ভ্রমণ — স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ
অভীক চ্যাটার্জী
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ২৭ জুন ২০২৬
ভোরবেলার হরিদ্বারের রূপ অনবদ্য। তবে আমরা যখন ঘুম থেকে উঠে বেরোনোর তোড়জোড় শুরু করেছি, তখনও ভোর হয়নি। আকাশ ঢেকে আছে তারার মালায়। একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া সারা গায়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গার অবিশ্রান্ত গর্জন ধ্বনি শোনা যাচ্ছে ক্রমাগত। এরই মধ্যে আমরা তৈরি হয়ে একটা বড় অটো ধরে বেরিয়ে পড়লাম বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে।
ভোরের আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। কুয়াশার চাদর সরিয়ে আরমোড়া ভেঙে সুজ্জিমামা জেগে উঠছেন। চাওয়ালা উনুনে আঁচ দিয়েছে। সাদা ধোঁয়া তার ছড়িয়েছে কাবলি বেড়ালের মতো। মাফলার মাথায় জড়িয়ে এক সাধু আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছে চায়ে। পাশে রাখা তার লোটা কম্বল আর খান দুয়েক সিঙ্গারা। বহু প্রান্তিক মানুষ শুয়ে আছে এদিক ওদিক।ইঞ্জিন স্টার্ট করছে একটা বাস। তার ডিজেলের কটু গন্ধ চারদিকে। কন্ডাক্টর তার জানলা গুলো একে একে খুলে দিচ্ছে। সে জানলাগুলোতে জমা শিশির বিন্দু নিউটনের মায়ায় ঝরে যাচ্ছে টুপটাপ। সকাল হচ্ছে হরিদ্বারে।
আমরা আমাদের গন্তব্যের বাসে উঠে বসলাম। আজকের বিলাসবহুল বাসগুলোর সাথে এর কোনো তুলনাই চলে না। কলকাতা শহরের সরকারি বাসের মতো অনেকটা অবস্থা সেগুলোর। এই বাসে চড়েই আমরা প্রায় ৮-১০ ঘণ্টা ধরে যাব উত্তরকাশীর উদ্দেশ্যে। এখন রাস্তা অনেকটা চওড়া হয়েছে, অনেকটাই বিপদবিহীন। তখন পাহাড়ের পথে ধ্বসের সম্ভবনা অনেকটাই বেশি ছিল। আর একবার ধ্বস নেমেছে তো দাঁড়িয়ে থাকো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবে সৌভাগ্য বসত আমরা কোনো সমস্যাতে পড়িনি। আমাদের বাস ছাড়ল ঠিক সাড়ে ছটাতে। শহরের কোলাহল ছেড়ে আমরা একটু একটু করে ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে এগোতে শুরু করলাম। হরিদ্বারের পর পথে পড়ে প্রথম জনপদ ঋষিকেশ। ঋষিকেশের পর থেকে মোটামুটি শুরু হয়ে গেলো সবুজের সমারোহ। আমরা একটু একটু করে মিশে যেতে থাকলাম নিবিড় প্রকৃতির কোলে। সেই অকৃত্রিম নিবিড় বনানীর মাঝে এই বিকট শব্দ তোলা যন্ত্রদানবকে বড় বেমানান লাগতে শুরু করলো। পাইন, ওক, দেওদারেরা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সারে সারে। রডোডেনড্রন ফোটে এই পথে। বাস ছুটে চলে। ছোট ছোট জনপদ পড়ে মাঝে মাঝে। লোকজন নামে ওঠে। এটাই এখানকার একমাত্র জনপরিবহণের মাধ্যম। তারপর আবার আমরা ঢুকে যাই সেই অরণ্যের কর্মশালায়, যেখানে প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে বায়ুবিসুদ্ধিকরণ।চাম্বার এক ছোট্ট ধাবায় বাস থামল। ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড় আর গরম আলুর পরোটার গন্ধে পাহাড়ি সকাল হয়ে উঠল আরও মোহময়। কন্ডাক্টরের চেনা ডাক—'বিশ মিনিট, সবাই তাড়াতাড়ি উঠে পড়বেন'—। আমরা আলু পরোটা খেয়ে আবার উঠে পড়লাম। এভাবে চলতে চলতে ঝিম ধরে যায়। মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুম এসে যায়। তবে হঠাৎ মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় আমার। মা আমায় আঙুল তুলে দেখায়, দূরে দেখা যাচ্ছে তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ। হিমালয়! আজও এত বছর পর আমার এই অনুভূতি প্রতিবার হয়, যখন আমি প্রথম বার হিমালয় দেখি। এ অনুভূতি বুঝি অনন্য। আকাশে মেঘ নেই। গারোয়াল হিমালয়ের শৃঙ্গগুলো দৃশ্যমান হয়েছে খুব অল্প সময়ের জন্য। যদিও জানি দুদিনেই ওই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাব আমরা, কিন্তু মন কেমন করে ওঠে চোখের আড়াল হতেই। বাস এগিয়ে চলে নিজের ছন্দে। বনছায়ে পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদ চলকে নামে রাস্তাতে। কালো অজগরের মত লাগে সে পথ।
সময়মতোই পৌঁছলাম আমরা উত্তরকাশিতে।পথে কোনো ধ্বসের মুখোমুখি হতে হয়নি আমাদের। বিকাল সাড়ে চারটে নাগাত আমরা পৌঁছলাম পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটা গঞ্জ গোছের জায়গাতে। উত্তরকাশি।সময় এখানে নিজের ধারায় বয়ে চলে। শান্ত নিস্তরঙ্গ জনজীবন তার। একটা ছোটখাটো হোটেল খুঁজে গা এলিয়ে দিলাম আমরা। পথশ্রম বড্ড বেশি হয়েছে আজ। কাল এই ছোট্ট শহরকে ঘুরে দেখার ইচ্ছে আছে। তবে আজ এখন বিশ্রাম।
Comments :0