গল্প | মায়ের আদর
সৌরীশ মিশ্র
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ১১ জুলাই ২০২৬
দুপুরবেলা।
বছর এগারোর টুবলু ওর ঠাকুরমার বিছানায় এক পাশে বসে এক মনে একটা গল্পের বই পড়ছে। গল্পের বই পড়া এক রকম নেশার মতোন টুবলুর। এইটুকু বয়সেই ও এই বাড়ির দুটো বুকশেল্ফে ঠাসা বইগুলোর মধ্যে ওর বয়সী পড়ার মতোন সবকটাই প্রায় পড়ে ফেলেছে। এই যে এখন বইটা পড়ছে টুবলু, সেটা ওকে উপহার দিয়েছিল ওর কুট্টি মাসি ওর গেল জন্মদিনে, গত মাসে।
টুবলু একেবারে ডুবে আছে বইটা পড়ায়। প্রায় শেষ হয়ে এসেছে ঐ রহস্য-রোমাঞ্চে ভরা বইটা। টানটান ক্লাইম্যাক্স চলছে এখন।
বিছানায় টুবলুর পাশে শুয়ে টুবলুর ঠাকুরমা। ভীষণই অসুস্থ তিনি। গত আট মাস ধরে পুরোপুরি শয্যাশায়ী।
এখন এই মুহূর্তে এই বাড়িতে ও আর ওর ঠাকুরমাই আছে। টুবলুর বাবা গেছেন অফিস। টুবলুর মা-ও একটু আগে বেড়িয়েছেন। গেছেন, যে ডাক্তারবাবু দেখেন টুবলুর ঠাকুরমাকে তাঁর সাথে দেখা করতে। ঠাকুরমাকে প্রেসক্রাইব করা একটা ওষুধ না কি পাওয়া যাচ্ছে না মার্কেটে হঠাৎই ক'দিন ধরে, সে কথাটা ডাক্তারবাবুকে জানাতে। যদি, ওর বদলে উনি অন্য কোনো ওষুধ দেন।
আজ টুবলুর স্কুল ছুটি। শনিবার না আজ!
আর মাত্র তিন পাতা মতোন বাকি রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসটা শেষ হতে। টুবলু বলতে গেলে ঢুকেই গিয়েছে ঐ উপন্যাসটার মধ্যেই! হঠাৎ, এতো জোর মেঘ ডেকে উঠল যে পুরো চমকে উঠল সে।
ক'দিন ধরে প্রতিদিনই প্রায় বৃষ্টি হচ্ছে এই সময়টায়।
মেঘ ডাকলো ফের আর একবার গুরু গুরু করে। ঠিক তখনই একটা কথা মাথায় এলো টুবলুর। আচ্ছা, ছাদে কাপড় মেলা নেই তো?
ব্যাপারটা দেখা দরকার। না হলে, বৃষ্টি এলে সব ভিজে যাবে।
"ঠাকুরমা, আমি একটু আসছি ছাদ থেকে। ছাদে কিছু মেলা আছে কি না দেখে আসি, কেমন?" ঠাকুরমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল টুবলু। টুবলুর ঠাকুরমা চোখ বন্ধ করে ছিলেন। একটু ঘাড় নাড়লেন।
টুবলু বইটা বিছানায় উপুড় করে রেখে উঠে পড়ল বিছানা থেকে।
প্রায় ছুটেই সিঁড়ি দিয়ে ছাদে এলো টুবলু। আর, ছাদের দরজা খুলতেই, ও দেখল, সে একদম ঠিকই ভেবেছিল। অনেকগুলো কাপড়ই মেলা রয়েছে ছাদে কাপড় মেলার দড়িগুলোতে। আর আকাশের অবস্থা? কালো-কালো মেঘে প্রায় ঢেকেই গিয়েছে গোটা আকাশটাই। বৃষ্টি যে নামবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তা আর বলে দিতে হবে না। মেঘ-ও ডাকছে এখন ঘনঘন।
জামাকাপড়গুলো তুলতে বেশি সময় লাগলো না টুবলুর। বেশিরভাগ মেলা কাপড়গুলোই শুকিয়ে গেছে প্রায়। একটু একটু করে ভেজা আছে মাত্র। টুবলুদের ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির একপাশ দিয়ে দড়ি টাঙ্গানো আছে, যাতে বৃষ্টির দিনগুলোয় ঘরেতেই অল্প ভেজা জামাকাপড় সব মেলা যায়। টুবলু সেই দড়িটায় তোলা জামাকাপড়গুলো মেলে দিল এক এক করে।
মেলা সব শেষ করে, টুবলু যখন নীচে একতলায় এলো, ঠিক তখনই বেজে উঠল ওদের বাড়ির ল্যান্ডলাইন ফোনটা।
দৌড়ে গিয়ে ফোনটা ধরে টুবলু।
টুবলুর মায়ের গলা ভেসে আসে ফোনের ওপার থেকে। "টুবলু, এখানে আমার একটু দেরি হবে রে। ডাক্তারবাবু আসেন নি এখনো। তাছাড়া, চেম্বারেও আজ অনেক পেশেন্ট। আমার আগে প্রায় সাত-আটজন। এ'দিকে মেঘ তো ডাকছে। তুই একটা কাজ করবি বাবা। ছাদে ক'টা জামাকাপড় আছে। সেগুলো তুলে দিবি একটু..."
"আমি ওগুলো তুলে দিয়েছি মা। একটু-একটু ভেজা ছিল। তাই, সিঁড়ির দড়িতে মেলে দিয়েছি।" ওর মা-কে কথা শেষ করতে না দিয়েই টানা বলে যায় টুবলু।
"আমার সোনা ছেলে! লক্ষ্মী ছেলে আমার!" বলে ওঠেন টুবলুর মা।
মা-র আদর মাখানো কথাকটা শুনে টুবলুর খুব খুব আনন্দ হয়।
আর তখনই, মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয় বাইরে।
----------------------------
Comments :0