মোদী জমানায় বিগত চার-পাঁচ বছরে রাজ্য বা কেন্দ্রে যেখানে যেখানে বিজেপি জিতেছে সেগুলি যে জনমতের যথাযথ প্রতিফলন নয় তা এখন আর মানুষকে কাঠখড় পুড়িয়ে বোঝাতে হচ্ছে না। মানুষ নিজে থেকেই সবটা অনুধাবন করতে পারছেন। বিশেষ করে জ্ঞানেশ কুমারের একাধিপত্যে এসআইআর-কে কেন্দ্র করে যেসব তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছে এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সৌজন্যে প্রকাশ্যে এসেছে তারপর সাধারণ মানুষের পক্ষে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর সত্যিই আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। তারা বুঝে গেছেন ভোটের নামে প্রহসন করে নাগরিকদের ভোটাধিকার নিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। বিজেপি-কে জেতানোর জন্য নির্লজ্জভাবে সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। এমন প্রতারণামূলক ভোটে বিজেপি’র জয়কে মানুষ জয় বলে মান্যতা দিতে রাজি নন। মানুষ তাই ক্ষুব্ধ, ক্রদ্ধ, প্রতিবাদ মুখর। তারা এই চৌর্যবৃত্তি ও প্রতারক শাসনের অবসান চান। নির্বাচন কমিশনকে ফেরাতে চায় স্বমর্যাদায়, স্বমহিমায়। যাতে প্রতিটি নির্বাচনে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটে।
স্বাধীনতা আন্দোলনে নিরাপদ দূরত্বে থেকে যারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দালালি করেছে সেই আরএসএস স্বাধীনোত্তর ভারতে গদ্দার হিসাবে পরিচিত ছিল। বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের ভারতে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঘৃণার চোখেই দেখত মানুষ। গত কয়েক দশকে সেই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনকারী অগণতান্ত্রিক শক্তির পুনরুত্থান ঘটেছে। তারা শুধু কেন্দ্রে সরকার দখল করেনি, দেশের বেশিরভাগ রাজ্যেই তারা ক্ষমতায়। এই অবস্থায় ভারতকে হিন্দূ রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে তারা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামোটাই দ্রুত বদলে ফেলতে মরিয়া হয়ে ওঠে। হিন্দুত্ববাদী যুক্তিবর্জিত অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করছে। হিন্দু ধর্মের চৌহদ্দির মধ্যে সরকার আবদ্ধ করে ফেলছে। ধর্মীয় ও জাতপাতের ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছড়িয়ে সমাজে নৈরাজ্য তৈরি করছে।
আরএসএস-বিজেপি বুঝেছে এপথে চলতে থাকলে বেশিদিন ক্ষমতা ধরে রাখা যাবে না। তাই ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে তারা যেসব পরিকল্পনা ও ছক কষেছে তার অন্যতম নির্বাচন কমিশনকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। সেই লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ আইন বদলে কমিশনার নিয়োগ নিজেদের পছন্দ মতো করার ব্যবস্থা করা। তার পর আসন পুনর্বিন্যাস এমনভাবে করা যাতে বিরোধীদের শক্ত ঘাঁটিগুলিকে এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাকে ভেঙে টুকরো করে ফেলা যায়। লক্ষ্য বিরোধীদের নিশ্চিত জয়ের কেন্দ্র কমিয়ে ফেলা এবং বিজেপি জয়ের কেন্দ্র বাড়ানো। অতঃপর লক্ষ্য ভোটার তালিকা। কমিশনে নিজেদের লোক বসিয়ে জটিল, অস্বচ্ছ, প্রক্রিয়ায় এসআইআর করে ঢালাওভাবে নাম বাদ দেওয়ার অভিযান চলে। দেখা গেছে যেখানে যেখানে বিরোধী ভোটার বেশি এবং মুসলিম ভোট বেশি সেখানেই ছাঁটাই হয়েছে বেশি। এভাবে ১৩ কোটি ভোটারকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে বিজেপি-র জয় নিশ্চিত করানোর জন্য।
গোটা ষড়যন্ত্রটাই মানুষ ধরে ফেলেছেন। আর লুকোবার কোনও উপায় নেই। দেশজুড়ে মানুষ ক্ষেপে উঠেছে। বিক্ষোভের ঝড়ে দেশ উত্তাল। মোদীদের ক্ষমতা নেই এই ক্রোধানল থেকে নিজেদের রক্ষা করা। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে জারিত মানুষ যেভাবে ফুঁসে উঠছেন তাতে পরিষ্কার মোদী জমানার শেষের শুরু হয়ে গেছে।
Editorial
শেষের শুরু!
×
Comments :0