে নারী ক্ষমতায়ন ও সমানাধিকারে বিশ্বাস করতো তাহলে প্রথম থেকেই এই বিষয়টি তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম ইস্যু হতো। সুদূর অতীত না হয় বাদ দেওয়া গেল, বিজেপি’র জন্মের পর থেকে নারীদের প্রশ্নে তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেনি। অবশ্য আরএসএস কর্তারা মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন নারীদের স্থান পরিবারের অন্দরে। পুরুষ তথা স্বামীর সেবাযত্ন করা এবং সন্তান উৎপাদন ও লালন পালন করাই মহিলাদের কাজ।
এহেন আরএসএস’র রাজনৈতিক শাখা বিজেপি’র যে নারী সম্পর্কে অন্য কিছু ভাবা সম্ভব নয় তা বলাই বাহুল্য। স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময় জাগে মোদীরা হঠাৎ করে এতটা নারীপ্রেমী হয়ে উঠলেন কেন! আচমকা মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণেই বা এতটা উন্মাদনা শুরু করলেন কেন! কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার আগে একাধিকবার একাধিক রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল। কোনোদিন তো তারা এমন দাবি তোলেনি বা তাদের শাসিত রাজ্য থেকে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেনি। বিপরীতে বামপন্থীরা বিশেষ করে সিপিআই(এম) নীতিগতভাবেই মহিলাদের সমানাধিকারের পক্ষে। জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারই দেশের মধ্যে প্রথম পঞ্চায়েত ও পৌরসভায় আশির দশকে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করে। তারপর রাজীব গান্ধী কেন্দ্রীয় আইন করে সারা দেশের জন্য সেটা লাগু করার ব্যবস্থা করেন। বামপন্থীদের আন্দোলনে মহিলা সংরক্ষণ বরাবর অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল, এখনও আছে। ইউপিএ সরকারের আমলে এই প্রশ্নে বিল তৈরির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বামপন্থীদের। বস্তুত ইউপিএ আমলেই ২০১০ সালে রাজ্যসভায় সেই বিল পাশ হয়। কিন্তু লোকসভায় পাশে বিজেপি কখনও সহযোগিতা করেনি। বরং নানা অছিলায় ভেস্তে দেবার চেষ্টা করেছে। মোদী ক্ষমতায় এসেও প্রথম পাঁচ বছর টু-শব্দটিও করেনি। পরে ২০২৩ সালে সেই বিল সম্মিলিত বিরোধীদের সমর্থনে পাশ হয়। কিন্তু তাকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়নি। চাইলে গত লোকসভা নির্বাচনেই মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ চালু করা যেত, করেননি। আগামী ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটেও চালু করা যায়। কিন্তু তা না করে আসন পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে মহিলা বিল জুড়ে দিয়ে নোংরা রাজনীতি করছেন। বিজেপি চায় না বলেই ২০২৪ সালে লাগু হয়নি। ২০২৯ সালেও হবে বলে মনে হয় না।
Double Engine and women
মোদীরা চায়নি তাই হয়নি
×
Comments :0