হঠাৎ মধ্যরাতে নাম ঘোষণা! আদালতের রায় মোতাবেক আগেই বলা ছিল ভোটার তালিকার নবতম যে শব্দবন্ধ ‘বিচারাধীন’ তার মধ্যে ২৯ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি নাকি অবশেষে করা গেছে। দিনভর অপেক্ষার পর আক্ষরিক অর্থেই মধ্যরাতে ৬০ লক্ষাধিক বিচারাধীন নামের ২৯ লক্ষ নামের প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করা হলো। কিন্তু কতজনের পক্ষে রায় গেলো, অর্থাৎ কতজনের নাম উঠলো ভোটার তালিকায়, কত লক্ষ নাম বাদের তালিকায়, তাঁরা যাবেন কোথায় কিছুই জানা গেলো না! নির্বাচন কমিশনের মুখে কুলুপ। তৃণমূল-বিজেপি’র আস্ফালন তুঙ্গে উঠলো, যেমন চলছিল এসআইআর ঘিরে প্রথম থেকেই। ভোটাররা এবার আরও ধোঁয়াশায়, ফের হয়রানির মুখে। কোনও উত্তর মিলছে না দুই সরকার কিংবা কোনও সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে।
তাহলে কি আমাদের জোর করে দেশ ছাড়া করা হবে! আমরা যাবো কোথায়?’ একরাশ চরম উদ্বেগ হতাশা নিয়ে প্রশ্ন এই ‘বিচারাধীন’ ভোটদাতাদের। সোমবার মধ্যরাতে যে ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ ২৯ লক্ষের নামের প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা, তাতে দেখা গেল অনেক নাম বাদ থেকে গেছে। বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ভোট দিয়ে আসা প্রবীণ ভোটার, তাঁদেরও নাম নেই। সবাই বলছে ঠিকমত এখনও তালিকাই দেখতে পারলাম না, নাম না থাকলে কি করবো তাও জানি না। এই প্রশ্ন একজন বা কয়েকজনের নয় লক্ষ লক্ষ মানুষের। কেউই বুঝতে পারছেন না এখন কি করণীয়। তীব্র মানসিক উদ্বেগের শিকার তাঁরা।
শীর্ষ আদালত এখনও বলছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিবেচনাধীন ভোটারদের তালিকার নিষ্পত্তি হবে। কি সেই নির্দিষ্ট দিন? শীর্ষ আদালত বলেছে নির্বাচন কমিশনকে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সহযোগিতা করতে। শুনানির সময়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া দেশের অনেক রাজ্যেই তো ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) কাজ মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এত সমস্যা কেন? গুজরাট, তামিলনাডু, উত্তর প্রদেশ, কেরালায় পশ্চিমবঙ্গের থেকে অনেক বেশি নাম বাদ গেছে। এই রাজ্যগুলিতে এসআইআর নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গেই সমস্যার কারণে মামলা। অথচ ভোটার তালিকায় অস্বচ্ছতার দায় বিচার ব্যবস্থার ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন। আধিকারিকদের কোনও কোনও বক্তব্য ‘মিথ্যার সমান‘, উঠছে এমন অভিযোগও। এদিকে ভোটার তালিকা অসম্পূর্ণ রেখেই নির্বাচনী প্রস্তুতি পুরোদমে চালাচ্ছে কমিশন।অথচ কমিশন এখনও বলতেই পারছে না প্রথম সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে নাম বাদ গিয়েছে ঠিক কতজনের। সে কারণেই নির্বাচন কমিশনের অস্বচ্ছতা সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে, স্বচ্ছ ভোট প্রক্রিয়া।
আদালত এদিনও ইঙ্গিত করেছে মামলার বেশিরভাগ বিষয়ই প্রশাসনিক স্তরে সমাধানযোগ্য। কিন্তু সেই দায়িত্ব হাইকোর্টের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। আদালতের যে ইঙ্গিত তাতে প্রকৃত বিষয় সম্ভবত উহ্য রাখাই শ্রেয় বলে মনে করেছে। দুই শাসক দলের ভাষা ধার করে নিয়ে বলতে হয়, আসলে এরাজ্যে প্রথম থেকেই এসআইআর নিয়ে খেলা চলছে। ভোট রাজনীতির খেলা। তৃণমূলের হাতে রাজ্য প্রশাসন, বিজেপি’র হাতে নির্বাচন কমিশন। দু’পক্ষই মনে করেছে ভোটের লাভ-লোকশান এখানেই। ভোটাররা তো এই ভোট রাজনীতিতে বোড়ে মাত্র। একমাত্র বামন্থীরাই এই নির্বিচার ভোটার নিধন প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে গেছে। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, আদালতে গেছে। বার বার বলেছে কোন প্রকৃত নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে নির্বাচন করা যাবে না। সিপিআই(এম) মামলা করেছে, সমস্ত ভোটারদের বিষয় নিষ্পত্তি না করে নির্বাচনের দিন ঘোষণা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে। কারণ এতে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে। তবু শেষ অবধি যারা আক্রান্ত হবে নির্বাচনী পর্বেও তাঁদের পাশে দাঁড়াতেই হবে।
Editorial
আরও ধোঁয়াশা আরও হয়রানি
×
Comments :0