শ্রম আইন বাতিলের দাবিতে দেশ জুড়ে হয়েছে ধর্মঘট। সরকার তবু আলোচনায় নারাজ। ১ ডিসেম্বর দিল্লিতেই ‘সংসদ অভিযান’ করবেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। সিআইটিইউ’র ডাকে এই কর্মসূচি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অন্তত ১ লক্ষ শ্রমজীবী আসবেন রাজধানীতে।
বুধবার দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে এই লক্ষ্য জানিয়েছেন সিআইটিইউ নেতৃবৃন্দ। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন সিআইটিইউ’র সর্বভারতীয় সভাপতি সুদীপ দত্ত, সাধারণ সম্পাদক এলামরাম করিম এবং সংগঠনের নেত্রী এআর সিন্ধু। তাঁরা বলেছেন, সব রাজ্যে প্রচার চলছে এই কর্মসূচির। পোস্টার, লিফলেটের পাশাপাশি সংগঠিত জমায়েত হচ্ছে।
তাঁরা জানান এই কর্মসূচিতে অন্যতম দাবি প্রকল্প কর্মীদের স্বীকৃতি এবং অধিকার। দাবি রয়েছে এসআইআর বাতিলের। দাবি রয়েছে ন্যূনতম মজুরি দেশে মাসে ৪২ হাজার টাকা ঘোষণারও।
সদ্য হরিয়ানায় বিদ্যুৎকর্মী এবং ইঞ্জিনিয়ারদের ধর্মঘট হয়েছে। বেসরকারিকরনএর পরিকল্পনা থেকে পিছাতে হয়েছে রাজ্যের বিজেপি সরকারকে।
এই প্রসঙ্গেই সুদীপ দত্ত বলেন, হরিয়ানায় বিদ্যুৎ বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে যৌথ মঞ্চ গড়ে আন্দোলন করেছেন বিদ্যুৎ কর্মচারী এবং ইঞ্জিনিয়াররা। তিন দিনের ধর্মঘটের জেরে মুখ্যমন্ত্রী দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। রাজ্যের অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ গ্রাহক সমস্যায় পড়লেও ধর্মঘটকে সমর্থন করেন। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ফোরামও সমর্থন জানিয়ে বলে যে বেসরকারিকরণ হলে তাঁদেরও মাশুল বাবদ অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করা হবে। ঐতিহাসিক জয় হয়েছে এই আন্দোলনে। কিন্তরু কেন্দ্র ফের রাজ্যকে চাপ দিচ্ছে কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বন্টনের জন্য আলাদা আলাদা বিপণন সংস্থা করার জন্য। তারও লক্ষ্য বেসরকারিকরণ। ফলে আন্দোলন চলবে।
করিম কর্মসূচি বিশদে জানিয়ে বলেছেন, ১-৩ ডিসেম্বর ‘অকুপাই দিল্লি স্ট্রিট’ কর্মসূচি চলবে। ১ ডিসেম্বর অন্তত ১ লক্ষ শ্রমজীবী ‘সংসদ অভিযান’ করবেন রামলীলা ময়দান থেকে। ৩০ নভেম্বর সারা দেশের শ্রমিকরা রামলীলা ময়দানে সমবেত হবে। ১ ডিসেম্বর সেখান থেকেই শুরু হবে ‘সংসদ অভিযান’। কর্মসূচির দাবি বিশদে জানান তিনি।
এক, শ্রম কোড বাতিল করতে হবে। করিম বলেন, জোর করে সংসদে শ্রম কোড আইন পাশ করার পর বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় চার বছর পর। বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্র বিধি তৈরি করেছে। সিআইটিইউ সহ সব ট্রেড ইউনিয়ন বিরোধিতায় শামিল।
করিম বলেছেন যে এর আগে, ১২ ফেব্রুয়ারি ৩৫ কোটি শ্রমজীবী অংশ নেন দেশ জুড়ে ধর্মঘটে। তবু সরকার এমনকি আলোচনাতেও রাজি নয়। সংগ্রাম তীব্রতর করা ছাড়া উপায় নেই। সব কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠক করতে হবে কেন্দ্রকে।
দুই, সব প্রকল্প কর্মীকে স্বীকৃতি দিতে হবে। করিম বলেছেন, কেন্দ্রীয় প্রকল্প অঙ্গনওয়াড়ি, আশা, মিড ডে মিল কর্মীরা কাজ করেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। শ্রমিক বা কর্মী হিসেব স্বীকৃত নন। ফলে ন্যূনতম মজুরি আইনের মতো একাধিক বিষয় তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে তাঁদের কর্মীর স্বীকৃতি দিতে হবে। কারণ তাঁদের কাজের চাপ প্রবল। বারবার তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন সব রাজ্যে। প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন, ইএসআই তাঁদের দিতে হবে।
তিন, আগের ন্যূনতম মজুরি আইন এখন নেই। করিম বলেন, আমরা চাই ৪২হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে কেন্দ্রকে। ২১ হাজার টাকা ন্যূনতম পেনশন দিতে হবে অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের।
চার, অস্থায়ী বা চুক্তি শ্রমিক হিসেবে নয়, স্থায়ীভাবে নিয়োগ করতে হবে শ্রমিক-কর্মচারীদের। করিম বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকারি স্তরে তো বটেই, কর্পোরেট ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে নিয়োগ করে স্থায়ী ধরনের কাজ করানো হচ্ছে। অথচ কাজের স্থায়িত্ব থাকছে না। বিপুল মুনাফা কামাচ্ছে। সব প্রাপ্য সুবিধা থেকে তাঁরা বঞ্চিত। আমাদের দাবি, সরকারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে শূন্য সব পদে স্থায়ী নিয়োগ করতে হবে। বেসরকারি ক্ষেত্রেও স্থায়ী ধরনের নিয়োগ করতে হবে।
পাঁচ, শিল্প দুর্ঘটনায় শতাধিক কর্মীর প্রাণ গিয়েছে। তাঁদের সুরক্ষা এবং ক্ষতিপূরণ আইন অনুযায়ী থাকছে না। করিম বলেন, শ্রমিকদের দাসের মতো দেখা হচ্ছে। সরকার এভাবেই দেখছে। শিল্পে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
ছয়, জল-জমি-জঙ্গলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কর্পোরেটদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে প্রান্তিক মানুষকে বাস্তুচ্যুৎ হতে হচ্ছে। খনির জন্য বনভূমি কর্পোরেটদের দেওয়া হচ্ছে। আদিবাসীরা প্রতিবাদ জানালে ‘মাওবাদী’ বলে হত্যার পথে চলছে কেন্দ্র। তিনি বলেন, সিআইটিইউ’র দাবি জল জমি জঙ্গল সুরক্ষিত রাখতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন সুরক্ষিত করতে হবে।
সাত, এসআইআর বাতিল করতে হবে। করিম বলেন, প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ যাচ্ছে। গণতন্ত্র এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্যই এসআইআর বাতিল করা জরুরি। প্রকৃত ভোটদাতাদের নাম বাইরে রেখে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট হয় না।
নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মচারীরা তাঁদের দাবি নিয়ে আন্দোলনে শামিল দেশের প্রায় সব রাজ্যে। প্রকল্প কর্মীরা তাঁদের দাবি নিয়ে বড় মাপের আন্দোলন করেছেন একের পর এক এক। এবার দিল্লিতে আছড়ে পড়বে শ্রমজীবীর স্রোত।
Comments :0