ড. হিমাদ্রী শেখর সরকার
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার ঐতিহাসিক জয় কেবল একটি দেশের নির্বাচনী ফলাফল নয়; এর তাৎপর্য ছড়িয়ে রয়েছে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্কট এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার বৃহত্তর সংগ্রামের মধ্যে। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে লুলা কট্টর দক্ষিণপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের জন্য ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এমন এক সময়ে এই জয় এল, যখন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান প্রগতিশীল শক্তিগুলির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
লুলার এই জয়কে তাই দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে বামপন্থার সরল জয় হিসাবে দেখলে রাজনৈতিক বাস্তবতার জটিলতা আড়াল থেকে যায়। বরং এটি দেখিয়ে দেয়, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বিভাজনের মধ্যেও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি মানুষের আস্থা অর্জনের সুযোগ পেতে পারে। তবে সেই আস্থা ধরে রাখতে হলে নির্বাচনী সাফল্যকে বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে রূপান্তরিত করতে হবে।
লুলার রাজনৈতিক জীবনের বিশেষ তাৎপর্য তাঁর শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন থেকে উঠে আসা। একজন ধাতু শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছানোর তাঁর যাত্রা প্রতীকী অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে দারিদ্র হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর প্রশ্ন। এই কারণেই তাঁর জয় শুধু ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষের কাছে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে সংগ্রামরত মানুষের কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ।
এই প্রসঙ্গে সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবির বক্তব্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, “লুলার জয় বিশ্বের সর্বত্র শ্রমিকদের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণের দাবিতে সংগ্রামরত গণআন্দোলনগুলির কাছে নতুন আশার বার্তা বহন করে।” বক্তব্যটি লুলার জয়ের আন্তর্জাতিক তাৎপর্যকে স্পষ্ট করে— গণতন্ত্রের লড়াই কেবল নির্বাচনে জয়লাভের লড়াই নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান, মর্যাদা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠারও লড়াই।
তবে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা দিয়ে এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলিতে ধারাবাহিক নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। লুলার সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ব্রাজিলের আইনসভায় রক্ষণশীল শক্তির প্রভাব তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে তাঁর নির্বাচনী জয়কে জনকল্যাণমূলক শাসনের সূচনা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করাই হবে পরবর্তী পরীক্ষার বিষয়।
বিশ্বের নানা প্রান্তে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির একটি পরিচিত প্রবণতা হলো জাতীয়তাবাদী আবেগ, পরিচয় ভিত্তিক বিভাজন, অভিবাসন-ভীতি এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অসন্তোষকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তরিত করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্রুত বিস্তার এই প্রবণতাকে আরও জটিল করেছে। ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচার এবং আবেগ নির্ভর রাজনৈতিক বার্তা অনেক সময় যুক্তি নির্ভর বিতর্ককে পিছনে ঠেলে দেয়।
ব্রাজিলের নির্বাচন এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। লুলার জয় যেমন গণতান্ত্রিক শক্তির সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখায়, তেমনই ফলাফল নিয়ে পরাজিত পক্ষের আপত্তি ও রাজনৈতিক মেরুকরণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি আস্থা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাও স্মরণ করিয়ে দেয়। গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের ব্যবস্থা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মত প্রকাশের অধিকার, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনসাধারণের আস্থা।
এই জায়গায় বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে গণতন্ত্রের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, কোনও দাবিকে শুধু বিশ্বাস বা আবেগের ভিত্তিতে গ্রহণ না করে প্রমাণ, যুক্তি ও যাচাইয়ের আলোকে বিচার করতে হয়। গণতান্ত্রিক সমাজেও একই ধরনের মননশীলতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তথ্য বিকৃত করে বা ভিন্ন মতকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিসর গড়ে তোলা যায় না।
লুলার জয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং জনকল্যাণের পারস্পরিক সম্পর্ক। বিজ্ঞানকে প্রায়ই গবেষণাগার, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ কিংবা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানচর্চার প্রকৃত সামাজিক মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের জীবনকে কতটা উন্নত করা যাচ্ছে, তার ভিত্তিতে।
উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয় জল, পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষির উৎপাদনশীলতা, পরিচ্ছন্ন শক্তি, কার্যকর ওষুধ এবং মানসম্মত শিক্ষা— এসব ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। কিন্তু গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ, উন্নত পরিকাঠামো এবং বিজ্ঞানমনস্ক নীতি না থাকলে উদ্ভাবনের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে। একইভাবে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সুফল যদি সমাজের কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না।
এই কারণেই জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে বিজ্ঞান ও গবেষণার সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগের মোকাবিলা, নতুন ওষুধের আবিষ্কার, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। গবেষণাকে কেবল তাৎক্ষণিক মুনাফার নিরিখে বিচার করলে দীর্ঘমেয়াদি ও মৌলিক গবেষণার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হতে পারে। অন্যদিকে, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিনির্ধারণ সরকারকে আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
অতএব, লুলার রাজনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে নয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য কতটা রক্ষা পাচ্ছে— এসব প্রশ্নের মাধ্যমেও করা উচিত।
ব্রাজিলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাজন অরণ্যের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া যায় না। পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীব বৈচিত্রের আধার এই অরণ্য বিশ্ব জলবায়ু ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বন উজাড়, জীব বৈচিত্রের ক্ষয় এবং আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার ওপর চাপ শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে পরস্পর বিরোধী হিসাবে দেখা একটি ভুল ধারণা। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নবায়নযোগ্য শক্তি, টেঁকসই কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের বিকল্প পথ তৈরি করা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। লুলার সরকারের পরিবেশগত প্রতিশ্রুতিগুলির সাফল্য তাই ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববাসীর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ভারতের মতো বৃহৎ ও বৈচিত্রময় গণতান্ত্রিক দেশের কাছেও প্রাসঙ্গিক। দুই অঞ্চলের ইতিহাস, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো এক নয়; তাই ব্রাজিলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ভারতের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা উচিত হবে না। তবু কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ—অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল কারা পাচ্ছেন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য ও যুক্তি জনপরিসরে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?
একই সঙ্গে, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো, তরুণ গবেষকদের জন্য স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ তৈরি করা এবং মৌলিক গবেষণার স্বাধীনতা রক্ষা করা যে কোনও দেশের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির জন্য জরুরি। বিজ্ঞান মনস্কতা কেবল বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সমাজের সামগ্রিক বৌদ্ধিক সংস্কৃতির অংশ।
লুলার জয় নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখিয়েছে যে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক উত্থান অনিবার্য নয় এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি সংগঠিত জনসমর্থনের মাধ্যমে পালটা অবস্থান তৈরি করতে পারে। কিন্তু একটি নির্বাচনী ফলাফল নিজে থেকে বৈষম্য দূর করতে পারে না, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারে না কিংবা বিজ্ঞান ও গবেষণার বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, কার্যকর প্রশাসন, জনসম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহি।
সমাজের অগ্রগতি বিচার করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন দেখলেই চলবে না। দেখতে হবে, সেই অগ্রগতি মানুষের জীবনকে কতটা উন্নত করছে, জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা কতটা রক্ষা করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা নিরাপদ ও ন্যায়সঙ্গত পৃথিবী রেখে যাচ্ছে।
লুলার জয় তাই শেষ কথা নয়; বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সেই অধ্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে গণতন্ত্রকে কতটা শক্তিশালী করা যায়, শ্রমজীবী মানুষের অধিকারকে কতটা বাস্তব রূপ দেওয়া যায় এবং বিজ্ঞান, পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে উন্নয়নের কেন্দ্রে কতটা স্থান দেওয়া যায়, তার ওপর। শেষ পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক জয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ক্ষমতায় টিকে থাকা নয়—সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো।
Comments :0