Bulldozer

গরিবের পেটে লাথি

সম্পাদকীয় বিভাগ

রা‍জ্যে বিজেপি ক্ষমতাসীন হয়েছে এখনো ১০দিন কাটেনি। ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এবং রেল স্টেশনগুলিতে প্রবল আতঙ্ক ও হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছে হকারদের মধ্যে। ডাবল ইঞ্জিনের ডাবল অ্যাকশনে কার্যত দিন এনে দিন খাওয়া গরিব হকারদের পথে বসার জোগাড়। অথচ তৃণমূলী শাসনে তোলাবাজি আর দাদাগিরির দাপট থেকে রেহাই পেতে এই হকারদের বেশিরভাগই ভোট দিয়েছেন বৃহৎ পুঁজির সেবাদাস উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি বি‍‌জেপি-কে। মোদী গ্যারান্টিতে মুগ্ধ হয়ে আস্থা রেখেছিলেন পদ্মফুলে। স্বপ্ন দেখেছিলেন ডাবল ইঞ্জিনের সরকার হলে তাদের জীবন সুখের হবে, শান্তির হবে। কিন্তু দশদিন কাটতে না কাটতেই তাদের অনেকে কপাল চাপড়াতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ ভাবছেন আগে রাম পরে বামের ছলনায় ভুলে শেষ পর্যন্ত নিজের পায়েই কুড়োল মারলেন।
ক্ষমতা দখলের অব্যবহিত পরেই জয়ের আনন্দের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে কলকাতায় নিউ মার্কেটে বুলডোজার চালিয়ে হকারদের দোকানপাট ভেঙে গুঁ‍‌ড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। উত্তর প্রদেশের যোগীরাজের বুলডোজার সংস্কৃতির এরাজ্যের প্রথম আমদানি এটাই। যেকোনও ধরনের পদক্ষেপকে চরম ভয় ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করার ধারা ফ্যাসিবাদী মনস্তত্ত্বের অঙ্গ। ফ্যাসিস্ত শক্তি তাদের কাজের ধারাকে এমনভাবে চালিত করতে চায় যাতে সাধারণ মানুষ ভয়ে আতঙ্কে শিউরে ওঠে। বিরোধিতা দূরের কথা সামান্য প্রতিবাদের কথাও ভাবতে না পারে। বুলডোজার সেই মানসিকতা প্রকাশের জন্যই হিন্দুত্ববাদী শাসকরা ব্যবহার করে। মুখে আইনের শাসনের কথা বলে চূড়ান্ত বেআইনি পথে অবৈধ নির্মাণ বা বেআইনি দোকানপাঠ ভেঙে দেয়। এক্ষেত্রে ন্যূনতম মানবিক অনুভূতিও তাদের মধ্যে কাজ করে না। মুসলিম বিদ্বেষের অতি উত্তেজনায় নিউ মার্কেটের সেই এলাকাকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল যেখানে মুসলিম হকাররা বেশি। কিন্তু বিভিন্ন রেল স্টেশনে প্রতিদিন যে হকার উচ্ছেদ অভিযান চলছে সেখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল হকাররাই রয়েছেন। তেমনি কলকাতার বাইরে জেলা ও মফস্বল শহরগুলিতে কোথাও হিন্দু হকাররা রেহাই পাচ্ছেন না। বস্তুত সংখ্যায় হিন্দুরাই বেশি।
হকারি একটি ঐতিহাসিক আর্থ-সামাজিক সমস্যা। এখানে ধর্মের কোনও ভূমিকা নেই। কর্মহীন মানুষ বেঁচে থাকার জন্য বিকল্প কোনও রোজগারের ব্যবস্থা করতে না পেরে হকারির পেশায় আসতে বাধ্য হয়। তারজন্য আইনের চোখে অবৈধ হলেও রাস্তার পাশে ফুটপাতে, স্টেশন চত্বরে পশরা নিয়ে বসেন। যেখানে জনসমাগম বেশি সেখানে হকার বেশি। এর দায় সেই গরিব মানুষদের একার নয় যারা হকার হতে বাধ্য হয়। দায় সমাজের, দায় সরকারের। মানুষকে রুটি-রুজির সুযোগ করে দেবার দায়িত্ব সরকারের। সেই কাজে সরকার যখন ব্যর্থ তখন হকার উচ্ছেদ করার অধিকারও সরকারের থাকে না। সামগ্রিক জনস্বার্থে যদি কোনও জায়গা থেকে হকার সরাতে হয় তবে তাদের সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করে বিকল্প রুজির বন্দোবস্ত করেই সরাতে হয়। তা না করে আচমকা বুলডোজার চালিয়ে গরিব মানুষের সামান্য দোকান ভেঙে দেওয়া স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ত সরকারের কাজ হতে পারে, কোনও গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণকারী সরকারের কাজ হতে পারে না। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই বিভিন্ন জায়গায় এমনভাবে হকাররা রাস্তা, ফুটপাত দখল করে আছেন তাতে সত্যিই যাতায়াত ও যান চলাচলের সমস্যা হয়। সরকারকেই পরিকল্পনা করে সে সব জায়গা খালি করে হকারদের অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে নির্বাচিত সরকার রাজা বা জমিদার নয়। সব নাগরিকের ন্যূনতম রুজির বন্দোবস্ত করা সরকারের কাজ। তাদের পেটে লাথি মারা নয়।

Comments :0

Login to leave a comment