ভ্রমণ — স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ
অভীক চ্যাটার্জী
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ২০ জুন ২০২৬
হরিদ্বার পৌঁছনোর পর আমাদের মূল লক্ষ্য হলো আমাদের এক পরিচিত হোটেলে ওঠা যা হারকি পৌড়ি থেকে হাঁটা পথে দশ মিনিট। হোটেলটার নাম হোটেল গঙ্গা লহরি। আজকাল সেই হোটেলটা একটা পাঁচতারা হোটেল হয়ে গেছে, তবে ২০০৩ এ সেটা ছাপোষা মানুষের জন্য খুবই উপযুক্ত হোটেল ছিল। আমরা সাধারণত যখনই যেতাম, ওই হোটেলের তিনতলায় একটা ট্রিপল বেডের ঘরে থাকতাম আর তার সাথে আর একটা ডাবল বেডের ঘর। হোটেলের টানা বারান্দাতে দাঁড়ালে খরস্রোতা গঙ্গার দর্শন আর হওয়া দুটোই পাওয়া যেতো। সব মিলিয়ে বিষ্ণু ঘাটের এই হোটেলখানাও আমাদের জন্যে একটা গন্তব্যের মধ্যেই পড়ত। তবে এবার আমাদের ইচ্ছে ছিল ফেরার পথে হরিদ্বারে থাকা। তাই গিয়ে কিছুটা বিশ্রাম ও ট্রেনের ক্লান্তি দুর করে আমরা এগোলাম হরিদ্বারের বাস স্ট্যান্ড এর দিকে।
হরিদ্বার বাস স্ট্যান্ডে আমাদের খবর নিতে হবে উত্তরকাশির বাস কখন পাওয়া যাবে। কারণ সে সময় এত অ্যাপের আধিক্য ছিল না, আর অনলাইন বুকিং ও করা যেতো না। আমি বাবা আর আমার মেসোমশাই চললাম একসাথে বাসের খবর নিতে। গিয়ে জানতে পারলাম সকাল ৬টা নাগাত একটা বাস আছে, যেটা আমাদের জন্যে যথোপযুক্ত। কাল সকালে আমাদের যাত্রা শুরু হবে পাহাড়ের পথে। সভ্যতার থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গিয়ে শুরু হবে এক অন্য বা অনন্য পথচলা।
যখন খবর নিয়ে ফিরলাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আজ হয়তো আর হর কি পৌড়ির গঙ্গা আরতি দেখা যাবে না, কিন্তু হরিদ্বার এসে যদি খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে কার্পণ্য করা হয়, তাহলে মা গঙ্গা ক্ষমা করবেন না। আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম প্রথমে রাজু জালেবিওয়ালার জিলিপি আর গোলাপ জামিনের উদ্দেশ্যে। এখন আর রাজুজি বেঁচে নেই। গরম তেলে অসম্ভব দক্ষতায় পাকে পাকে লম্বা জিলিপি ভাসিয়ে দেওয়া, সে দক্ষতাকে কুর্নিশ জানানো এই বান্দার কর্তব্য। আর সেই এক ই দক্ষতায় সেই লাল ভাজা জিলিপি তুলে চেপে ধরা রসের মধ্যে। সাদা চুল সাদা জামা পরা সেই লোকটিকে মনে থাকবে শুধু তার হাতের দক্ষতার জন্যে নয়, তার অসাধারণ ব্যবহারের জন্যেও। সত্যিই ময়রার মুখ মিষ্টি না হলে হাত মিষ্টি হয় না। সেখান থেকে জিলিপি আর গুলাপজামুন খেয়ে গঙ্গার পাড়ে গিয়ে কিছুটা সময় কাটালাম আমরা। তার পর গুটিগুটি এগিয়ে যাওয়া দাদা বৌদির দিকে? নাহ! আমরা দাদা বৌদি নয়, এগিয়ে যাই বৈষ্ণব ধাবার দিকে। বহু প্রাচীন একটা দেওয়ালে কালশিটে পড়া দোকান, যার সামনে পুড়তে থাকে প্রচুর বেগুন। এবং সেই বেগুন পোড়া আর রুটি, অদ্ভুত তার স্বাদ। আমি নিজে পরে অনেকবার চেষ্টা করেছি সেই বেগুন পোড়া বাড়িতে বানানোর, কিন্তু পারিনি। আমরা সেই রুটি আর বেগুনপোড়া নিয়ে হোটেলে ফিরে আসলাম। খাওয়া হয়ে গেলো অচিরেই। এবার ঘুমের পালা। কাল সকালে অনেক ভোরে উঠতে হবে। মা এর পাশে শুয়ে ধীরে ধীরে ঘুম এসে যায় আমার। গঙ্গার অনন্ত বয়ে যাওয়ার শব্দ আর হওয়ায় ঘুমিয়ে পড়ে ১৩ বছরের আমি।
Comments :0