সুস্নাত দাশ
কেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু উপর হিন্দুত্ববাদী ও আরএসএস’র এত রাগ ও কুৎসা প্রচার তা অনুধাবন করতে গেলে আমাদের ঔপনিবেশিক ভারতের হিন্দু-মুসলিমের ঐক্য-অনৈক্য ও সুভাষচন্দ্রের প্রভাব আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ভারতে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভবে ঔপনিবেশিক শাসকদের ভূমিকা সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র বসুর মূল্যায়ন প্রণিধানযোগ্য। বসুর মতে যদিও মুসলিমরা বাইরে থেকে ভারতে প্রবেশ করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল এবং ভারতীয় সংস্কৃতি গ্রহণ করেনি; তা সত্ত্বেও তাঁরা ভারতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজ শাসনে ভারতীয়রা প্রথম অনুভব করেন তারা বিদেশি শাসনের অধীনে রয়েছে। তবে ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভবে এবং প্রসারে ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনীতি দায়ী হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু নিজেদের দায়িত্বের প্রতি সজাগ আত্মসমালোচনা করে লিখেছেন, “আজ আমরা সকলেই এই কথা বলিয়া আক্ষেপ করিতেছি যে, ইংরেজ মুসলমানদিগকে হিন্দুর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া দিতেছে।... মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে এই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা তত গুরুতর বিষয় নয়। শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারে না; অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে।” আক্ষেপের সঙ্গে তিনি আরও লিখেছেন, ‘‘ইংরেজ সমস্ত ভারতবর্ষের কাঁধের উপরে এমন করিয়া যে চাপিয়া বসিয়াছে, সে কি কেবল নিজের জোরে। আমাদের পাপই ইংরেজের প্রধান বল। ইংরেজ আমাদের ব্যাধির লক্ষণ মাত্র।’’ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অপসারণ অর্থাৎ ছিদ্র বন্ধ করে শনি প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করতে চিত্তরঞ্জন দাশ অগ্রণী হলেন। রচনা করলেন ঐতিহাসিক ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’(১৯২৩)। হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সমাধানে সিদ্ধান্তটি ছিল বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। বলা হলো আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব হবে জনসংখ্যার অনুপাতে। ফলত মুসলিম সমর্থন লাভে তিনি সমর্থ হলেন। তবে বাংলা কংগ্রেসের একাংশ বেঙ্গল প্যাক্টের বিরোধিতা করেছিল। হিন্দু প্রেস হতেও বিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়।
স্বরাজ্য দল গঠনের পর বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে স্বরাজ্য দল তথা চিত্তরঞ্জন দাশ সাফল্য পেলেন। তবে নির্বাচনে দাশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত আসনে স্বরাজ্য প্রার্থীদের জয়লাভ। শুধুমাত্র নির্বাচনে জয়লাভই নয়, আইনসভাতেও দাশ মুসলিম সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার স্বরাজ্য দলে তথা রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলার আবির্ভাব ঘটে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও আলগা হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসু লিখেছেন, ‘‘বাংলায় ১৯২৬ সালের ইতিহাস প্রধানত হিন্দু-মুসলমান বিরোধের ইতিহাস।’’ হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক মনোভাব ১৯২৬ সালে এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যা পূর্বে কখনো দেখা যায়নি। বস্তুত দাশের মৃত্যুর পর স্বরাজ্য দলের প্রতি মুসলমানদের আস্থা হ্রাস পায়। তবে চিত্তরঞ্জন দাশের জীবিতকালেই মুসলিমদের একটা অংশ সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে যোগদান করেন। ১৯২৪ সালে ভারতে খিলাফত আন্দোলন প্রাসঙ্গিকতা হারালে খিলাফতীদের একটা অংশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত হন। অপর অংশ কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে যোগদান করেন। বস্তুত খিলাফত আন্দোলনকারীদের সরকার-বিরোধী মনোভাব পরিবর্তিত হয়ে হিন্দু- বিরোধিতায় রূপান্তরিত হয়। শুধু তাই নয়, প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থাকে অত্যাচারী হিন্দু শাসন বলে বিবেচনা করতে থাকে। এমনকি, হিন্দুদের সঙ্গে সম্মিলন নয়, আলাদা থাকার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে মুসলিমদের আস্থা অর্জনের প্রচেষ্টা হিন্দু নেতাদের মধ্যেও দেখা যায়নি। এরূপ পরিস্থিতিতে বাংলার বিভিন্ন স্থানে (১৯২৬) সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। কলকাতা ২এপ্রিল দাঙ্গা কবলিত হলো। আর্য সমাজ কর্তৃক আয়োজিত শোভাযাত্রা মসজিদের সামনে দিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে দাঙ্গার সূত্রপাত। ১৭ মে খিদিরপুরে দাঙ্গা বাধে। পাবনায় দাঙ্গা শুরু হয় ১ জুলাই। উল্লেখ্য, কলকাতায় দাঙ্গা তিন পর্বে হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় ২২ এপ্রিল এবং তৃতীয় দফায় ১১ জুলাই। তৃতীয় দফায় দাঙ্গার সূত্রপাত হয় রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে এবং বেলগাছিয়া-পাইকপাড়া অঞ্চলে। আলোচ্য সময়কালে সুভাষচন্দ্র বসু সুদূর মান্দালয় জেলে বন্দি। তবে বাংলার পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মর্মাহত বসু মর্মবেদনা প্রকাশ করে সন্তোষকুমার বসুকে চিঠি লিখলেন (১ এপ্রিল, ১৯২৬)। বস্তুত চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর ১ বছরের মধ্যেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তাঁর হতাশাও গোপন করেননি। প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন দাঙ্গার পুঙ্খানুপুঙ্খ কারণ অনুসন্ধানের। একমাত্র সাংস্কৃতিক ঐক্যর মাধ্যমেই গঠনমূলক ঐক্য সম্ভব বলে সুভাষচন্দ্র মনে করেন। তবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কোনও তাৎক্ষণিক ঘটনা বা দুর্ঘটনার পরিণতি বলে তিনি মানতে নারাজ। একই সঙ্গে বাংলার জনগণকে সজাগ হবার আবেদন জানান। বস্তুত আলী ভ্রাতৃদ্বয় এবং স্বামী সহজানন্দর মতো সাম্প্রদায়িক নেতাদের উত্তেজক বক্তব্যগুলি ঠান্ডা মাথায় বিচার-বিশ্লেষণ করে একটা বোঝাপড়ার জন্য জনগণকে তৎপর হবার আহ্বান জানান। সাম্প্রদায়িক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রচেষ্টাও যথেষ্ট লক্ষ্য করা যায়। বহু হিন্দু এবং মুসলিম ব্যক্তিত্ব ধর্মীয় চেতনার উর্ধ্বে থেকে দাঙ্গা আক্রান্তদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে নলিনী শেঠ এবং মৌলবি ওয়াহেদ হোসেনের নাম স্মরণীয়। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারও বহু মুসলিমকে উদ্ধার করেছিল। ফলস্বরূপ, অবাঙালি হিন্দুরা তাঁর পরিবারে লুঠতরাজ চালায়। দাঙ্গায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত বিচলিত হন। প্রভাব পড়ল তাঁর লেখনীতে। ১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত বিপিসিসি-র প্রাদেশিক সম্মেলন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনের উদ্বোধনী সঙ্গীতের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’। অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টির তরফ হতেও ইশ্তেহার বিলি করে আহ্বান জানানো হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার। উল্লেখ্য, দাঙ্গায় বিচলিত যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদ যৌথভাবে একটি ইশ্তেহার প্রকাশ করেন (১৬ এপ্রিল)। তবে তাদের ইশ্তেহারে শুধুমাত্র বলেন যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা স্বরাজ লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। এরূপ পরিস্থিতিতে সুভাষচন্দ্র বসু বিনা শর্তে (২ মে, ১৯২৭) মুক্তি লাভ করেন। সুভাষচন্দ্র বসু হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে, বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান সুভাষচন্দ্র জানান (২২ নভেম্বর, ১৯২৭)। অন্যদিকে হিন্দু মহাসভার সভাপতি বালাকৃষ্ণ শিবরাও মুঞ্জের বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। রাজনৈতিক কার্যাবলীতে (মূলত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং যা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কার্যাবলীর আওতাভুক্ত) হিন্দু মহাসভার হস্তক্ষেপের সুভাষচন্দ্র বিরোধী ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা ধর্মীয় আবেদনে নয়, রাজনৈতিকভাবে সমাধানে সুভাষচন্দ্র বসু আগ্রহী ছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯২৭ সালের নভেম্বরে সুভাষচন্দ্র বসু বিপিসিসি-র সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩০ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র সুভাষচন্দ্র বসু কিন্তু মুসলিমদের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট ছিলেন। ইতিপূর্বেই রংপুর রাজনৈতিক সম্মেলনে সাহিত্যে উভয় সম্প্রদায়ের ঐক্যের কথা উল্লেখ করে। বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদানও স্বীকার করেন। এতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তাই তিনি দিলেন। তবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতি কংগ্রেসের উদাসীন মনোভাবকে পরবর্তীকালে বসু কটাক্ষ করেন। ১৯৩৫ সালে ফজলুল হক কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলে বসু ভিয়েনা হতে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন। বস্তুত সুভাষচন্দ্র বসুর বিশ্বাস ছিল অভিন্ন আর্থ-সামাজিক কর্মসূচির ভিত্তিতে বঙ্গদেশ ঐক্যবদ্ধ হবে। এমনকি, হিন্দু-মুসলমান জনসাধারণকেও একসঙ্গে মেলাবে বাঙালিদের মধ্যে (কারও কারও মধ্যে) সাম্প্রদায়িকতার গভীরতা স্বীকার করে নিয়েও কংগ্রেস সাম্প্রদায়িকতা রোধ করবে— এ নিশ্চয়তা দিলেন। আহ্বান জানালেন মুসলিম এবং তফসিলি জাতিভুক্ত ব্যক্তিদের কংগ্রেসে যোগদান করার। সুভাষচন্দ্র বসু একই সঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন (১৯৩৮)। হিন্দু-মুসলমান সমস্যাকে সুভাষচন্দ্র ধর্মের ভিত্তিতে নয়, অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করতেন ‘‘একজন মুসলমান কৃষক এবং একজন মুসলমান জমিদারের মধ্যে যতটা মিল তার চেয়ে ঢের বেশি মিল একজন মুসলমান কৃষক এবং একজন হিন্দু কৃষকের মধ্যে।’’ ধর্ম নয়, অর্থনৈতিক অবস্থাই বসুর ব্যাখ্যায় প্রাধান্য পেয়েছে।
নেতাজী সুভাষ এবং আইএনএ : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত রাজনৈতিক জীবনের অন্তিমপর্বে সুভাষচন্দ্র বসু সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানে গভীরভাবে নিমগ্ন হন। ১৯৩৮ সালে লিগ সভাপতি জিন্নার সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সমাধানে পত্রালাপ করেন। তবে মুসলিম লিগ ‘ভারতের মুসলমানদেব প্রতিনিধিস্থানীয় সংগঠন’ এবং কংগ্রেস কর্তৃক নিয়োজিত কমিটিতে কোনও মুসলমান অন্তর্ভুক্ত হবে না— এরূপ দাবির তীব্র প্রতিবাদ (যদিও ওয়ার্কিং কমিটির নামে) জানান।
সুভাষচন্দ্র বসু ৩ মে, ১৯৩৯ সালে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন। কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন ১১ আগস্ট, ১৯৩৯। ঠিক একবছর পরে (১১ আগস্ট, ১৯৪০) ফরওয়ার্ড ব্লক পত্রিকায় কংগ্রেসকে সংগ্রাম আরম্ভ করতে অনুরোধ করা হলো। যদিও ইতিপূর্বেই সুভাষচন্দ্র হিন্দু-মুসলমান ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ৩ জুলাই, ১৯৪০ তারিখে ‘সিরাজদৌল্লা দিবস’ পালনের ডাক দিয়েছিলেন। যদিও হক মন্ত্রীসভা হলওয়েল স্মৃতিস্তম্ভ অপসারণের আশ্বাস দেন; প্রতিশ্রুতি ছিল অস্পষ্ট। শেষপর্যন্ত ২ জুলাই, ১৯৪০ সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করা হলো ৷ বস্তুত চিত্তরঞ্জন দাশ-পরবর্তীকালে মুসলিম সমর্থন বা আস্থা সুভাষচন্দ্র অপেক্ষা বেশি অন্য কোনও নেতা, বিশেষ করে বাংলায়, পাননি। আর আইএনএ পর্বে বসুর প্রতি মুসলিমদের সুগভীর আস্থার বিবরণ পাওয়া যায় আইএনএ-র তিন মুসলিম অফিসার শাহনওয়াজ খান, আবিদ হাসান এবং এম জেড কিয়ানির স্মৃতিচারণে আবিদ হাসান লিখেছেন, “নেতাজী ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে জাতীয়তাবাদ হতে পৃথক রেখেছিলেন। যদিও তিনি নিজে প্রচণ্ড ধর্মপ্রাণ ছিলেন, কিন্তু জন সমক্ষে কোনও প্রকার ধর্মীয় প্রার্থনা অনুমোদন করতেন না” শাহনওয়াজ খান লিখেছেন, “ধর্ম সম্বন্ধীয় বা প্রাদেশিক ভেদাভেদ তাঁর কাছে কিছুমাত্র ছিল না। এসব তিনি আমলই দিতেন না। হিন্দু, মুসলিম শিখ সবাইকে তিনি সমান চোখে দেখতেন এবং এই ভাবই সমগ্র আজাদ হিন্দ ফৌজকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজে ধর্মগত বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের নামগন্ধ ছিল না, অথচ প্রত্যেক লোকেরই নিজ নিজ ধর্মমত অনুসারে উপাসনা করার অধিকার ছিল।” মুসলিমদের সহযোগিতায় সুভাষচন্দ্রও অভিভূত হয়েছেন। ঘোষণা করেন, “সারা পৃথিবী জানুক এবং আমাদের শত্রুরা জানুক যে পূর্ব এশিয়ায় ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে সকল ভারতীয় ঐক্যবদ্ধ এবং তাঁহাদের সাধারণ মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য সংকল্পবদ্ধ।” উল্লেখ্য, আইএনএ-র সৈন্যদের (হিন্দু ও মুসলমানদের) জন্য একত্রে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বস্তুত সুভাষচন্দ্র সাম্প্রদায়িকতাকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পথে অন্তরায় বিবেচনা করলেও সমস্যা মনে করেননি। স্মরণ করে দিয়েছেন সোভিয়েত রাশিয়ার কথা। সোভিয়েত রাশিয়া যদি একাধিক ধর্মাবলম্বীদের এক রাষ্ট্র এবং শাসনের অধীনে রাখতে সমর্থ হয় ভারতবর্ষে সম্ভব নয় কেন? মুক্ত কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন “স্বদেশপ্রেমিক মুসলমান ও স্বদেশপ্রেমিক হিন্দুর মধ্যে কোনও তফাৎ নেই।” বসুর ভাষণের যথার্থতার প্রমাণ পাওয়া গেল হাবিবের মধ্যে। নেতাজীর আকর্ষণে (মাতৃভূমির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও অবশ্যই ছিল) নেতাজীর গলার মালা ক্রয়ে সর্বস্ব দান করেন। দানের মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। এমনকি, স্ত্রী-পুত্র সহ নিজেও আইএনএ- তে যোগদান করেন। সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ভারত পথিক-এ লিখেছেন যে ছোটবেলায় (কটক বসবাসকালে) মুসলিম প্রধান অঞ্চলে বাস, তাদের সঙ্গে গভীরভাবে মেলামেশা, বন্ধুত্ব স্থাপনের এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে মুসলমানদের কাছাকাছি আসার সৌভাগ্য সুভাষচন্দ্রের হয়েছিল। তাঁর ভাষায়—‘‘বস্তুত: আমার মনে হয় না যে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া ছাড়া আর কোনোভাবে তাদের নিজেদের চাইতে পৃথক মনে করেছি।’’ শুধুমাত্র বাল্য বা কৈশোরেই নয়, রাজনৈতিক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন। জার্মানি হতে জাপান সাবমেরিন যাত্রাকালে তাঁর সঙ্গী একজন মুসলমান, আবিদ হাসান। আইএনএ সিক্রেট সার্ভিসে বহু মুসলমানকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁদের ভারতবর্ষে পাঠানো হয়েছিল মুসলিমদের মধ্যে ব্রিটিশ-বিরোধী প্রচার চালানোর জন্য। জীবনের শেষ বিমান যাত্রায় একমাত্র সঙ্গী হিসাবে নির্বাচন করেন একজন মুসলমানকে, হাবিবুর রহমান। যাত্রাপূর্বেই আজাদ হিন্দু সরকারের দায়িত্ব (তাঁর অনুপস্থিতিতে) অর্পণ করেন আরেকজন মুসলমানকে, এমজেডকিয়ানি। আইএনএ-র চরম আর্থিক দুর্দিনেও মুসলিম পরিষদদের মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি না মেলায় চেট্টিয়ার সম্প্রদায়ের আর্থিক দান গ্রহণে অসম্মত হলেন। ধর্ম নিরপেক্ষতার এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সুভাষচন্দ্র বসু ব্যতীত কোন স্বাধীনতা সংগ্রামী স্থাপন করেছেন?
Netaji Subhash Chandra Bose
হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ও নেতাজী
×
Comments :0