'Chandi Pahar Banchao' Movement

বাঁচাতে হবে চণ্ডী পাহাড়, এক বুক জেদে দিনভর বিক্ষোভে সঙ্গীতারা

জেলা

রবিবার রঘুনাথপুর-১ ব্লকে পাহাড় বাঁচানোর আন্দোলনে শামিল ছোট-বড় বাসিন্দারা।

ভাস্কর দাশগুপ্ত: পুরুলিয়া

তৃণমূল সরকার জল জমি জঙ্গল পাহাড় মাটি বালি কয়লা নিয়ে মাফিয়ার রাজ কায়েম করেছিল। এই সরকার সময়েও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তাই মানুষ বলছেন - "ঠক ঠক শুধু শব্দ নয় এটা আমাদের ওপর আক্রমণ। প্রকৃতির এই বিনাশ আমরা মানবো না।" 
রঘুনাথপুর ১ নম্বর ব্লকের বেড়ো গ্রামের বাসিন্দারা দল মত নির্বিশেষে সেই পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। বুকে তাঁদের অদম্য বল। রবিবার, ৪ অক্টোবর, সকাল থেকে চণ্ডী পাহাড়ের সামনে অবস্থান-বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন গ্রামের ছোট থেকে বড়, পুরুষ থেকে মহিলা সকলেই। চড়া রোদের মধ্যেই তারা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসেছিলেন। দাবি একটাই- প্রকৃতি বাঁচাও , পরিবেশ বাঁচাও, পাহাড় বাঁচাও। পাহাড় রক্ষার শপথ নিয়ে রবিবার সন্ধ্যায় এলাকা জুড়ে গ্রামের মানুষ মোমবাতি মিছিল করেন।
তৃণমূল সরকারের আমলে এই জেলার মানুষ দেখেছে কিভাবে জয়পুরের আঘরপুর ডুংরি কেটে ফেলা হয়েছিল। সাধারণ মানুষ যখন সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনাশের বিপক্ষে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন তখন শিশুসহ ১৩ জন মহিলাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে জেলেও পাঠানো হয়েছিল। শিল্প তালুক গড়ার নাম করে আঘরপুর ডুংরিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। 
যে আঘরপুর ডুংরিতে একসময় বহু পরিচালক সিনেমার শুটিং অব্দি করেছিলেন, আজ অব্দি সেই আঘরপুরে কোন শিল্প তালুক গড়ে ওঠেনি। কিন্তু পাহাড় ধ্বংস হয়ে গেছিল। 
২০১৬ সালে রঘুনাথপুর-১ ব্লকে চন্ডী পাহাড় কাটা শুরু হয়েছিল। কোভিডের সময়ে সেই পাহাড় কাটা বন্ধ হয়েছিল। মানুষ আন্দোলনে নেমে ছিলেন। ২০২৪ সালের পর থেকে একটু একটু করে সেই পাহাড় কাটা শুরু হয়েছে। এই সরকারের আমলে আবার ক্রাশার নামিয়ে সকাল থেকে চলছে পাহাড় কাটার কাজ। অথচ মুখ্যমন্ত্রী জেলা সফরে এসে ঘোষণা করে গিয়েছেন পাহাড় কাটা হবে না। জেলার সাংসদ ঘোষণা করছেন পাহাড় কাটা হবে না। এই সরকারের মুখ এবং মুখোশ এক হয়ে গেছে। 
প্রতিবাদে সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশপ্রেমী সংগঠনগুলি। পাহাড় কাটা বন্ধের দাবিতে গড়ে উঠেছে ‘চন্ডী পাহাড় বাঁচাও কমিটি’। রবিবার সকালে সংগঠনের উদ্যোগে পাহাড়ের পাদদেশে শুরু হয় অবস্থান-বিক্ষোভ। হাতে জাতীয় পতাকা, ব্যানার ও পোস্টার নিয়ে কর্মসূচিতে সামিল হন স্থানীয় বাসিন্দা, মানবাধিকার সংগঠন এবং প্রকৃতি রক্ষার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সংগঠনের সদস্যরা।
স্কুলের পোশাক পড়ে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী সঙ্গীতা বাউরী আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য চন্ডী পাহাড় মেলার পাহাড়। চণ্ডী পাহাড় দেবতার পাহাড়। ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ে পূজা করতে আসি। পাহাড় অর্ধেক কেটে ফেলা হয়েছে। ওরা পাহাড়টাকে শেষ করে দেবে। বন্ধ হোক চণ্ডী পাহাড় কাটা।  
২০১৬ সালে ওয়েস্ট মিনারেল ডেভেলপমেন্ট বেঙ্গল ট্রেডিং কর্পোরেশন লিমিটেডের অনুমোদনের ভিত্তিতে ‘ডাইভারসিফাইড ব্যাপার প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা এখানে গ্রানাইট উত্তোলনের কাজ শুরু করে বলে দাবি। 
স্থানীয় মানুষজনের বক্তব্য পাহাড় কেউ তৈরি করে দেয়নি। জল জমিন পাহাড় ধ্বংস করা যাবে না । পুঁজিপতিদের শিকার হয়েছে এই চণ্ডী পাহাড়। মুখে বলা আর কাজের তফাৎ এই সরকার প্রমাণ করে দিচ্ছে। এটা দ্বিচারিতা। মানুষ বাধা দিলে তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। টাকার প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে। জঙ্গল পাহাড় সুরক্ষিত নয় এই সরকারের আমলেও। 
স্থানীয় বাসিন্দা লালন বাউরির বক্তব্য, বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে তো কোনও পাহাড় কাটা হয়নি। ২০১৬ সাল থেকে এই চণ্ডী পাহাড় কাটার কাজ শুরু হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর প্রকৃতি ধ্বংসের কাজ চলছে সমানতালে। ঐতিহ্যবাহী চণ্ডী পাহাড় কোনমতেই ধ্বংস হতে দেব না। বিবেক তন্তুবায় নামে আরেক আন্দোলনকারীর বক্তব্য, এই আন্দোলন আজকের নয়। দফা এক দাবি এক- বন্ধ হোক চণ্ডী পাহাড় কাটা। 
অবিলম্বে এই কাজ বন্ধ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ‘চন্ডী পাহাড় বাঁচাও কমিটি’র সদস্যদেরা।
যদিও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ মানতে নারাজ সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থার কর্তৃপক্ষ। সংস্থার ম্যানেজারের দাবি, ২০১৬ সাল থেকেই অনুমোদন নিয়ে নিয়ম মেনেই গ্রানাইট উত্তোলনের কাজ চলছে। তাঁর বক্তব্য, পাহাড় কেটে কাজ করা হচ্ছে না; বরং পাহাড়ের নিচের অংশ থেকে অনুমোদিত নিয়ম মেনেই গ্রানাইট উত্তোলন করা হচ্ছে। 
তবে সংস্থার এই দাবি মানতে নারাজ আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, পাহাড়ের নিচের অংশ থেকেই উত্তোলন করা হলেও এর প্রভাব পড়ছে গোটা পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর। তাই কোনও অবস্থাতেই পাহাড় ও প্রকৃতি ধ্বংসের কাজ মেনে নেওয়া হবে না।

Comments :0

Login to leave a comment