Editorial

অশনি-সংকেত

সম্পাদকীয় বিভাগ

ডাবল ইঞ্জিনের সরকারের তিন রাজ্যে তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে একটি কোনোক্রমে রক্ষা করা সম্ভব হলেও বাকি দু’টি হাতছাড়া হয়ে গেছে শাসক বিজেপি’র। তার মধ্যে বিহারের বাঁকিপুরে গোহারা হার কার্যত মোদী-শাহদের কাছে অশনি সংকেত হিসাবে হাজির হয়েছে। সাধারণভাবে দেখা যায় উপনির্বাচনে শাসক দলের জয়ই হয়ে থাকে। শাসকদলের জেতা আসনে ফের জয় তো এক প্রকার নিশ্চিত। বিহারের বাঁকিপুর বা মধ্য প্রদেশের দাতিয়া কেন্দ্রে সেই প্রচলিত ধারণা কাজে আসেনি। একমাত্র গুজরাটের মাঞ্জলপুর কেন্দ্রে জিততে পেরে নরেন্দ্র মোদীর মুখ রক্ষা হয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোড় ঘোরানোর এক সময়ে এই নির্বাচন হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দিল্লির যন্তর মন্তরে যখন নতুন প্রজন্মের ছাত্র-যুবরা টানা বিক্ষোভ চালাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তখন তিন কেন্দ্রে চলছিল নির্বাচনী প্রচার। ২০ জুলাই সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেছে তিন কেন্দ্রের ভোটাররা। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের পাঁচ দিন আগেই পদত্যাগ করতে হয় শিক্ষা মন্ত্রীকে। এদিকে সংসদ অভিযানের সময় আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের অতিমাত্রায় হিংস্রতা ও বর্বরতার দায় মাথায় নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ’র পদত্যাগের দাবি উঠেছে। একই কারণে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়ার দাবিও উঠেছে। এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া অনুভূত হয়েছে সারা দেশে। আরএসএস-বিজেপি চালিত কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি সম্পর্কে মানুষের ধারণা ও ভাবনায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ছাত্রদের এই আন্দোলনের প্রতি মানুষ যেমন অকাতরে সমর্থন জানিয়েছেন তেমনি আন্দোলনকারীদের উপর হিংস্রতা, বর্বরতা তারা মেনে নিতে পারেননি। নির্বাচনের ফলাফলে এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েনি তা জোর দিয়ে বলা যাবে না।
বাঁকিপুর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটিগুলির অন্যতম। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টানা বিজেপি এখানে জিতছে। দলের বর্তমান সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন ২০০৬ থেকে ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত জিতেছেন। বরাবর বিজেপি এখানে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট পায়। এই প্রথম সেখানে তাদের ভোটের হার ৩৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। দলের শীর্ষ নেতারাও অহঙ্কার করে বলতেন এখানে পদ্ম চিহ্ন নিয়ে কুকুর-ছাগল দাঁড়ালেও জিতে যাবে। বাস্তবে জেতেনি। দলের জনভিত্তি কার্যত ধসে গেছে।
মধ্য প্রদেশের দাতিয়াও বি‍‌জেপি’র অত্যন্ত শক্তিশালী ঘাঁটি। গত বিধানসভা নির্বাচনে (২০২৩) রাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নরোত্তম মিশ্র পরাজিত হন কংগ্রেস প্রার্থীর কাছে। তার আগে দেড় দশক এই কেন্দ্রে বিজেপি-ই জিতেছে। শেষে কংগ্রেস প্রার্থী জিতলেও তার বিধায়ক পদ বাতিল হয়ে যায়। তাই উপনির্বাচন। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও আসনটি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ ভোটাররা শাসক দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
ঠিক কোন কোন কারণে বিজেপি’র এই তাৎপর্যপূর্ণ পরাজয় তা বিশ্লেষণের পর জানা যাবে। তবে এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার মানুষ ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অতি বাড়াবাড়ি মেনে নিচ্ছেন না। একদলী স্বৈরাচার, আধিপত্যাবাদী মানসিকতা, গণতান্ত্রিক অধিকার ছাঁটাই, সংবিধান অস্বীকার, সর্বোপরি শিক্ষায় সঙ্কট, চাকরির সঙ্কট, দৈনন্দিন জীবন চালানোর সঙ্কট মানুষকে বাধ্য করছে বিকল্প বেছে নিতে।

Comments :0

Login to leave a comment