অনন্ত সাঁতরা
একদিকে ডানকুনি শিল্পাঞ্চল। দিল্লি রোড ও দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের পাশে ছোট মাঝারি অনেক শিল্প কারখানা। অন্যদিকে পশ্চিম দিকে গ্রামাঞ্চলের কৃষি বলয়। এই দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠা হুগলী জেলার চন্ডীতলা বিধানসভা কেন্দ্র। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ২০০৯ সালে গড়ে ওঠে ডানকুনি পুরসভা। এই পুরসভা সহ চন্ডীতলা ২ নং ব্লকের ৬টি এবং চন্ডীতলা ১ ব্লকের ৫ টি পঞ্চায়েত এলাকা নিয়ে গঠিত এই কেন্দ্র। ডানকুনি শিল্পাঞ্চল এখন ধুঁকছে। ডানকুনির দুই বৃহৎ শিল্পের একটি ডানকুনি কোল কমপ্লেক্স বন্ধ। আর বাংলার ঐতিহ্যশালী আর একটি শিল্প ডানকুনি মাদার ডেয়ারী রুগ্ন প্রায়। বহু শ্রমিকের কাজের ঠিকানা ছিল এই শিল্পাঞ্চল ঘিরে। এখন উৎপাদন নির্ভর শিল্প কারখানার বদলে বিভিন্ন কোম্পানির প্রোডাক্ট করা জিনিসপত্রের প্যাকেজিং ও বিক্রির ওয়ারহাউসের রমরমা। এখানে বেশিরভাগ ঠিকা শ্রমিককে দিয়ে কাজ চলে। কাজের সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ ঘন্টা। শ্রমিক শোষণ চলছে। সরকার, স্হানীয় প্রশাসন ও বিধায়ক-সাংসদের কোনও ভূমিকা নেই। গ্রামাঞ্চল থেকে বহু যুবক স্বল্প মজুরিতে এখানে কাজ করতে আসেন। এদের কোনও নিরাপত্তা নেই, নেই কোনও ভবিষ্যত।
ডানকুনি পুরসভার গঠনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত ১৬ বছর তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালনা করছে। কিন্তু নাগরিক পরিষেবা বড়ই বেহাল। পুরসভার বড় অংশ বর্ষায় হাবুডুবু অবস্থা। রাস্তা ঘাট, বাড়ির উঠোন, এমনকি ঘরের মেঝে জলমগ্ন হয়। এক কথায় জলযন্ত্রণায় দুর্ভোগে পড়েন নাগরিকরা। নিকাশি ব্যবস্থার কোনও নজর নেই। বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ডানকুনির নিকাশি ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের দাবিতে বহুবার বিক্ষোভ, কনভেনশন এবং পুরসভায় ডেপুটেশন দেয়। কিন্তু প্রশাসন এখনো জমা জল নিকাশির কোনও মাস্টার প্ল্যান করেনি।
হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনের উপর বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তৈরি হয়েছিল ডানকুনি উড়ালপুল। হুগলী জেলার পশ্চিম অংশের ব্লকগুলির পাশপাশি দক্ষিণবঙ্গে জেলাগুলির সহজেই শহর কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। কিন্তু তৃণমূলের আমলে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সংকুচিত হয়েছে। যেমন - জনাই - ডানলপ এম - নাইন, শ্রীরামপুর- ডোমজুড় , ভগবতীপুর- উওরপাড়া রুটের বাস পরিষেবা বন্ধ হওয়ায় যাত্রী পরিবহনে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বেশি খরচ করে মানুষকে কাটা সার্ভিসে দুর্ভোগের মধ্যে চলাচল করতে হয়। চন্ডীতলা গ্রামীণ হাসপাতালে ২০১১ সালের পর থেকে আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, এখানে পরিষেবা না পেয়ে রোগী নিয়ে মানুষকে নার্সিংহোম ও দূরবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। জনাই বাকসা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাম আমলে ২৫ বেডের রোগী ভর্তি ও প্রয়োজনীয় স্টাফের ব্যবস্থা হয়েছিল। এখন রোগী ভর্তি বন্ধ হয়ে গেছে এবং ডাক্তারও অনিয়মিত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কৃষ্ণরামপুর থেকে জনাই সুবেদার মোড় পর্যন্ত রাস্তার দু'ধারে নয়নজুলি বন্ধ করে শাসক দলের মদতে প্লটিং করা হয়েছে। জমি মাফিয়ারা জমি কিনে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে চাষাবাদ বন্ধ করেছে। এর ফলে নিকাশি ব্যবস্থার বেহাল দশা। এছাড়া চন্ডীতলার বিভিন্ন মাঠে মাটি মাফিয়াদের দৌরাত্বে মাটি কাটার ফলে চাষের জমি নষ্ট হচ্ছে। মাঠের চালু অনেক ডীপ টিউবওয়েল বন্ধ হয়ে গেছে। প্রশাসনের মদতে মাটি মাফিয়াদের দৌরাত্বের বিরুদ্ধে কৃষকরা ক্ষুব্ধ।
এবার চন্ডীতলা কেন্দ্রের বামফ্রন্ট মনোনীত এবং আইএসএফ ও সিপিআই (এমএল) সমর্থিত সিপিআই (এম) প্রার্থী সেখ আসিফ আলি। বাড়ি চন্ডীতলার পাঁচঘরা পঞ্চায়েতের বড়তাজপুর গ্রামে। তিনি অর্থনীতিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে চন্ডীতলা ১ নং ব্লকের আলিপুর সতীশচন্দ্র পাল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ছাত্র জীবনে এসএফআই কর্মী হিসাবে রাজনীতি জীবন শুরু। বর্তমানে সিপিআই (এম) নেতা। পাঁচঘরা পঞ্চায়েতের সিপিআই(এম)সদস্য ও বিরোধী দলনেতা। মানুষের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা রয়েছে। বামপ্রার্থী আসিফ আলীর প্রচার ঘিরে নৈটি, জনাই, বাকসা, ডানকুনি সহ বিভিন্ন এলাকায় উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায়। মানুষ এগিয়ে এসে প্রার্থীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। অনেকেই এলাকার সমস্যার কথাও প্রার্থীকে জানাচ্ছেন। ডানকুনিতে ৮ নং রেল গেটে আন্ডারপাস নির্মাণ, ডানকুনি পুরসভা এলাকার জলনিকাশি ব্যবস্থার পূপূর্ণাঙ্গ সংস্কার, ডানকুনিতে কলকারখানা স্থাপন ও পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য এখানে কাজের ব্যবস্থা করা। প্রার্থী মানুষের দাবি শুনচ্ছেন। প্রচারে তিনি বলেন, তৃণমূল সরকার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। বেগমপুরের বিখ্যাত তাঁতশিল্প এই সময়ে উঠে যাবার মুখে। রাজ্যে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে দূর্বল করা হচ্ছে। কৃষক ফসল ফলিয়ে লাভ পাচ্ছেন না । আলুর দাম নেই, বিক্রি হচ্ছে না। মাঠেই জড় করে আছে। পঞ্চায়েতগুলির এসএইচজি গোষ্ঠীর মাধ্যমে সহজে শর্তে ঋণের সুযোগ গরিব মানুষ পাচ্ছেন না। ফলে সর্বত্রই মাইক্রোফিনান্সের দাপট বেড়ে চলেছে। বিজেপি ও তৃণমূলের নীতির ফলে গরিব মানুষের উপর সঙ্কটের বোঝা বাড়ছে। আগামী নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপিকে পরাস্ত করে লালঝান্ডাকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হবে।
চন্ডীতলা বিধানসভা কেন্দ্রের তিন বারের তৃণমূল বিধায়ক স্বাতী খন্দকারের বিরুদ্ধে বিধানসভা এলাকার সর্বত্রই মানুষের ক্ষোভ বিক্ষোভ রয়েছে। এলাকার উন্নয়নে কোন নজর দেন না। তার উপর এলাকায় কোন যোগাযোগ রাখেন না। নির্বাচন এলে দেখা যায়। ভোট মিটে গেলে দেখা মেলে না।
চন্ডীতলার প্রাক্তন সিপিআই(এম) বিধায়ক ভক্তরাম পান। তিনি বামপ্রার্থী আসিফ আলির পাশে থেকে বিভিন্ন এলাকায় প্রচারে বড় ভূমিকা পালন করছেন। মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি বলেন, "বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত প্রসার ঘটে। সুচিয়া বিদ্যাসাগর মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয়। অনেক লড়াই করে স্বাধীনতার পরে দক্ষিণ সরস্বতী নদী সংস্কারের জন্য বামফ্রন্ট সরকার ৩২.১০ কোটি টাকা অনুমোদন করে, কাজও শুরু হয়। সরকার পরিবর্তনের পর তা স্থগিত হয়ে যায়। দু'পারে সেচ দপ্তরের জমি বেদখল হচ্ছে। ডানকুনি খাল , জনাই বেসিন, গোকুলপুর, উষ্ণরামপুর খাল বর্জ্য পদার্থে ঢেকে গেছে। প্রশাসন স্থবির। খালের পাশে চাষাবাদ বন্ধ, জনবসতি দূষণ যন্ত্রণার শিকার। বর্তমানে সংস্কারের অভাবে গ্রাম-শহরে অধিকাংশ রাস্তা চলাচলের অযোগ্য। বহু টাকা খরচ করে সংস্কার হলেও কাটমানির দৌরাত্ম্যে এক বছর টেঁকে না। পশ্চিমবঙ্গ আজ শাসকের কাছে শর্তহীন আনুগত্য, ভয় আর আতঙ্কের অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ভূখণ্ড। প্রজ্জ্বলিত আলো আনার জন্য সকল শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।"
Comments :0