প্রতীম দে : যাদবপুর
‘যাদবপুরে লড়াই আরএসএসের বিরুদ্ধে। আরএসএস পোষিত দুই দলের বিরুদ্ধে লড়াই।’ হালতুর সুচেতানগর এলাকায় উদ্বাস্তু মানুষদের তৈরি হওয়া ক্লাব মিলোনায়তনের সামনে বসে একথা বললেন যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য।
যাদবপুর উদ্বাস্তু মানুষের পূনর্বাসনের এলাকা। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে কলোনি। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ই এই এলাকার মানুষের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আজ সেই এলাকায় বিষ ছড়াচ্ছে আরএসএস বিজেপি, সঙ্গী তৃণমূল। একদিকে বিজেপি তাদের এসআইআরের নাম করে বিপদে ফেলছে। অন্য দিকে চলছে তৃণমূলের দাদাগিরি।
যাদবপুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার। যিনি আগে আরএসএস করতেন, তার পরিবারের লোক এখনও সক্রিয় আরএসএস কর্মী। এমন লোককেই প্রার্থী করেছে তৃণমূল।
উদ্বাস্তু এলাকার মানুষ জানেন তাদের আসন বন্ধু কারা। তারা জানে যাদবপুর গঠনের ক্ষেত্রে বামপন্থীদের ভূমিকাও। আর তাই আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নামা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের হাতে মাস্টারদা সূর্য সেনের ছবি তুলে দেন ৩ নং সুচেতানগরের অধিবাসীরা। সিপিআই(এম) প্রার্থীর কথায়, ‘এই অঞ্চলের মানুষ বুঝিয়ে দিলেন তাদের রাজনৈতিক চেতনা। আমি মাস্টারদার সঙ্গী গণেশ ঘোষের সান্নিধ্য পেয়েছি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম মুখ সূর্য সেন। আজ আমাদের লড়াই দুই ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে। আমাদের লড়াইয়ে জয়ী হতেই হবে।’
যাদবপুরে বিজেপির প্রার্থী শর্বরী মুখার্জি। সংগঠন না থাকলেও তৃণমূলের সৌজন্যে প্রভাব রয়েছে বিজেপির। তবে তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়ের নিশানায় একজন। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। আর তাই দেবব্রত মজুমদারের মিছিলের সামনে জয় শ্রীরাম স্লোগান না দিয়ে সিপিআই(এম) প্রার্থীকে দেখে উড়ে আসে এই স্লোগান।
যাদবপুরের মানুষ কি চাইছে এবার?
কলকাতা পৌরসভার ৯৯, ৯৬, ১০১, ১০২, ১০৩, ১০৪, ১০৫, ১০৬, ১০৯, ১১০ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই বিধানসভা কেন্দ্র। এর মধ্যে একাধিক ওয়ার্ড বৃদ্ধাশ্রমে পরিনত হয়েছে গত পনেরো বছরে। রাজ্যে কাজ নেই। লেখা পড়া করে ছেলে মেয়েরা চলে যাচ্ছে রাজ্যের বাইরে। বাড়িতে পরে থাকছে একা বাবা মা। এমনই একজন মালা মিত্র। মুকুন্দপুরে থাকেন। ছেলে কাজ করছে বেঙ্গালুরুতে। মেয়ে কানাডা। বেশ আক্ষেপ করেই বললেন, ‘‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ছেলে পাশ করলো। ভেবে ছিলাম এখানেই ভালো কাজ পাবে তখন একের পর এক কোম্পানি রাজ্যে আসছে। তারপর তো বদলে গেলো। প্রথমে কয়েক বছর এখানে কাজ করে তারপর বাইরে চলে গেলো।’’ মালা মিত্র চায় তার ছেলের মতো আর যাতে কাউকে কাজের জন্য বাবা মাকে ছেড়ে বাইরে যেতে না হয়। কাজ হোক, চাকরি হোক ঘরের ছেলে ঘরে আসুক। চাইছে তৃণমূলের সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্তি।
তৃণমূল প্রচার করছে। ১০টি ওয়ার্ডই তাদের দখলে। বলা ভালো গায়ের জোড়ে দখল করেছে। দেবব্রত মজুমদার ২০২১ সাল থেকে এলাকার বিধায়ক। পিঠে পুলি উৎসব বা অন্য কোন উৎসব ছাড়া এলাকায় তাকে সেই ভাবে দেখা যায় না। যদিও তৃণমূলের দাবি, ‘মলয় দা সব ওয়ার্ডেই সপ্তাহে একদিন করে বসেন।’
দেবব্রত মজুমদার প্রায় প্রতিদিনই প্রচার করছেন ছোট পথসভাও করছেন। সেখান থেকে আক্রমণ করছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং বামপন্থীদের। তিনি বলছেন, ‘আমি কথা দিয়েছিলাম যাদবপুরের প্রতিটা মানুষকে পরিশ্রুত পানীয় জল পৌঁছে দেবো। সেই কথা রেখেছি। যাদবপুর বিধানসভা এলাকা জুড়ে জল সঙ্কট নেই।’
বিদায়ী বিধায়ক কি ঠিক বলছেন?
না।
রবিবার ১০৬ নম্বর ওয়ার্ডে প্রচার করছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। মিছিল যখন গ্রীণপার্ক এলাকায় প্রবেশ করলো সাধারণ মানুষ তাদের ডেকে নিয়ে গেলো তাদের সোসাইটি অফিসে। উচ্চবিত্ত লোকেদের বসবাস ওই এলাকায়। সিপিআই(এম) প্রার্থীর কাছে তাদের অভিযোগ জল সঙ্কট নিয়ে।
অফিসে বাকিদের সাথে বসে থাকা সন্তোষ মজুমদার বললেন, ‘এখানে খুব জলের সমস্যা। মাসে প্রায় ১০০০-১২০০ টাকার জল কিনতে হয়। রান্নার জল, খাবার জল এমনকি স্নান করার জন্যও জল কিনতে হয়।’
বিকাশ ভট্টাচার্য তাদের বলেন, ‘কেন তৃণমূল তো বলছে জলের সমস্যা নেই।’
পাল্টা সেখানে উপস্থিত বাকিরা বলেন, ‘মিথ্যা কথা। ঘটা করে জলাধারের উদ্বোধন হয়েছে কিন্তু জলের সমস্যা মেটেনি।’
মেয়র থাকাকালিন ‘জ্যোতি বসু জল প্রকল্প’ চালু করেছিলেন বিকাশ ভট্টাচার্য। আজ সেই প্রকল্পের নাম বদলেছে মমতা। বৃষ্টি জল ধরার বদলে গঙ্গা থেকে জল বুস্ট করছে পৌরসভা। যার ফলে কমেনি জলের সমস্যা।
এলাকা জুড়ে তৃণমূল প্রচার করছে বিকাশরঞ্জন চাকরি খেকো, মামলাবাজ। পাল্টা সিপিআই(এম) প্রার্থীর কথায়, ‘ওরা যত এই পোস্টার লাগাবে ততো আমাদের প্রচার হবে। মানুষ জানতে চাইবে আসল সত্যি কি। ২২ লক্ষ ছেলে মেয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। সবার ভবিষ্যৎ ওরা শেষ করেছে। মামলা চাকরি প্রার্থীরা করেছিল। আমরা তাদের হয়ে আইনি লড়াই করেছি। ওরা দুর্নীতি করেছে বলেই লোকের চাকরি গিয়েছে। দায় ওদের।’
উল্লেখ্য ১৯৭২ সালের নির্বাচনে প্রবল সন্ত্রাসের পরও যাদবপুর বিধানসভায় জয়ী হয়েছিলেন দীনেশ মজুমদার। সেই ইতিহাসকে মাথায় রেখেই আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এবং বিজেপি উভয় শক্তির মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যাদবপুরের সিপিআই(এম) কর্মীরা।
Comments :0