২০০৩-এ আরএসএস সম্পর্কে নিজের অন্তরের গভীরতম অনুরাগ প্রকাশ করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। দিনটি ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর। স্থান ছিল সেই নয়াদিল্লিই। আরএসএস’র জাতীয় পর্যায়ের একটি অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে কী বলেছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী? বলেছিলেন,‘‘আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আমি জানি আপনারা দেশকে ভালোবাসেন...’’। তাঁর আবেদন ছিল,‘‘যদি আপনারা(আর এস এস) ১ শতাংশ সাহায্য করেন, আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।’’ সেদিন আরএসএস’র ওই সভায় হাজির ছিলেন এইচভি শেষাদ্রি, মোহন ভাগবতের মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা। তৃণমূল নেত্রীর সেদিনের বক্তব্যে আরএসএস সেদিন খুবই উৎসাহিত হয়েছিল। তাই বিজেপি’র রাজ্যসভার সাংসদ বলবীর পুনী ওই সভাতেই বলেছিলেন,‘‘আমাদের প্রিয় মমতাদিদি সাক্ষাৎ দুর্গা।’’
‘পরিবর্তন’-এ হিন্দুত্ববাদীরা
২০১১-য় রাজ্যে মমতা ব্যানার্জির সরকার তৈরি হয়। বামফ্রন্ট পরাজিত হয়। কিন্তু তার আগে থেকেই আরএসএস তাদের যতটুকু ক্ষমতা ছিল তা দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পাশে থেকেছে। যেমন, ১৯৯৮-৯৯-এর ‘পাঁশকুড়া লাইন’-র নৈরাজ্যের দিনে তৃণমূলের হয়ে গ্রাম দখল করতে গিয়ে সঙ্ঘের কর্মীও গণপ্রতিরোধে নিহত হয়েছেন। তাদের তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের কর্মী বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তথাকথিত ‘পরিবর্তন’র পরে সঙ্ঘ উৎফুল্ল হয়েছিল। ২০১১-র ২৩ মে প্রকাশিত স্বস্তিকার সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল — ‘দুঃশাসনের অবসান’। সেখানে সঙ্ঘ লিখেছিল,‘‘অবশেষে দুঃশাসনের অবসান। গত ৩৪ বৎসর ধরিয়া বাংলার বুকের উপর ফ্যাসিবাদী দলতন্ত্রের যে জগদ্দল পাথর চাপিয়া বসিয়াছিল, রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সেই পাথরকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিতে সক্ষম হইয়াছে। আলিমুদ্দিনওয়ালাদের যে ধরাশায়ী করা সম্ভব ইহা লইয়া অনেকেরই সন্দেহ ছিল।...যদিও কমিউনিস্টরা বিজেপি-কেই শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পয়লা নম্বর শত্রু বলিয়াই মনে করে। ইহা স্বীকার করিতেই হইবে, পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকার ও ক্যাডারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁহারই নেতৃত্বে তৃণমূল জোটের এই বিরাট জয়।’’
বিভিন্ন ইস্যু: আরএসএস এবং তৃণমূল
প্রসঙ্গ: এনআরসি, সিএএ
নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আইনে পরিণত হওয়ার দিন তৃণমূল কংগ্রেসের ৬জন হাজিরই ছিলেন না সংসদে। জাতীয় নাগরিকপঞ্জির প্রাথমিক কাজ অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়েই শুরু হয়েছিল। আর সেই মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী ছিলেন মমতা ব্যানার্জি।
২০০০-র আগস্টে বামফ্রন্টের সাংসদ অবনী রায় রাজ্যসভায় নাগরিকত্ব নিয়ে একটি প্রশ্ন করেন। জবাবে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তৎকালীন রাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্যাসাগর রাও জানান যে,‘‘সব নাগরিকের বাধ্যতামূলক পঞ্জিকরণ এবং নাগরিকত্ব প্রমাণের একটি আইডেন্টিটি কার্ডের প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকার বিবেচনা করছে।’’
তারপর ২০০৩। নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন করে এনডিএ সরকার। যুক্ত করা হয় ‘১৪এ’ ধারা। ওই ধারা অনুসারে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন মনে করলে প্রত্যেক ভারতবাসীর নাম নথিভুক্ত ও একইসঙ্গে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘ন্যাশনাল আইডেনটিটি কার্ড’ ইস্যু বাধ্যতামূলক করতে পারে। ২০০৩-র সেই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে আরও বলে দেওয়া হয়েছে যে, ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অথরিটি তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন মনে করলে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্য জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরি করতে পারে।
জাতীয় নাগরিকপঞ্জি(এনআরসি)-র ভিত্তি হলো সেই সংশোধনী। সেই ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে। সেই মন্ত্রীসভায় ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ২০০১-এ এনডিএ থেকে বেরিয়ে ফের ২০০৩-এ যোগ দেন বিজেপি’র সঙ্গে। প্রথমে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী, তারপর কয়লা মন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। তাঁর সমর্থনের ভিত্তিতে ওই সংক্রান্ত বিল পাশ হয়। তা আইনেও পরিণত হয়।
সেই আইন অনুসারে রুলস(বিধি)-ও তৈরি হয় সেই সময়কালে। তার নাম ‘দি সিটিজেনশিপ (রেজিস্ট্রেশান অব সিটিজেন অ্যান্ড ইস্যু অব ন্যাশানাল আইডেন্টিটি কার্ড) রুলস-২০০৩।’ সেই রুলস কিংবা বিধির ৩নং ধারার শিরোনাম হলো।‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব ইন্ডিয়ান সিটিজেনস।’ সেই ৩নং ধারার ৪টি উপধারা। ৪নং উপধারায় বলা হয়,‘কেন্দ্রীয় সরকার, এই সংক্রান্ত কোনও নির্দেশ জারি করে, একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে, যারা লোকাল রেজিস্ট্রারের এলাকার মধ্যে থাকেন, সেই সব ব্যক্তিদের পপুলেশন রেজিস্ট্রার তৈরি করতে পারে।’
অর্থাৎ ধর্মের নামে বিভাজন, কারো কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ অটলবিহারী বাজপেয়ীর সময় শুরু। মমতা ব্যানার্জির সেই সিদ্ধান্তগুলির দোসর ছিলেন। নরেন্দ্র মোদী সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এগিয়েছেন। এখন ভুল বোঝাতে মমতা ব্যানার্জি বিরোধিতার নাটক করেছেন।
প্রসঙ্গ রামমন্দির
২০০৪-র ৮ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে এনডিএ’র নির্বাচনী ইশ্তেহার প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ‘ভিশন ডকুমেন্ট’-এ ‘বেসিক মিশন অ্যান্ড কমিটমেন্ট’-এর মধ্যে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণকে এনডিএ’র অন্যতম লক্ষ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। আর সেই ইশ্তেহারে সই ছিল মমতা ব্যানার্জির। সেই ইশ্তেহার প্রকাশ করেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। সেদিন মঞ্চে জর্জ ফার্নান্ডেজের পাশে হাজির ছিলেন মমতা ব্যানার্জি।
২০০৪-এ এনডিএ-র ইশ্তেহারে রামমন্দির নির্মাণের লক্ষ্য উল্লিখিত থাকলেও তাতে সই করতে কালক্ষেপ করেননি মমতা ব্যানার্জি। কেন করলেন? সেই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন,‘‘আরে, রামমন্দির তো সাব জুডিস ম্যাটার।’’ তাতে কি রামমন্দির নির্মাণ স্লোগানের চরিত্র বদলে যায়?
এবারও রামমন্দির নির্মাণ, উদ্বোধনের সময় মমতা ব্যানার্জি নীরব থেকেছেন। বলেছেন শুধু একটিই প্রসঙ্গে। বারবার বলেছেন যে, তিনিও সরকারি টাকায় মন্দির বানাচ্ছেন।
প্রসঙ্গ অনুপ্রবেশ
খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডের পরে রাজ্যে আরএসএস এবং বিজেপি-র মূল ইস্যু হয়ে উঠেছে ‘অনুপ্রবেশ’। মমতা ব্যানার্জি তার সমর্থক ছিলেন।
দিনটি ছিল ২০০৫-র ৪ আগস্ট। তৃণমূল কংগ্রেস তখন বিজেপি’র শরিক। তখন লোকসভায় সিপিআই(এম)’র দলনেতা ছিলেন বাসুদেব আচারিয়া। সংসদের অধ্যক্ষ তখন ছিলেন সোমনাথ চ্যাটার্জি। কিন্তু ঘটনার সময়ে সংসদের কাজ সামলাচ্ছিলেন উপাধ্যক্ষ চরণজিৎ অটওয়াল। সংসদে তার কয়েকদিন আগেই বিজেপি’র তৎকালীন দলনেতা লালকৃষ্ণ আদবানি ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব এনেছিলেন। আদবানির বক্তব্যে আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম অনুপ্রবেশের কথা বারবার চলে এসেছিল সেই সময়ে। আদবানির মুলতবি প্রস্তাবের বিরোধিতা করে পার্টির পক্ষ থেকে বাসুদেব আচারিয়া আলোচনা করেছিলেন। যদিও মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার দিন মমতা ব্যানার্জি ছিলেন না। আচমকাই ৪ আগস্ট হাজির হন এবং ‘পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ’ নিয়ে বলতে চান। তাঁর দাবি ছিল, সিপিআই(এম) অনুপ্রবেশে মদত দেয়। এবং অনুপ্রবেশকারীদের নাম ভোটার তালিকায় তুলে দেয়। প্রসঙ্গত, শুধু সংসদেই নয়। পশ্চিমবঙ্গে ‘অনুপ্রবেশ’ হয়, এই দাবি মমতা ব্যানার্জি রাষ্ট্রপতি, নির্বাচন কমিশনকেও জানিয়েছিলেন। সেদিন তাঁকে সংসদে বলতে না দেওয়ায় তিনি উপাধ্যক্ষর দিকে কাগজের বান্ডিল ছুঁড়ে মেরেছিলেন। তাঁর আচরণের বিরোধিতা করেছিল অনেক দল। বিজেপি চুপ ছিল।
Comments :0