spotlight

উত্তরবঙ্গের ‘লাইফ লাইন’ ভঙ্গুর, দেড় দশকে স্থায়ী কর্মী ৬৫০০ থেকে ৩৩২

স্পটলাইট

জয়ন্ত সাহা

উত্তরবঙ্গে যাত্রী পরিবহণের লাইফ লাইন উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমকে রাজ্য সরকার বেসরকারিকরণের পথে নিয়ে যাচ্ছে। এই আশঙ্কা এখন ক্রমশ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হচ্ছে উত্তরবঙ্গবাসীর কাছে।
১৯৯০ সালে গ্রামীণ এলাকায় বাস পরিষেবা পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম সেরার পুরষ্কার পেয়েছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিগমের চেয়ারম্যানের হাতে সেই পুরষ্কার তুলে দিয়েছিলেন। 
উত্তরবঙ্গে রাজার আমল থেকে সরকার পোষিত নিগমের যাত্রী পরিবহণই মূলত ভরসার কেন্দ্র। গত ১৫ বছরে খুব ধীরে ধীরে সেই লাইফ লাইনকে পরিকল্পনা মাফিক পঙ্গু করেছে রাজ্য পরিবহণ দপ্তর। সিআইটিইউ নিয়ন্ত্রিনগত এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন আগামী ৯ মার্চ কোচবিহার, শিলিগুড়ি, রায়গঞ্জ এবং বহরমপুরের চার ডিভিসন অফিসের সামনে নিগমকে বেসরকারিকরণের হাত থেকে রক্ষার দাবিতে ২৪ ঘণ্টার অবস্থান বিক্ষোভ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।
সিআইটিইউ নিয়ন্ত্রিত নিগমের এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সম্পাদক তথা সিআইটিইউ নেতা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ১৫ বছর আগে রাজ্যের ক্ষমতায় এসেই উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের বিষয়ে রোটান্ডায় এক সাংবাদিকদের বলেছিলেন,‘উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম নিয়ে আমাদের বিশেষ ভাবনা আছে।’ তার ভাবনা যে নিগমকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া সেটা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
বামফ্রন্ট আমলে নিগমের স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৬৫০০ জন। এখন সেই স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা মাত্র ৩৩২ জন। এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক গৌতম কুণ্ডু বলেন, তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই নিগমে ভিআরএস চালু করে কর্মী কমানো শুরু হয়। আর শূন্যপদগুলি অবলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই মুহুর্তে নিগম চলছে এজেন্সির মাধ্যমে চুক্তিতে নিযুক্ত কর্মী দিয়ে।
নিগমের কোচবিহারের সদর দপ্তর এবং বিভিন্ন ডিপোগুলিও ভুগছে শূন্যপদের জেরে। সদর দপ্তরের সিংহভাগ আধিকারিক পদ এই মুহুর্তে শূন্য। নিগমের ২১ টি ডিপোতেই নেই স্থায়ী ডিপো ইনচার্জ। অ্যাকাউন্টস অফিসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন চুক্তিতে নিযুক্ত কর্মী। ট্রাফিক অফিসার, পারচেজ অফিসার, লিগাল সেলের অফিসার পদ শূন্য। ল্যান্ড বিভাগের আধিকারিকের পদও ফাঁকা পড়ে আছে। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ভবনে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। অবসর প্রাপ্ত আধিকারিকদের কাজ চালানোর চেষ্টা করছেন ম্যানেজিং ডিরেক্টর।
নিগমের ২১ টি ডিপো আছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কৃষ্ণনগরের ডিপোটি। গত কয়েক বছরে বেশ কিছু লাভজনক রুট বেসরকারি হাতে চলে গেছে। দিনহাটা-চাঁচল, কোচবিহার-বুনিয়াদপুর, কোচবিহার- রায়গঞ্জ,আলিপুর-জয়গাঁ, শিলিগুড়ি- জয়গাঁ,মাথাভাঙা-মালদা এবং বহরমপুরের ১৪ টি লাভজনক রুট এখন বেসরকারি হাতে।
এখন নিগমের আর্থিক অবস্থাও বেহাল। নিগমের স্থায়ী, প্রায় ২৪৭৪ জন অস্থায়ী কর্মী এবং ৪৬১ জন ঠিকা শ্রমিকের বেতন এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশন দিতেই প্রতি মাসে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। এছাড়াও আছে জ্বালানির খরচ, যন্ত্রাংশ কেনার খরচ। সব মিলিয়ে মাসে ২২ কোটি টাকা দরকার। অথচ মাসে আয় হয় ১৫-১৬ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে রাজ্যের অনুদানের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বছরে ঘাটতি মেটাতে প্রয়োজন হয় কমপক্ষে ৭২-৭৫ কোটি টাকা!
নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দীপঙ্কর পিপলাই স্বীকার করছেন,‘‘নিগমের আয় বাড়ানোর জন্য নানা পরিকল্পনা নিলেও কোনও পরিকল্পনাই সফল হয়নি।’’ নিগমের কর্মীদের বক্তব্য, নিগমের সম্পত্তি বেচে দেওয়া আর দীর্ঘমেয়াদি লীজে পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোচবিহারের সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাসে এখন বেসরকারি সংস্থাকে ভবনের একটা অংশ তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে ‘ম্যারেজ হল’ করে ভাড়া দিচ্ছে বেসরকারি সংস্থা। 
নিগমের কর্মীদের অভিযোগ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গার ডিপোর জমি বেচে দিতে চাইছে কর্তৃপক্ষ। নিগম কর্তৃপক্ষের এই চেষ্টা রুখতে সব ইউনিয়ন একজোট হয়ে লড়াইতে শামিল হয়েছে। কর্মী সঙ্কট তীব্র হওয়ায় বারবার স্থায়ী কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব ফাইল পরিবহণ দপ্তরে পাঠালেও স্থায়ী কর্মী নিয়োগ হয়নি একজনও। উলটে নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দীপঙ্কর পিপলাইয়ের বিরুদ্ধে বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই চুক্তিতে কর্মী নিয়োগের অভিযোগ তুলেছেন নিগমের শ্রমিক ইউনিয়নগুলি।
এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গৌতম কুণ্ডু অভিযোগ করেন, সম্প্রতি কোচবিহারের নিগমের সদর দপ্তর ও শিলিগুড়িতে অন্তত ৫০ জনকে রীতিমত ইন্টারভিউ নিয়ে নিয়োগ করেছেন ম্যানেজিং ডিরেক্টর। স্মারকলিপি দিয়ে এই নিয়োগ নিয়ে চেপে ধরতেই তিনি সাফাই দিয়েছেন,‘আমি নই, নিয়োগ করেছে এজেন্সি’।
এদিকে যে চার এজেন্সি নিগমের কর্মী সরবরাহ করে সেখানেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ইউনিয়নগুলির। চার এজেন্সিকে এক্সটেনশন দিয়ে জিইয়ে রাখা হয়েছে। নতুন করে টেন্ডার করে কেন নতুন এজেন্সি কর্মী সরবরাহের দায়িত্ব পাচ্ছে না সেটাই রহস্যের। এই চার এজেন্সিই দায়িত্ব পেয়েছিল শুভেন্দু অধিকারী পরিবহণ মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময়ে।
উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের বড় সঙ্কট হলো, এজেন্সি মারফত নিয়োগ করা ১৬৬৮ জন কনট্রাকচুয়াল কর্মীদের নিয়ে। নিয়োগের সময়ে এদের মজুরি ছিল মাসিক ১৩৫০০ টাকা। ২০২৫ সালে এদের মধ্যে যাঁরা চালক তাঁদের মাসিক মজুরি বেড়ে হয় ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। বাকি কর্মীরা সমহারে মজুরির দাবিতে যৌথ আন্দোলনে শামিল হন।
গত ২১ জানুয়ারি থেকে টানা ১২ দিন অবস্থান বিক্ষোভ দেখানোর পর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার শর্তে আন্দোলন তুলে নেয়। এরপর মন্ত্রীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠক হলেও কন্ডাক্টর  এবং মেকানিক হিসাবে নিযুক্ত শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। মজুরি না বাড়লে যে কোনোদিন স্তব্ধ হবে নিগম।
উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে চালু হয়েছিল উত্তরবঙ্গের পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে ভ্রমণের জন্য ‘সবুজের হাতছানি’ প্রকল্প। যা ছিল ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সেই প্রকল্পও চলে গেছে বেসরকারি হাতে।

Comments :0

Login to leave a comment