গল্প | কন্ডাকটর কাকু
সৌরীশ মিশ্র
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ৬ জুন ২০২৬
রতন রীতিমত ঘাবড়ে গেল। ঘাবড়াবে না! বাসে উঠে সাথে থাকা ভাড়ার টাকা হঠাৎ করে না পেলে পরিণত বয়সের যে কোনও মানুষই টেনশনে পড়ে যায়, সেখানে রতনের বয়স তো মোটে তেরো। ঘাবড়ে গিয়ে দরদর করে ঘামতে লাগল রতন।
ওর দাদুর বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে ফিরছে রতন। দাদুর কাছ থেকে একটা দরকারি কাগজ নিয়ে ফিরছে সে। আজ স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতেই রতনের মা রতনকে বললেন, "রতন, তুই খাবারটা খেয়ে একটু দাদুর বাড়ি যা তো। দাদু একটা কাগজ দেবেন সেটা নিয়ে আসবি। তোর বাবা আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতে পারবে না। ফিরতে নাকি রাতও হবে। আর, আমিও যে যাব, তারও উপায় নেই। আমার নামে একটা স্পিড পোস্টে চিঠি আসার কথা আছে। আর এদিকে কাগজটা আজই আনা চাই ও'বাড়ি থেকে। কি রে পারবি তো আনতে?"
"কেন পারবো না! একটা বাসেই তো যাওয়া-আসা যায় দাদুর বাড়ি। তুমি চিন্তা কোরো না।" মাকে আশ্বস্ত করেছিল রতন।
দাদুর বাড়ি থেকে দরকারি কাগজটা নিয়ে বাসস্টপে একটু দাঁড়াতেই বাসটা পেয়ে গিয়েছিল আজ রতন। বাসটা ফাঁকাই ছিল। জানলার ধারের একটা সিট দেখে বসেছিল ও। একটু বসে পকেট থেকে ভাড়ার টাকাটা বের করতে গিয়েই রতন খেয়াল করল ভাড়ার জন্য যে দুটো কুড়ি টাকার নোট ছিল পকেটে সে দু'টো নেই। পড়ে আছে দু'টো এক টাকার কয়েন, যেটা দিয়েছিল দাদুর বাড়ি যাওয়ার সময়ের বাসের কন্ডাকটর টিকিট কাটার সময় ব্যালেন্স হিসেবে।
রতন এখনও দরদরিয়ে ঘামছে। সে ফের একবার তার প্যান্টের পকেটগুলো চেক্ করল। না নেই। তাহলে, কি হোলো নোট দুটো! সে ভাবতে থাকে। তারপর হঠাৎই মনে পড়ে ওর, যে পকেটে টাকা রেখেছিল ও, সেই পকেটেই তো ছিল রুমাল। দাদুর বাড়ি থেকে বাসস্টপ পর্যন্ত হেঁটে এসে ঘেমে গিয়েছিল ও। তাই রুমালটা বের করে ঘাম মুছেছিল সে কয়েকবার বাসস্টপে। তার মানে কি তখনই আসাবধানতাবশতঃ পড়ে গিয়েছে নোট দুটো। তাই-ই হবে। মনে মনে নিজেকেই বলে রতন। কিন্তু, এখন কি করবে ও? বাসের ভাড়া না দিতে পারলে তো নির্ঘাত ওকে নামিয়ে দেবে বাস থেকে। তাহলে এতোটা রাস্তা ও যাবে কি করে? তবে, ও ফিরবে কি করে বাড়ি? প্রশ্নগুলো সব ভিড় করে আসতে থাকে রতনের মনে।
ঠিক এইসময় রতনের মনে পড়ে ওর বাবার ওকে বলা একটা কথা- "বিপদে পড়লে ঘাবড়াবি না কক্ষনো রতন। বরং মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করবি যতোটা সম্ভব। তাহলেই দেখবি, একটা আশার আলোর হদিস পাবি ঠিক তুই।"
বাবার কথাটা মনে পড়তেই রতন নিজের মনকে শান্ত করল যতটা সম্ভব। সে তারপর ভাবতে থাকল, এই পরিস্থিতিতে কি করা উচিত ওর আর কেই বা হেল্প করতে পারে ওকে। কয়েক মিনিট ভাবতে একটা উত্তরও পেল যেন সে, তার নিজের কাছ থেকেই।
এখনো বাসে প্যাসেঞ্জার বলতে হাতে গোনা কয়েকজন। রতন সিট থেকে উঠল। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল বাসের কন্ডাকটরের দিকে। কন্ডাকটর দাঁড়িয়ে ছিলেন গেটের পাদানিতে। রতন তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। ওকে দেখেই কন্ডাকটর বললেন, "সামনের স্টপেজে নামবে?"
"না কাকু, আমি যাবো আট নম্বর আইল্যান্ড।"
"সে তো এখনো অনেকটা দূর। তা হলে এখনই উঠে এলে কেন?"
"কাকু একটা কথা ছিল," আমতা-আমতা করে বলতে থাকে রতন, "আমার প্যান্টের এই পকেটে বাসভাড়ার টাকাটা ছিল। এখন না, পাচ্ছি না। বোধহয় রাস্তায় পড়ে গেছে কোথাও। তুমি বিশ্বাস করো কাকু, আমার কাছে ভাড়ার টাকা ছিল।" শেষ বাক্যটা বড় কাতর স্বরে বলে রতন।
কন্ডাকটর স্বপন ওঝা কন্ডাকটরির এই কাজ করছেন চল্লিশ বছর হতে চলল। চুল পাকিয়ে ফেলেছেন বলতে গেলে তিনি এই কাজ করে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর এই দীর্ঘ কর্মজীবনে এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন তিনি হয়েছেন বেশ কয়েকবার। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্যাসেঞ্জারকে মিথ্যে বলতে দেখেছেন তিনি। কিন্তু, এই বাচ্চাটা যে সত্যি বলছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না তাঁর। সে তাই রতনের দিকে তাকিয়ে বলেন, "ঠিক আছে, ঠিক আছে। ভাড়া দিতে হবে না তোমায়। তুমি গিয়ে বসো। তবে, এই কাকুর একটা কথা মনে রেখো, রাস্তায় বেরোলে, সাথের টাকা-পয়সা সবসময় সাবধানে রাখবে। বুঝেছো?"
"বুঝেছি, কাকু। আর কোনোদিন এমন হবে না।"
"ঠিক আছে। যাও গিয়ে বসো সিটে তোমার।"
এতোক্ষনে নিশ্চিন্ত হয় রতন। সে পা বাড়ায় ওর সিটের দিকে। দু'পা এগিয়ে কি যেন মনে করে ফের ফিরে আসে সে কন্ডাকটরের কাছে।
"কি হোলো! আবার এলে?"
"থ্যাংক ইউ কাকু। এইটাই বলতে এলাম।"
"ঠিক আছে।" পুরু গোঁফের নিচে একটু হাসেন কন্ডাকটর স্বপন। তারপর, রতনের পিঠে সস্নেহে হাত বুলিয়ে বলেন, "যাও, গিয়ে বসো।"
রতন-ও কন্ডাকটর কাকুর দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। তারপর পায়ে-পায়ে সে এগিয়ে যেতে থাকে যে জানলার ধারের সিটটাতে ও বসেছিল সেটার দিকে।
Comments :0