CPI-M Hawker Rally

উচ্ছেদের যন্ত্রণা মঞ্চে জানালেন কৌশল্যা-নাজিমা, লড়াই চালানোর ঘোষণা সিপিআই(এম)’র

রাজ্য কলকাতা

শনিবার মহম্মদ আলি পার্কে হকার উচ্ছেদ বিরোধী সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন মহম্মদ সেলিম।

দমদম এক নম্বর প্লাটফর্মে পঞ্চাশ বছর ধরে হকারি করতেন কৌশল্যা সিকদার। তিনি জানান রাত বারোটার সময় দোকানে ছিলেন তাঁর সন্তানরা। তাঁদের মারধর করা হয়। এইসঙ্গে হাত ধরে টেনে দোকান থেকে বার করে দেওয়া হয় তাঁকেও। 
শনিবার মহম্মদ আলি পার্কে উচ্ছেদ বিরোধী সভায় বক্তব্য রাখছিলেন কৌশল্যা। জানাচ্ছিলেন তাঁর যন্ত্রণা।
দমদম স্টেশনে তাঁদের রেলের থেকে বলা হয়, ‘হকারি করবেন না, স্টেশনে ওঠার চেষ্টাও করবেন না। উঠলেই পাঁচ হাজার টাকা ফাইন নেওয়া হবে।‘
কৌশল্যা বলছেন, ‘‘আমরা কিভাবে খাব? আমার ওপরই পুরো পরিবার চলে, কিভাবে চলবে আমাদের।’’ 
সন্তোষপুর স্টেশন থেকে আসা নাজিমা বিবির মুখেও উঠে আসে সেই একই কথা। তিনি বলছেন, ‘‘আমাদের স্টেশনেও অনেকে দোকানদারি করে। দোকান চালিয়েই খাবার জোগার করত, চায়ের দোকান চালিয়ে, সবজির দোকান চালিয়ে নিজেদের পেটের ভাত জোগার করতেন।’’
নাজমা জানিয়েছেন এই দোকান থেকে  চুরি করা হচ্ছে পাল্লা-বাটখারা। বলা হয়েছে, হকারি করতে হলে ২০০০ টাকা ফাইন দিতে হবে। নাজমা বলেন, ‘‘এমনকি হুমকি দেওয়া হচ্ছে স্টেশনে দোকান লাগালে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে। কিভাবে আমাদের পরিবারগুলো চলবে?’’
শনিবার শিয়ালদহ ও হাওড়া থেকে ফেয়ারলি প্লেস পর্যন্ত দুটি উচ্ছেদ বিরোধী মিছিল করে সিপিআই(এম)। মাঝপথে মহম্মদ আলি পার্কে কাছেই আটকে দেয় পুলিশ। সেখানেই সভা করা হয়। মঞ্চে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানান ভুক্তভোগী কৌশল্যা সিকদার, নাজিমা বিবির মতো হকাররা। 
পাশাপাশি এদিনের সভায় বক্তব্য রাখেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, সিআইটিইউ নেত্রী গার্গী চ্যাটার্জি, রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি অলকেশ দাস, সম্পাদক দীপঙ্কর শীল।
মিছিলে অংশ নেন সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী, মীনাক্ষী মুখার্জি, কলকাতা জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার, সিআইটিইঊ রাজ্য সম্পাদক জিয়াউল আলম, সভাপতি অনাদি সাহু, 
সভার সভাপতি তো করেন সিপিআইএম রাজ্য কমিটির সদস্য কল্যাণ মজুমদার। 
মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘‘আমরা মিছিল করে আজ এখানে এসেছি এটাই জানান দিতে রুটিরুজির লড়াইয়ে হকাররা একা নন, লাল ঝান্ডা তাদের সঙ্গে এবং পাশে রয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছে ডবল ইঞ্জিনের সরকার তাঁদেরই পায়ে কুড়ুল মারছে। এটা সংবিধান বিরোধী। হকারি বেআইনি পেশা নয়, বরং এই উচ্ছেদ বেআইনি।’’
এ সংক্রান্ত আইন রয়েছে, কলকাতা হাই কোর্টের স্থগিতাদেশের উল্লেখ করেন সেলিম। তিনি বলেন, ‘‘ওরা আইন মেনে কাজ করবে না। তাই রাতের অন্ধকারে বুলডোজার নামাচ্ছে। যে চোর- জোচ্চোরদের ধরার কথা তাদের ধরছে না। আর যারা নিজে খেটে পেটের ভাত জোগার করছে তাদেরকে ধরছে। যে কৃষক ভেন্ডারে তার মাল নিয়ে আসেন তিনি তো পাঁচ তলা রেস্টুরেন্টে খেতে যাবেন না। যে শ্রমিক ট্রেনে করে ফেরেন তিনি দশ টাকার ঝালমুড়িটাই খুঁজবেন। তাদের মুখে তো আর সরকার ওই খাবারটুকু তুলে দেবে না।’’ 
গার্গী চ্যাটার্জি বলেন, ‘‘ওরা বুলডোজার আনবে, রাতের অন্ধকারে সাঁজোয়া গাড়ি আনবে, ডাম্পার জেসিবি আনবে, জলকামান টিয়ার গ্যাস আনবে, কিন্তু আমাদের বিশ্বাস আছে শেষ পর্যন্ত এই সংগ্রামী শ্রমজীবী মানুষেরই জয় হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘দমদমে যেদিন উচ্ছেদে নেমে হকারদের দোকান ভাঙা হচ্ছিল, তখন তাঁরা বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে খুঁজছিলেন। যিনি কথা দিয়েছিলেন, দু’বছর আগে, যদি উচ্ছেদ হয় তাহলে তিনি বুলডোজারের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘স্টে অর্ডার থাকা সত্ত্বেও কেন উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আসলে রেল স্টেশনগুলো তো আদানি আম্বানিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দাবি বিকল্প পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা যাবে না। আমরা রেলের শীর্ষ কর্তাদের ডেপুটেশন দিয়েছি। যখন রেলমন্ত্রী এখানে এসেছিলেন তখন বিক্ষোভ দেখিয়ে চিঠি পাঠিয়ে আমরা আবেদন জানিয়েছি, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ হল চলবে না। রানিং হকারদের হকারি করতে দিতে হবে, এভাবে হাজার হাজার টাকা ফাইন করা চলবে না।’’ 
অলোকেশ দাস বলেন, ‘‘লড়াই শুরু হয়েছে। লড়াই কেমন হতে পারে তা কাপুরুষরা জানে না। চারজনের ছবি আমরা মিছিলের শুরু থেকেই আমাদের সামনে ছিল। প্রমথ মন্ডল, রাজু রায়, বিপ্লব সরদার, কার্তিক সাউ। দু’মাস আগে এঁদের নাম কেউ জানতো না। এই চারজন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন লড়াই করতে হবে, শেষ অবধি লড়াই করতে হবে। আমাদের অধিকার আমরা লড়াই করেই ফিরিয়ে আনব।’’ 
সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির সদস্য কল্লোল মজুমদার বলেন, ‘‘অজস্র মানুষ রাতারাতি পেশা থেকে উচ্ছেদ হয়ে কোনমতে দিন গুজরানের চেষ্টা করছেন। কিন্তু সরকার তাদের পেটে ভাত জোগাড় করার কোন সুযোগ করে দিতে পারছে না।’’

Comments :0

Login to leave a comment