editorial

এলআইসি লুট

সম্পাদকীয় বিভাগ

নানা ইস্যুতে দেশজুড়ে তুমুল রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে নীরবে মোদী সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত জীবনবিমা সংস্থা এলআইসি’র ৬.৫৪ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে ৩১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা সরকারি তহবিলে তুলে দিয়েছে। দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর রোজগারের একটা অংশ সঞ্চিত হয় রাষ্ট্রায়ত্ত এলআইসি’র তহবিলে। সেই অর্থেই এলআইসি হয়ে উঠেছে দে‍‌শের বৃহত্তম জীবনবিমা সংস্থা। দেশি-বিদেশি মালিকানায় দেশে গুচ্ছগুচ্ছ জীবনবিমা সংস্থা থাকলেও জনগণের ভরসা এলআইসি। কারণ, এলআইসি যেহেতু পুরোপুরি সরকারি মালিকানাধীন তাই মানুষ মনে করেন তাদের টাকা কোনোদিন মার যাবে না। বস্তুত দেশের মোট জীবনবিমা ব্যবসার ৭৫ভাগই এলআইসি’র দখলে। এহেন দ্বিতীয় বৃহত্তম কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা (শেয়ার মূল্যের বিচারে) মোদী সরকারের কাছে কামধেনুর মতো। চাইলেই সেখান থেকে অঢেল অর্থ মিলতে মারে এবং শাসকের রাজনৈতিক স্বার্থেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
দেশের সবচেয়ে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মধ্যে এলআইসি অন্যতম। সেই সুবাদে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা লভ্যাংশ দেয় কেন্দ্রীয় সরকারকে। তেমনি সরকারের টাকার দরকার হলে বে‍‌শি হারে লভ্যাংশ আদায় করে। তাছাড়া মোদী তথা বিজেপি ঘনিষ্ট কর্পোরেট সংস্থাগুলি বিপদে পড়লে বা শেয়ার মূল্যে পতন ঘটলে সরকার তাদের রক্ষা করার জন্য ব্যবহার করে এলআইসি-কে। সঙ্কটকালে আদানিদের একাধিক সংস্থায় বিপুল টাকা লগ্নি করেছে এলআইসি সরকারের নির্দেশে। তেমনি বহু বেসরকারি সংস্থাকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আদানি সংস্থার শেয়ার যখন জলের দরে বিক্রি হচ্ছে তখন উচ্চ মূল্যে এলআইসি দিয়ে তাদের শেয়ার কিনিয়েছে সরকার যাতে আদানিদের শেয়ার মূল্য পতন ঠেকানো যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত এলআইসি-তে জনগণের সঞ্চিত অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে মোদী ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের মুনাফার স্বার্থে। তার জন্য এলআইসি’র ক্ষতি হলেও থামা হয়নি।
আসলে কর্পোরেট পুঁজির দাসত্ব মেনে চলা মোদী সরকার কোনোমতেই রাষ্ট্রায়ত্ত এলআইসি’র রমরমা চায় না। তারা চায় না বিমা ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বেসরকারি সংস্থা ঝাঁপিয়ে পড়ুক। বিমা ক্ষেত্র বেসরকারি পুঁজির জন্য খুলে দেবার পর থেকে বহু দেশি-বিদেশি জীবন বিমা সংস্থা তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ সুবিধা করতে না পেরে গুটিয়ে গেছে। আবার অনেক নতুন নতুন সংস্থাও এসেছে। আবার একাধিক সংস্থা মিলে যৌথ উদ্যোগও গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় কেউ এলআইসি’র ধারে কাছেও আসতে পারেনি।
এই অবস্থায় বেসরকারি কর্পোরেট পুঁজির বিমা বাজার দখলের স্বার্থে কৌশলে মোদী সরকার এলআইসি-কে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। বাধ্য করছে অলাভজনক ও ক্ষতিকর জায়গায় লগ্নি করতে। এলআইসি টাকা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করছে বিভিন্ন বেসরকারি কর্পোরেটের স্বার্থে। আবার সরকার নিজের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে বা ঘাটতি মেটাতে এলআইসি’র লাভের টাকা হজম করে ফেলছে। এলআইসি’র সম্প্রসারিত হবার সুযোগ সঙ্কুচিত করছে।
তারপরও এলআইসি-কে যখন জব্দ করা যাচ্ছে না তখন তার মালিকানা ধাপে ধাপে বেসরকারি হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা করেছে।

Comments :0

Login to leave a comment