Industry and Job

শিল্প নেই, কর্মসংস্থানও নেই

সম্পাদকীয় বিভাগ

বেসরকারি লগ্নি টানতে একসময় তুমুল শোরগোল তুলেছিল মোদী সরকার। তখন সবে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি।  শিল্পে  লগ্নি তার সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়াতে নিয়ে আসে উৎপাদন নির্ভর উৎসাহ ভাতা (পিএলআই) প্রকল্প। বছরে এই প্রকল্পে ২কোটি চাকরির ঘোষণাও হয়ে যায় রাতারাতি। কিন্তু কোথায় কি? কর্মসংস্থানের হার এখন তলানিতে, স্বাধীনতার পর সবচেয়ে কম। যে উৎসাহ ভাতা প্রকল্পের কথা বলা হয়েছিল, তাতে কোনও লগ্নি আনা যায়নি। পাঁচ বছর কেটে গেছে, তৃতীয়বারের সরকারও গঠিত হয়েছে, কিন্তু মোদীর সাধের প্রকল্প একেবারে ফ্লপ। এই প্রকল্পের উৎসাহ ভাতায় না বেড়েছে অতিরিক্ত হারে লগ্নি, না বেড়েছে হয়েছে কর্মসংস্থান। ফলে এই প্রকল্পের বরাদ্দ গুটিয়ে ফেলার পথেই চলেছে কেন্দ্র।
মোদীর দ্বিতীয় দফার সময়েই গোটা দেশে শিল্প ক্ষেত্র সঙ্কটের শিকার হয়েছে। তৃতীয় দফায় তারই রেশ চলছে। দেশে  বৃহৎ শিল্প সেভাবে হয়নি, উদ্বেগের বিষয় প্রচুর ছোট মাঝারি শিল্পে বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে ৭৫ হাজারের বেশি ছোট মাঝারি শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে।  ছোট ও মাঝারি শিল্পের প্রসারে যেসব রাজ্য এগিয়ে রয়েছে সেই রাজ্যের অবস্থাও শোচনীয়, শিল্প বন্ধ হওয়ার হারও সেখানে বেশি। তথ্যে দেখা যাচ্ছে  ২০২৪ সালে দেশে সর্বাধিক ছোট মাঝারি শিল্প বন্ধ হয়েছে। ছোট শিল্পে এগিয়ে থাকা রাজ্য মহারাষ্ট্রে বন্ধ হয়েছে প্রায় ৮হাজার শিল্প। পশ্চিমবঙ্গে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ছোট শিল্পের হাল ভয়াবহ, ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হচ্ছে ছোট শিল্প। শুধুমাত্র গতবছরই এরাজ্যে বন্ধ হয়েছে দেড় হাজার শিল্প । এক্ষেত্রে মোদী এবং মমতার সরকারের বিশেষ কোনও পার্থক্য নেই।
মমতা ব্যানার্জির সরকারও ঢাকঢোল পিটিয়ে জানিয়েছিল শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ নিলেই সরকার ছাড় দেবে। কিন্তু নেওয়ার শিল্প সংস্থা মিলল না। রাজ্যে শিল্প গড়লে সরকার বিদ্যুতের বিলে ছাড় দেবে। কিন্তু মমতা-শাসনে বিদ্যুৎ ছাড় নেওয়ায় ভাটা। এই প্রকল্প বামফ্রন্ট সরকারের সময়ও ছিল। ২০০৭-০৮ সালে রাজ্য সরকার বিদ্যুৎ ছাড়ের জন্য বরাদ্দ করেছিল ১১৬ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার। ২০২২-২৩-এ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সরকার বিদ্যুৎ ছাড় দিতে হয়েছে ৭৬ লক্ষ ৩৭ হাজার টাকা। এর থেকে বোঝা যায় রাজ্যে শিল্পের অবস্থা। রাজ্যের অর্থ দপ্তরের তথ্যেই শিল্পে পশ্চিমবঙ্গের দুর্দশা স্পষ্ট। বামফ্রন্ট আর তৃণমূল সরকারের সময়কালের সরকারি তথ্যের তুলনামূলক আলোচনা করলেই বোঝা যাচ্ছে রাজ্য শিল্পে মুখ থুবড়ে পড়েছে। যেমন শিল্পসংস্থাগুলির জন্য ইনসেনটিভ। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে অনেক আবেদন এই ক্ষেত্রে। সে সব বেছে বেছে দিতেই সরকারের অনেকগুলি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। মমতা ব্যানার্জির আমলে সেই সব ঝক্কি নেই। নতুন কারখানা নেই। ইনসেনটিভের আবেদন নেই। ফলে সরকারকে টাকাও দিতে হচ্ছে না শিল্প গড়ে তোলার সহায়তায়। পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্পে, বিশেষত উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগের কোনও লক্ষ্মণই দেখা যাচ্ছে না। বরং একের পর এক পুরানো শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সরকারি তথ্য থেকেই জানা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোম্পানি তাদের নথিভুক্ত অফিস সরিয়ে নিয়ে গেছে অন্য রাজ্যে। রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে এক দশকের মধ্যেই বড় ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক। ফলে এরাজ্যে কর্মসংস্থানের অবস্থা কী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।  না বাড়ছে লগ্নি, না বাড়ছে কর্মসংস্থান। গোটা দেশে, এরাজ্যে তো বটেই। আর মোদী-মমতার লড়াই দেখছেন মানুষ ধর্মের নামে। 
 

Comments :0

Login to leave a comment