অন্যকথা | "বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন, এক হোক, এক হোক" — সম্প্রীতির চিরন্তন আহ্বান
অরিজিৎ মিত্র
নতুনপাতা | বর্ষ ৪ | ১৩ জুলাই ২০২৬
"বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন, এক হোক, এক হোক"—এই পংক্তি কেবল একটি গানের অংশ নয়; এটি বাঙালি সমাজের আত্মার আহ্বান। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রক্তের সম্পর্কের কথা বলেননি, বলেছেন হৃদয়ের সম্পর্কের কথা। তিনি চেয়েছেন এমন এক সমাজ, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক মতভেদ মানুষের মধ্যে প্রাচীর সৃষ্টি করবে না; বরং সবাই একে অপরকে আপনজন বলে গ্রহণ করবে।
সম্প্রীতি হলো সমাজজীবনের প্রাণশক্তি। যে সমাজে মানুষ একে অপরকে সম্মান করে, পরস্পরের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ায় এবং বৈচিত্র্যকে আপন করে নিতে শেখে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য। অথচ আজকের পৃথিবীতে বিভেদ, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা এবং সংকীর্ণতার বিষবাষ্প প্রায়ই মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে। এই অন্ধকার সময়ে রবীন্দ্রনাথের আহ্বান আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—ঐক্যই শক্তি, সম্প্রীতিই উন্নতির ভিত্তি।
বাংলার ইতিহাস সম্প্রীতির গৌরবময় ইতিহাস। এই মাটিতে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ যুগের পর যুগ পাশাপাশি বসবাস করেছে। দুর্গাপূজার আনন্দ যেমন সকলের, তেমনি ঈদের শুভেচ্ছাও সকলের; বড়দিন কিংবা গুরু নানকের জন্মোৎসবও একই আন্তরিকতায় উদ্যাপিত হয়। এই মিলনই বাংলার প্রকৃত পরিচয়। বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্যের এই শিক্ষা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্পদ।
একটি পরিবার যেমন পারস্পরিক ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছাড়া টিকে থাকতে পারে না, তেমনি একটি জাতিও সম্প্রীতি ছাড়া শক্তিশালী হতে পারে না। সমাজে বিভাজনের আগুন জ্বালানো সহজ, কিন্তু ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তুলতে লাগে ধৈর্য, সহমর্মিতা ও মানবিকতা। তাই প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য হলো গুজব, বিদ্বেষ ও হিংসা থেকে দূরে থেকে সত্য, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পথ অনুসরণ করা।
বর্তমান প্রজন্মের হাতে ভবিষ্যৎ বাংলার দায়িত্ব। যদি তারা শিখতে পারে যে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবতা, তবে আগামী দিনের সমাজ হবে আরও শান্ত, আরও সুন্দর এবং আরও সমৃদ্ধ। বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই সম্প্রীতির মূল্যবোধকে লালন করতে হবে। কারণ একতার ভিত যত মজবুত হবে, জাতির অগ্রগতিও তত সুদৃঢ় হবে।
রবীন্দ্রনাথের এই আহ্বান আজও সমান প্রাসঙ্গিক। "বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন, এক হোক, এক হোক"—এই বাণী আমাদের শেখায়, আমরা ভিন্ন হতে পারি, কিন্তু বিচ্ছিন্ন নই; আমাদের মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু মন যেন আলাদা না হয়। সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই হোক আমাদের জীবনের মূলমন্ত্র। তখনই গড়ে উঠবে এমন এক বাংলা, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদ, মর্যাদাবান এবং আপনজনের মতো পরস্পরের পাশে থাকবে। এই আদর্শই হোক আমাদের ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।
দশম শ্রেণী, কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ,
কল্যাণনগর, খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগণা
Comments :0