রিঙ্কি দাস
এক শিক্ষক মাইক হাতে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা বেহাল দশা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করছিলেন। হঠাৎ করে তাঁর হাতের মাইক কেড়ে নিয়ে তাঁকে বলতে বাধা দেওয়ার হলো ভরা সভায়। সভাটি কোচবিহারের তৃণমূলের প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের। স্বাভাভিকভাবেই শিক্ষকও সেই সংগঠনেরই সদস্য। আবার তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য অথচ বলতে দেওয়া হলো না তাঁকেও। পাছে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সবটা পর্দার বাইরে চলে আসে। যদিও সভায় উপস্থিত থাকা জেলার প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যানের বক্তব্য, সেই শিক্ষক একই কথা বারবার বলছিলেন তাই তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শীতলকুচির ওই তৃণমুলের শিক্ষক সংগঠনের সভার সারাংশ যাই হোক না কেন, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার চেহারা জানেন বাংলার মানুষ। কারণ তাঁরাও দেখতে পান যে স্কুলে তাদের সন্তান শিক্ষা অর্জনের জন্য যাচ্ছে, সেখানে বিনামূল্যে বই-খাতা-ইউনিফর্ম মিললেও মেলে না শিক্ষা।
প্রথমেই তাই আসা যাক শীতলকুচিরই স্কুলগুলি কীভাবে চলছে, সে কথায়। স্কুলের পড়ুয়া ৩০০০ জনের বেশি। শিক্ষক পদ আছে ৪৩। কিন্তু শিক্ষক আছেন ১৮ জন। অবশ্য চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক রয়েছেন ৬ জন। ফলে ১২৫ জন পড়ুয়া পিছু ১ জন শিক্ষক। শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী ৬০ জন পড়ুয়া পিছু ২ জন শিক্ষক অনুপাতের ধারে কাছেও নেই। ২ জন গ্রুপ সি এবং দু’জন গ্রুপ ডি থাকার কথা, কিন্তু আছে ১ জন করে।
শীতলকুচি গার্লস আপার প্রাইমারি স্কুল। ছাত্রী সংখ্যা মাত্র ২০ জন। আগে এই স্কুলে ১০০ জনের বেশি ছাত্রী থাকলেও সংখ্যা ক্রমশ কমেছে। সেইসঙ্গে ৪ জনের জায়গায় শিক্ষকও কমে এখন ১ জনে ঠেকেছে। দু’দিন পর এই স্কুল বন্ধ হওয়ার মুখে। শীতলকুচি গোপীনাথ হাইস্কুল। বহু পুরানো এবং বিখ্যাত স্কুল। বিশেষ করে এর সঙ্গে যুক্ত ছিল পিছিয়ে পড়া প্রান্তির জাতিগোষ্ঠীর ছাত্রীদের জন্য ছাত্রাবাস। এই স্কুলের শিক্ষক পদ ৫৯জন, এখন আছেন ১৯ জন, প্যারাটিচার আছেন ৮ জন। আর পড়ুয়া সংখ্যা ৩৫০০ এ বেশি। প্রায় ১৩০ জন পড়ুয়ার জন্য একজন শিক্ষক। গ্রুপ সি কর্মী আছেন ২ জন, কোনও গ্রুপ ডি কর্মী নেই। ফলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। আবার কোচবিহার জেলারই সোনারচালুন একরামিয়া হাই মাদ্রাসা চলছে মাত্র ৪ জন শিক্ষক দিয়ে। অথচ শিক্ষক পদ কিন্তু ১৬ জন। ৬৯০ জন পড়ুয়ার জন্য এক জন মাত্র গ্রুপ ডি’এর কর্মী রয়েছেন মাদ্রাসায়। সুতরাং এই সঙ্কটের কথাগুলিই কি লুকিয়ে রাখতে চায় সরকার? প্রশ্ন উঠছে।
এতো গেল শিক্ষক সঙ্কটের ছবি। এবার আসা যাক পরিকাঠামোর কথায়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ৭২ বছরের পুরানো রানিচক তেয়াল্লিশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কীভাবে ছাদ ভাঙছ, দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে। এই স্কুলটিতে একসময় অঞ্চলের বাসিন্দাদের সন্তানেরাই পড়ত। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩১ জনে, শিক্ষক আছেন দু’জন। এই স্কুলের ছাত্রই এক সময় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আধিকারিক হয়েছেন, খড়গপুর আইআইটিতে অধ্যাপনা করেছেন। আন্তর্জাতিক স্তরের নাম করেছেন, আইএএস হয়েছেন। কিন্তু এখন আর পড়ুয়ারাই স্কুলে আসছে না। যাঁরা একটু সচ্ছল হচ্ছেন গ্রাম ছাড়ছেন। অনেকে বাইরে চলে যাচ্ছেন। আক্ষেপের সুরে জানালেন বিদ্যালয়েরই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অরুণ হাজরা। ছাদের অংশ ভেঙে পড়ার প্রশ্ন শুনেই তিনি জানালেন,‘‘ একা আমার স্কুল নয়, এই সার্কেলে ৭ টা স্কুলের এমন বেহাল পরিকাঠামো নিয়েই ক্লাস চলছে। ‘দিদিকে বলো’তে ফোন করেছে একালার লোকজন, আমরা ডিআই অফিস থেকে শুরু করে সব জায়গায় জানিয়েছি। অপিস থেকে স্কুল দেখে গেলেন , ইঞ্জিনিয়ার এসে সবটা দেখেও গেলে বেশ কিছু মাস আগেই। কিন্তু এখনও কাজ শুরু করেনি। এই অবস্থায় ক্লাসরুমে ক্লাস চালানো যায় না। ফলে এখন অফিস ঘরেই ক্লাস চলছে।’’ সুতরাং, পশ্চিম মেদিনীপুরের শুধু রানিচক তেয়াল্লিশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ই নয়, সোনাখালি চক্রের আরও ৭টি স্কুলেও একই পরিস্থিতি। বরং বলা ভালো একই অবস্থা রাজ্যের হাজার হাজার স্কুলের একই অবস্থা।
বাঁকুড়ার পাত্রসায়র ব্লকের গঞ্জেরডাঙা গ্রামে একটি মাত্র শিক্ষক নিয়ে চলছিল শিশু শিক্ষা কেন্দ্র। অথচ গত ৩১ জানুয়ারি সেই শিক্ষিকা অবসর নিতেই বন্ধ হয়ে যায় শিশু শিক্ষা কেন্দ্র। ৪০ থেকে ৫০ জন পড়ুয়ারা পড়াশোনা করবে কোথায়? দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষা কেন্দ্র চালু করার দাবিতে গ্রামের বাসিন্দারা বিক্ষোভ দেখায়। গ্রাম থেকে ২ কিলোমিটার দূরের নারাঙ্গি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া সেই পড়ুয়াদের বিকল্প নেই। কিন্তু এত দূরে পড়ানোর মতো সামর্থ্য গ্রামবাসীদের নেই। ফলে পরিবারের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা করতে পারবে না এই ৪০ জন পড়ুয়া।
রাজ্য সরকারের নিজের দেওয়া তথ্য বলছে রাজ্যের ২২১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক জনও শিক্ষক নেই অথবা মাত্র এক জন শিক্ষক দিয়ে স্কুল চলছে। সবচেয়ে করুণ অবস্থা পুরুলিয়ায়। জেলার ৩০৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৭২টি স্কুলে শিক্ষক নেই বা মাত্র একজন আছেন। বাঁকুড়ায় ৩৫৬৮টির মধ্যে ৩৭১টি স্কুল চিহ্নিত করা হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরে ৩৪৮৭টি স্কুলের মধ্যে ২২৭টি স্কুলে শিক্ষক সংখ্যা একজন অথবা নেই। এমনকি কলকাতার মতো শহরেও ব্যতিক্রম নয় ১১৩৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮টি স্কুল শিক্ষক সঙ্কটে ভুগছে। সুতরাং রাজ্যের ২২টি জেলায় ৪৯,৩৬৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২২১৫টি বিদ্যালয় শিক্ষক শূন্য অথবা এক জন শিক্ষক রয়েছেন। প্রথমত এই স্কুলগুলিকে ক্রমেই বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টায় আছ সরকার। যেমনভাবের সরকারে আসার দশ বছরেই রাজ্যের ৭০১৮টি প্রাথমিক স্কুল বন্ধ করেছিল। কিন্তু বাম আমলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৭৪ হাজারের বেশি।
পুরুলিয়ার প্রাথমিকই নয় উচ্চ বিদ্যালয়গুলিরও একই করুণ পরিস্থিতি। ঝালদা উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের মোট ৩৭ জন শিক্ষক থাকার কথা। কিন্তু ২২টি পদই খালি। ২৪৪৫ জন ছাত্রীর পঠন পাঠনের জন্য রয়েছে মাত্র ১৫ জন। বড়বাজার গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা ১৮৮৬ জন। শিক্ষক পদ ৩৮ জন। স্কুল চলছে মাত্র ১৭ জন শিক্ষক দিয়ে, খালি ২১ টি পদই। অথচ রাজ্য সরকারের সব থেকে বড় দুর্নীতি এই শিক্ষক নিয়োগ নিয়েই। শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, সমস্ত রকম সরকারি প্রকল্প নিয়েও একাধিক দুর্নীতি সামনে এসেছে। তা সে হোক, কন্যাশ্রী, তরুণের স্বপ্ন অথবা সবুজ সাথী। ফলে যে প্রকল্পগুলি আদতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, শিক্ষায় পড়ুয়াদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য ছিল, সেই প্রকল্পগুলি বর্তমানে অনেকাংশে তৃণমূলীদের পকেট ভরানোর বিকল্পে পরিণত হয়েছে। ঠিক সেই কারণেই, স্কুলের পরিচালন সমিতি থেকে শুরু করে পরিচালনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমস্ত স্তরেই নিজের দলের লোক ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে শাসক দলের। ফলে স্কুল থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় তৃণমূলে দাদাগিরির জন্যই খোলা মাঠে পরিণত হয়েছে।
যেখানে শিক্ষকরা একদিকে যেমন স্কুলের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য বরাদ্দকৃত সম্পূর্ণ কম্পোজিট গ্রান্টের দাবি করছেন, সেখানে শাসকদল ঘনিষ্ট শিক্ষক এবং পরিচালন সমিতির সদস্যদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বাঁকুড়ার ইন্দাস ব্লকের কেশমুড়ি উচ্চ বিধ্যালয়ের ঘটনায় এই দাদাগিরি এবং চুরির ছবি স্পষ্ট। ক্লাসরুমে শিক্ষকের ক্লাস চলাকালীন শ্রেণি কক্ষের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন করতে বিজেপি বিধায়কের জোর করে ক্লাসে ঢুকে যাওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। শিক্ষকদের একটি অংশ যখন শিক্ষকের অনুমতি না নিয়ে শ্রেনিকক্ষে ছাত্রদের সামনেই শিক্ষককে অপমানের বিরোধিতা করছেন। বিজেপি বিধায়কের দাদাগিরি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অন্যদিকে সেই বিজেপি বিধায়ক শিক্ষককে তৃণমূল ঘনিষ্ট বলে বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোর উন্নয়নের জন্য দেওয়া অর্থ নিয়ে দুর্নীতির করার অভিযোগও তুলছেন। সরকার প্রচারের বেলায় বারংবার মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পরক্ষারথীর বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে। পাশের হারের বাড়তে থাকা পরিসংখ্যান নিয়ে বড়াই করছে। কিন্তু শাসক দলের পকেট ভরানোর প্রকল্পের জন্য আসা শিক্ষার্থীরা শিক্ষার জন্য কতটা আগ্রহী? রাজ্যের বর্তমান সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে কেবল শিক্ষা বিহীন-ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাই শিক্ষকদের বক্তব্য, স্কুল কলেজের সমাজের সকল অংশের অংশগ্রহণের জন্য সরকারি প্রকল্প যতটা জরুরি, ততটাই জরুরি পরিকাঠামো উন্নত করা, সমাজের সকল অংশের কাছে শিক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধি করা। শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গে অভিভাবকদের আলোচনার সুযোগ আরও বাড়ানো। রানিচক তেয়াল্লিশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মতে, ‘‘কাগজে কলমে থাকা ‘পেরেন্ট-টিচার মিটিং’ বাস্তবে করতে হবে। তবেই শিক্ষা সচেতনতার কিছুটা হলেও সমাজের সকল স্তরে পৌঁছাতে পারে।’’
Comments :0